স্মৃতিকথা

সেলিম আল দীন এর ডিলেমা

বড় চাচা সেলিম আল দীন এর ভক্ত, শিষ্য অথবা স্টুডেন্টদের সঙ্গে আগে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হইত যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। এখন আর হয় না। ফেসবুকে কেউ যদি যোগাযোগ করে আর কি তখন হয়।

তাদের সঙ্গে আমার সাধারণ পরিচিতির বাইরে বিশেষ খাতির ছিল না। আমারে ‌’ভাইস্তা’ হিসাবে ট্রিট করার সুযোগ দেই নাই। তারা যে নাটক করত সেগুলার খোঁজখবর হয়ত রাখতাম। মাঝে মাঝে সেলিম আল দীনের অনুরোধে কিছু কিছু দেখতেও যাইতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার রুমে বা নাটক ও নাট্যতত্ত্ব ডিপার্টমেন্টে।

আমার জন্য এই দেখা খুব একটা শিল্পাত্মক ছিল না। পারিবারিক ছিল বেশি। ওনাদের কাল্টে মিশতে আমার অস্বস্তি হইত, পারতামও না। তার চাইতে বরং সেলিম আল দীনের লগে তার শিল্পতীর্থের বাইরে পারিবারিক মেলামেশা, খানাপিনা বেশ উপভোগ্য ছিল আমার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে আমি ওনার বাসায় নিয়মিত খাইতে যাইতাম। তিন বেলা খেওয়া সেখানে আমার জন্য ফ্রি ছিল। তবে কেবল পকেটে টাকা না থাকলে এক কি দুই বেলা যাওয়া হইত।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র

তার শিষ্যরা ব্যক্তি সেলিম আল দীন আর তার লেখার একটা ডিলেমার মধ্যে পইড়া যাইতেন দেখতাম। সেটা তাদের মনোঃযন্ত্রণার কারণ হয়ে ছিল ওনার জীবদ্দশায়। মরার পর ওনার বিষয়ে তাদের শত অভিযোগের সব উবে গেল দেখলাম।

ওনার লগে মেলামেশা কিম্বা তার আচরণ নিয়া পড়ুয়াদের অনেকে বেজার হইতেন, রাগ করতেন, সমালোচনা করতেন, তারে ছাইড়া চইলা আসতেন। কিন্তু পড়ালেখাটা ছাড়তে পারতেন না। নম্বর বাড়ানোর হিসাবের বাইরেও বিদ্যার প্রশ্নে তারা আবার গুরুতলে হাজির হইতেন। এর মনস্তাত্ত্বিক কারণটা আমি জানতাম। সেটা হইল বিদ্যাশিক্ষায় ভক্তি। এই ট্যাবু থিকা তারা বাইর হইতে চাইতেন না। ইনফ্যাক্ট সেলিম আল দীনও না। তার বন্ধু বা শিষ্যরা ইউরোপীয় অর্থে শুদ্ধ এবং আধুনিক জীবনযাপন করলেও তিনি তা ছিলেন না যদিও। তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গীয়। গ্রাম ব্যাপারটা ওনার মধ্যে সবসময় ছিল। উনি গ্রামের কথা লেখতেন, যাইতেন, যাইতে বলতেন। যথেষ্ট অপ্রমিত ছিলেন জীবনাচরণে। ভাষার ‌’নোয়াখাইল্যামি’ ওনার মধ্যে রয়ে গেছে, পরিপাটি আর মেকি অভিজাত ঢাকার সমাবেশে তার ভাষার টান ধরা পড়ছে—এমন নানা ঘটনা তিনি মজা কইরা বলতেন।

তার বাসায় সোফা ছিল না। বেতের আসন ছিল বসার জন্য। তিনি বলতেন, সোফার তলায় যে ফাঁকটা থাকে সেটা অশ্লীল। ডাইনিং টেবিলে তিনি খাইতেন না, খাইতেন মাটিতে বইসা। ডাইনিং টেবিল ছিলও না তার বাসায়। একটা কাঠের টেবিল ছিল যেটায় উনি লিখতেন। বাসায় লুঙ্গি পরতেন, খালি গায়ে থাকতেন। প্রচুর সিগারেট খাইতেন। ফোনে হ্যালো না বইলা ‘হ্যাঁ’ কইতেন। হ্যালো ইংরেজি, ফলে তিনি বলবেন না। স্যুট পরতেন না, শার্টও না তেমন। পাঞ্জাবি পছন্দ ছিল তার, আড়ঙের পাঞ্জাবি। অনেকেই তারে পাঞ্জাবি গিফট করতেন। নিজেরে কোন রঙে ভাল লাগত সেটা জানতেন না। প্যান্ট পড়তেন ঢিলাঢালা। হাতে একটা ঘড়ি ছিল সেটাও ঢিলা। এই ঘড়ি নাকি তার ছোটবেলার শখ।

ছোটবেলা থিকা তিনি বাইর হইতে পারেন নাই। সে আরেক গল্প, অন্যদিন করা যাবে।  হরিতকি, নিমের রস, কাঁচা বেল, রসুন—এসব খাইতেন। এসবে নানা রোগের উপশম হয় বইলা মানতেন তিনি। ওনার লেখায়ও এগুলা আছে কিছু কিছু। চিকিৎসাপদ্ধতির প্রশ্নেও তিনি অইউরোপীয় থাকতে চাইতেন।

আবার নাটক বিষয়ে তিনি বরাবর ইউরোপের গুণগান করতেন। মার্লো, ব্রেশট, মায়াকোভোস্কি এদের নিয়া বলতেন বেশি বেশি। গ্যেটে, দান্তের কথা বলতেন। দেশি নাট্যকারদের কারুর নাম নিছেন মনে হয় না। জীবনে একবার ইউরোপ যাওয়ার শখও তিনি মিটাইছিলেন। কলকাতার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না। সেখানকার খোঁজখবর রাখতেন না। তিনি অকলকাইত্তাও বটেন।

ইন্টারেস্টিংলি তিনি আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিষ্য হইতে চাইছেন। ইউরোপীয় রবীন্দ্রনাথের প্রতি আল দীনের এই প্রেমের কারণ আবার ইউরোপ না।  উনি রবী ঠাকুরে যে নেচার তা পাইতে চাইতেন। কেন চাইতেন সেটা আমি আল দীনের লেখায় তেমন পাই নাই। মুখে পাইছি। হইতে পারে সামন্তীয় বাংলার সমৃদ্ধি রবী ঠাকুরে যে আছে তা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক সামন্তীয় আছিলেন স্বভাবে। রাবীন্দ্রিক জমিদারির শানশওকত পাইতে চাইতেন। আবার অ্যাসথিটিক্যালি রবীন্দ্রনাথের জীবনের দিকে যে যাইতে চাইতেন তা কিন্তু ডিটারমাইন্ডলি না। রবীন্দ্রনাথ যেমন চেয়ারে বসতেন, তেমন একটা হেলান চেয়ার তিনি বানায়ে নিছিলেন। নিজের টাকায় গ্রামের বাড়ি দোতলা করছিলেন। জমিদারি ছিল তার পূর্বপুরুষদের এসব বলতেন। আমার দেখায় রবী বাবুরে তিনি সবচেয়ে ভাল বুঝতেন।  তারে গুরু মানতে শুরু করছিলেন । রবীন্দ্রনাথের দিকে তার একটা ইগো আবার টের করা যাইত ঘনিষ্ঠভাবে মিশলে। তারে ছাড়ায়া যাইতে চাইতেন গোপনে। যেমন গান লিখছিলেন শেষ বেলায়।

সেলিম আল দীনের গ্রাম্যতা টিকে ছিল। নিজের লেখা, নাটক এসব বিষয়ে শহুরেগো মত হিসাব করতে পারেন নাই। তার নাটকের মূল্য তিনি প্রতিপত্তি অথবা অর্থের হিসাবে বুঝতেন না। যাদের সঙ্গে কাজ করতেন তাদের কাছ থিকা কী চাইতে হবে বুঝতে পারতেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্সেও তিনি ব্যবহার হইছেন দেখছি। পরিপাটি, আঁটো থাকার যে শহুরে স্বভাব তা ওনার ছিল না। লম্বা-চওড়া অথবা দেখতে সুদর্শন ছিলেন। সমাবেশে ফলে তিনি মনোযোগ আকর্ষী ছিলেন। নিজের মধ্যে অ্যাম্বিগুইটি নিয়াই থাকতেন। অন্যরে কনভিন্স করতে চাইতেন না। প্রতিভা দিয়া জয় করতে চাইতেন। চটকদার ছিলেন না। পুরস্কাররে গুরুত্ব দিতেন না। একবার একটা সরকারি পুরস্কার গ্রহণ করেন নাই। একুশে পদকও বন্ধুদের উদ্যোগের ফসল।

নিজের অবদান বিষয়ে নিজেই বেখেয়াল থাকতেন। ঘরোয়া পরিবেশে অনেক কথা বলতেন, তবে বাইরে কম। শেষ দিকে মনে হয় নিঃসঙ্গতা টের করছিলেন। অবমূল্যায়নের ক্ষোভ তারে তাড়া কইরা থাকতে পারে। নিজের যে আকার তা দেখতে পাইতেন না তিনি। মরার পরে তারে নিয়া কী কী হবে সেসব বিষয়ে আমাদের বলতেন বেশি বেশি। জীবদ্দশায় শিল্পী হিসাবে তার উচ্চতার কথাও বলতেন।

কনফিডেন্স কম আছিল। সাহস আছিল না। আর অন্যের প্রতি সহজে কৃতজ্ঞ হইতেন। প্রকৃতি প্রেম করতে গিয়া ঢাকায় পজিশন নিতে পারেন নাই। জাহাঙ্গীরনগরেই থাইকা গেছেন।

তিনি যে এক্সপ্লয়েট হইতেছেন তা মনে মনে সন্দেহ করলেও অবস্থান নিতে পারতেন না সাহসের অভাবে। টেক্সট আর বাস্তব জীবনের দুই রূপ। টেক্সটে কেন তিনি সংস্কৃতি মিশাইতেন তা নিয়া একটা আলাপ হইতে পারে। টেক্সটরে পবিত্র বা শিল্পসম্মত কইরা তোলার জায়গা থিকা হয়ত করতেন। গ্রাম থেকে শহরে আসা লোকটার মত ভালনারেবিলিটি ছিল ওনার। সেটা কাটায়া উঠতে পারেন নাই। যাদের তিনি অবলম্বন ভাবছেন তাদেরই তিনি অবলম্বন হয়ে আছেন—এই ফাঁদ ধরার অবকাশ পান নাই। শেষ দিকে হয়ত পাইছেন। কাউরে বলে গেছেন কি? জানি না। বস্তুত ওনার ভরসা ছিল না এই বাংলায়, শুধু প্রতিভা ছিল।

Facebook Comments

লেখক, সমালোচক। বইমেলা ২০১৯ এ আসছে ছোটগল্পের বই‌ যে দেশে রাজনীতি নাই। একমাত্র উপন্যাস গায়ে গায়ে জ্বর। লিখছেন সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস আলোয় অন্ধ শহর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *