দ্য গোল্ডেন অ্যাস

লুসিয়াস আপুলিয়াস
অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন

১. এক ভবঘুরের গল্প
(প্রথম খণ্ড)

প্রিয় পাঠক, আপনার কান দু’টিকে সম্মোহিত করার জন্য এখানে রয়েছে একেবারে মিলিশিয়ান কায়দায় ভিন্ন ভিন্ন গল্পের সমাহার; গল্পগুলি শুনে আপনি মজা পাবেন। অবশ্য আশা করছি, এই নীল নদে পাওয়া খাগড়ার তৈরি কলমের তীক্ষ্ণ ডগা দিয়ে ছাপানো, মিশর থেকে আগত বইটাকে উপেক্ষা করার মতো উন্নাসিকতা আপনার নাই। সেই সাথে এও ধরে নিচ্ছি, মিশরীয় গল্প বলার যে পদ্ধতি, মানে যেসব গল্পে মানুষের দেহের গড়ন ও ভাগ্যের ধরন পালটে গিয়ে বহুরূপ নেয়, আর বিভিন্ন অভিযানের পর সেগুলি আবারও তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে—সেই প্রকারের গল্প শুনে মনোরঞ্জিত হওয়ার ব্যাপারেও আপনার ইতস্তততা নাই। শুরু করি তাহলে।

কিন্তু তার আগে—আমি কে? সংক্ষেপে বলি: অ্যাথেন্সের নিকটবর্তী হাইমেটাস পর্বত, করিন্থের একসময়কার প্রদেশ এফিরা এবং লাকোনিয়া’র শহর টিনেরাস—এসব স্থানে আমার পিতৃপুরুষদের আদি নিবাস ছিল; যেসব উর্বর স্থান বহু আগে থেকেই আরো উর্বর সব রচনায় অমর হয়ে আছে। শিশুকালে অ্যাথেন্সে আসার পর ওখানেই শিক্ষানবিশ হিসাবে অ্যাথেন্সের ভাষা রপ্ত করি আমি। পরবর্তীতে যখন নিতান্তই একজন ভিনদেশি হিসাবে রোমে যাই, কোনো শিক্ষকের দিকনির্দেশনা ছাড়াই প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করে রীতিমত হামলা চালিয়ে লাতিন ভাষার ওপর দক্ষতা আনতে হয় আমার। কাজেই রোমান মহলের ভাষারীতির একজন আনাড়ি বক্তা হিসাবে আমার যেকোনো ধরনের স্খলন ও কারো মনে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি আগে থেকেই এই অজুহাতে ক্ষমাপ্রার্থনা করে রাখলাম। অবশ্য ভাষার এই যে পরিবর্তন, তা আমার এখানকার লেখার ধরনের সাথে বেশ সঙ্গতিপূর্ণ—সার্কাসের ঘোড়সওয়ার যেভাবে একেক লাফে ঘোড়া পরিবর্তন করে, আমার এ সাহিত্যের ভঙ্গি অনেকটা ওইরকম।

শুরু হতে যাওয়া এই গল্প আসলে একটা গ্রিক উপাখ্যান। যদি গল্পটাতে আপনারা মনোযোগ দেন, প্রিয় পাঠক, তাহলে নিশ্চিত উপভোগ করতে পারবেন।

ব্যবসার কাজে একবার থেসালি যেতে হয়েছিল আমাকে। আমার মায়ের পরিবারের পত্তন ওখানেই। মায়ের দিক থেকে বিখ্যাত প্লুটার্কের বংশধর হবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। এক সকালে উঁচু পাহাড়ের সারি পার হয়ে, পিচ্ছিল পথ ধরে নিচে নেমে সামনে একটা উপত্যকার মাঝখান দিয়ে শিশিরভেজা মাঠ আর সজল চাষের জমি পেরিয়ে এসেছি যখন, আমার খাঁটি থেসালিয়ান বংশজাতের ঘোড়াটা তখন হাঁপাতে হাঁপাতে গতি কমিয়ে দিল। এতক্ষণ ধরে জিনের চাপে বসে থাকতে থাকতে আমিও ক্লান্ত, তাই লাফ দিয়ে নিচে নেমে গেলাম আমি। এক হাতে কয়েকটা পাতা নিয়ে আস্তে করে বেচারার ঘামে ভেজা কপালটা মুছে দিলাম। তারপর ওর কান দু’টায় হাত বুলিয়ে, কাঁধের ওপর লাগামটা তুলে দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকলাম ওর সাথে। দম নেওয়ার জন্য একটু সময় দেই ব্যাটাকে, একটু আরাম করুক।

মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তাটার একবার এই পাশ থেকে আর একবার ওই পাশ থেকে মুখভর্তি ঘাস খাবলে নিয়ে প্রাতরাশ সেরে নিচ্ছিল ও, এমন সময় দেখি আমাদের থেকে একটু সামনে দুইজন লোক ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। গভীর আলাপে মগ্ন। আমি একটু তাড়াতাড়ি হাঁটা ধরলাম, ওরা কী নিয়ে কথা বলছে জানার খুব ইচ্ছা করছিল। যখন একদম পাশপাশি চলে এসেছি তখন ওদের একজন উঁচু গলায় হেসে দিয়ে তার পাশের জনকে বলল: “চুপ করো রে ভাই। বাদ দাও! আমি আর তোমার এইসব উৎকট মিথ্যা কথা নিতে পারছি না!”

একটু আশার আলো পেলাম আমি। গল্পকথককে বললাম, “মাফ করবেন, আপনাদের ব্যাপারে নাক গলানোর জন্য আসি নাই, ভাই। কিন্তু নতুন নতুন জিনিস জানতে পারলে, শিখতে পারলে আমি খুবই আনন্দ পাই। খুব কম জিনিসই আছে যেগুলিতে আমার কৌতূহল নাই। আপনি যদি আপনার গল্পের শুরুতে গিয়ে আবার প্রথম থেকে আমাকে গোটা কাহিনিটা বলতেন, উপকার হত খুব। মনে হচ্ছে আপনার গল্পটা শুনতে পারলে সামনের খাড়া পাহাড়টা আরামে পার হতে পারব।”

যে লোকটা হাসছিল সে বলেই চলেছে: “এইসব আজগুবি আলাপ আর কোরো না আমার সাথে, বুঝেছো? এর চেয়ে বলো জাদু দিয়ে নদীর স্রোত উল্টা দিকে পাঠায় দেওয়া যায়, সাগরকে বরফ বানিয়ে ফেলা যায়, বাতাসকে অচল করে দেওয়া যায়। অথবা এও বলতে পারো যে সূর্যকে মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া যাবে, চাঁদকে বললে শিশিরে বিষ মিশিয়ে দেওয়া যাবে, বা তারাগুলিকে ওদের বলয় থেকে জাদু দিয়ে বের করে ফেলা যাবে। আরে, দরকার হলে এইটাও বলো যে জাদু দিয়ে দিনকে বাতিল করে দিয়ে চিরস্থায়ী রাতের বন্দোবস্ত করে ফেলা যাবে।”

তাও আমি হাল ছাড়লাম না: “না ভাই, আপনি এগুলি কথা মনে নিয়েন না তো। আপনার গল্প আপনি শেষ করেন দয়া করে। মানে খুব বেশি কষ্ট না হলে গল্পটা শেষ করেন৷” তারপর তার পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আর ভাই আপনি, আপনি যে আপনার বন্ধুর কথার সত্যতা ধরতে পারছেন না—হতে পারে আপনার এমনিতেই বুদ্ধি কম বলে পারছেন না অথবা আপনার জেদের কারণে হচ্ছে না। আপনি কি নিশ্চিত তাকে অবিশ্বাস করার পিছনে এরকম কোনো কারণ নাই? যে জিনিস খুব একটা দেখা যায় না বা যখন বুদ্ধিহীন লোকজন কোনো জিনিস সাথে সাথে বুঝে উঠতে পারে না—তখনই নির্বোধের দল সেটাকে মিথ্যা কথা বলে বাতিল করে দেয়৷ কিন্তু ওসব জিনিস নিয়ে ভাল মতো অনুসন্ধান চালানো হলে দেখা যাবে, ওগুলি যে কেবল অনায়াসে প্রমাণ করা যায় তা-ই না, খুব সহজেই ওরকম জিনিসপাতি আমাদের আশপাশে ঘটে।

যেমন ধরেন, কালকে রাতে খাওয়ার সময় কয়েকজন লোকের সাথে বাজি ধরেছিলাম। বাজিতে জেতার জন্য পনিরের বিরাট এক পিঠা মুখভর্তি করে ঢুকিয়ে দিয়েছি৷ পিঠাটা এমন নরম আর আঠালো ছিল, গলার মাঝখানে গিয়ে ওই জিনিস আটকে গেল। আমার তো পুরা শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে গেছে, আরেকটু হলে দম আটকে মরেই যেতাম আমি।

অথচ মাত্র কয়েকটা দিন আগেই, এথেন্সের স্টোয়া পইকিলে’তে দেখে এসেছিলাম—অশ্বারোহী সেনাদের বাঁকা তলোয়ারগুলি আছে না? এক ভোজবাজিকর ওইরকম একটা ধারালো তলোয়ার পুরা গিলে ফেলল৷ তাও আবার সূঁচালো দিকটা আগে ঢুকিয়েছে। আমরা যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর কীর্তি দেখছিলাম, তাদের কাছ থেকে কিছু পয়সা নিয়ে ব্যাটা আবার একই তরিকায় একটা বর্শা গিলে ফেলল। দেখি, ওই লোক মাথাটা পিছনের দিকে বাঁকা করে ঝুলিয়ে দিয়ে আছে, আর তলোয়ারের হাতলটা বের হয়ে আছে ওর মুখ থেকে। তারপরে বিশ্বাস করবেন না, মেয়েদের মতো সুন্দর দেখতে এক বাচ্চা ছেলে ওই হাতল ধরে শরীর মুচড়ে এমনভাবে নাচা শুরু করল যেন মনে হয় শরীরে একটা হাড়ও নাই। দেখলে মনে হবে চিকিৎসাশাস্ত্রের দেবতা এস্কুলাপিয়াসের এবড়োখেবড়ো সেই লাঠি, আর ওই লাঠির গায়ে তার রাজসাপ পেঁচিয়ে আছে।”

তারপর আমি আবার পাশের লোকটার দিকে ঘুরে তাকালাম: “ভাই, বলেন তো, আপনার গল্পটা বলেন। আপনার বন্ধু বিশ্বাস না করলেও আমি আপনার গল্প বিশ্বাস করব। তার ওপর ধন্যবাদ হিসাবে এরপর প্রথমেই যে সরাইখানা পড়বে সেখানে আপনাকে খাওয়াব ভাই।”

“আপনার প্রস্তাবের জন্য অনেক ধন্যবাদ,” বলল সে, “কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা আপনাকে শোনানোর জন্য আমাকে প্রতিদানে কিছু দেওয়া লাগবে না। যে সূর্য আমাদের সবকিছু দেখে, সেই সূর্যের কসম, আমার গল্পের প্রত্যেকটা বাক্য সত্য। আর আজকে বিকালে যখন আমরা থেসালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হাইপাতায় গিয়ে পৌঁছাব, সেখানে গেলেই আপনার মনে আমার কথার সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকবে না। কারণ ওখানকার সবাই জানে আমার সাথে কী হয়েছে। একদমই গোপন ঘটনা না, বুঝেছেন? শুরুতেই আমার সম্বন্ধে কিছু তথ্য দিয়ে নেওয়া ভাল—আমার নাম কী, আমি কী করি ইত্যাদি। আমার বাড়ি ইজিয়ামে, মুদির ব্যবসা করি। সেই কাজে নিয়মিতই থেসালি, ইটোলিয়া, বিওশিয়া দিয়ে যাতায়াত করা লাগে; মাখন, পনির আর ওইধরনের অন্যান্য মালামাল বেচাকেনার জন্য৷ আমার নাম আরিস্তোমেনেস। যাই হোক, একবার হাইপাতা থেকে খবর আসল যে ওখানে নাকি মোটামুটি কম দামে নতুন এক ধরনের চমৎকার পনির মজুদ করা হয়েছে। আমি সাথে সাথে রওনা হলাম৷ কিন্তু কী আর বলব, আমাদের ব্যবসায় যেমনটা প্রায়ই দেখা যায়, কপাল অনেক খারাপ গেল সেইবার। পৌঁছেই শুনি, লুপাস নামের এক বড় পাইকারি ব্যবসায়ী আগের দিন সব কিনে ফেলেছে।

অযথাই এত দূর থেকে দৌড়িয়ে গিয়েছিলাম, তাই প্রচণ্ড হতাশ হয়ে ওইদিন সন্ধ্যায় আগে আগে হাম্মামখানায় গেলাম গোসল করতে। ওখানে গিয়ে আমার পুরানো বন্ধু সক্রেটিসের সাথে দেখা! কী অবাক কাণ্ড। ওকে দেখে আমি চিনতেই পারি নাই, এত বাজে অবস্থা। শুকিয়ে গেছে, চোখমুখ ফ্যাকাসে। রাস্তার ফকিরের মতো পুরাতন একখান ছেঁড়াফাটা কাপড় পরে মাটির ওপর বসে আছে। একসময় খুব ভাল বন্ধু ছিলাম আমরা, অনেক অন্তরঙ্গতা ছিল। কিন্তু ওইদিন ওর সাথে কথা বলার আগে কেমন ইতস্তত বোধ করছিলাম আমি।

শেষ পর্যন্ত বললাম, “আরে, সক্রেটিস! তোমার এই ভয়ঙ্কর অবস্থা কেন ভাই? এইখানে এভাবে বসে আছ কেন? এসবের মানে কী ভাই? কোনো সন্ত্রাসী কাজকর্ম করেছ নাকি? তোমাকে যে খাতাকলমে মৃত ঘোষণা করা হয়ে গেছে, জানো? তোমার পরিবার তোমাকে নিয়ে আহাজারিও করে ফেলেছে, তোমার শেষকৃত্যের কাজও সব শেষ। তোমার বাচ্চাকাচ্চারা এখন এলাকার আদালতের হেফাজতে আছে। আর তোমার বউ তো কান্নাকাটি করে নিজের চেহারা-ছবি একদম ধ্বংস করে ফেলল, কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অন্ধই হয়ে গেছে মনে হয় বেচারি। ওর বাপ-মা তাকে আবারও বিয়ের জন্য তাগাদা দিচ্ছে। আর এদিকে তুমি হুট করে ভূতের মতো হাজির! তুমি তো আমাদের সবাইকে লজ্জায় ফেলে দিলে।”

“আহারে আরিস্তোমেনেস,” জবাবে বলল সক্রেটিস, “ভাগ্যদেবী যে একজন লোকের সাথে কত ধরনের ছলচাতুরী করতে পারে—সে তুমি জানলে এরকম কথা জীবনেও বলতে পারতে না।” বলতে বলতে গায়ের জীর্ণ কাপড়টা নিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা ঢাকল সে৷ কাপড় ওপরের দিকে টান দেওয়ায় নাভির নিচ থেকে শরীরের বাকি অংশ বের হয়ে গেল ওর। আমি আর এত করুণ দৃশ্য নিতে পারলাম না। ওকে হাত দিয়ে ধরে দাঁড়া করানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু ও কিছুতেই নড়বে না। গোঙানোর মতো করে বলল, “ছেড়ে দাও ভাই! আমাকে ছেড়ে দাও! দেখি ভাগ্যদেবী আর কত খেলা খেলতে চায়! আমার সাথে জেতার জন্য এরকম করছে তো? মনমতো জিততে দাও ওকে!”

শেষ পর্যন্ত আমার সাথে আসতে রাজি হলো সে। আমি যে দুইটা কাপড় পরেছিলাম, সেখান থেকে একটা নিয়ে ওর গায়ে দিয়ে দিলাম আমি৷ তারপর তাড়াতাড়ি একটা খাস গোসলখানায় নিয়ে গেলাম ওকে। ভাল করে গা ঘষে-ডলে কয় আস্তর ময়লা যে পরিষ্কার করলাম! শেষ পর্যন্ত নিজেও ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম। তাও কোনোরকমে টেনেহিঁচড়ে আমার সরাইখানায় নিয়ে আসলাম ওকে। একটা মাদুড়ের ওপর শুইয়ে দিয়ে বেশি করে খাবারদাবারের বন্দোবস্ত করলাম ওর জন্য। মদও খাওয়ালাম অনেক। ওর বাড়ির যত খবরাখবর আছে সব জানালাম।

অনেকটা সময় চলে যাওয়ার পর সে বেশ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। একসাথে হাসিতামাশা করলাম আমরা, জোরে কথাবার্তা বলা শুরু করলাম। তারপর হঠাৎ আবেগঘন এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কপাল চাপড়ে আর্তনাদ করে উঠল সে: “কী দুর্বিষহ জীবন আমার! একটু শখ করে লারিসায় গ্ল্যাডিয়েটরদের সেই বহুল প্রচারিত লড়াই দেখতে চেয়েছিলাম বলেই আজ এ অবস্থা। ওখান থেকেই শুরু।

তুমি হয়ত জানো, আমি ব্যবসার কাজে ম্যাসেডোনিয়ায় গিয়েছিলাম। প্রায় দশ মাস পর সেখান থেকে অনেক মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরত যাবার জন্য রওনা দিয়েছি, ভাবলাম লারিসায় খেলাটা একটু দেখে যাই। পথিমধ্যে লারিসার একটু আগেই এক জনশূন্য উপত্যকায় ডাকাতরা আমার ওপর হামলা করল। জীবনটা বাদে বাকি সব কিছুই ছিনিয়ে নিল ওরা। বহু কষ্টে ওদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে মরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত এই শহরে এসে পৌঁছেছি।

এখানে এসে এক সরাইখানায় উঠলাম। সরাইখানাটা মেরো নামের এক মহিলা চালায়। যদিও বয়সের কথা ভাবলে তাকে তরুণী বলা যাবে না, তারপরও দেখতে প্রচণ্ড আকর্ষণীয় সে৷ ওকে যখন নিজের দুঃখের কাহিনি শোনালাম, এত লম্বা সময় পর বাড়ি যাওয়ার জন্য কতটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছি এসব বললাম—ও বেশ সহানুভূতি দেখাল। অনেক আয়োজন করে রাতের খাবার খাওয়াল, একটা পয়সাও নিল না। এরপর তার সাথে শোয়ার জন্য বেশ জোর করল আমাকে। কিন্তু যখনই তার খাটে উঠেছি, তখন থেকেই আমার ভেতরটা কেমন অসুস্থ হয়ে যাওয়া শুরু করল। নিজের ইচ্ছাশক্তি কাজ করা বন্ধ করে দিল একদম। যতদিন কাজ করার মতো সুস্থ ছিলাম, ততদিন কুলির কাজ করে দুই পয়সা যা কামাই করেছি তার সবই দিতে হয়েছে তাকে। পরে যখন আরও দুর্বল হওয়া শুরু করলাম, ডাকাতরা দয়া করে যতটুকু কাপড় আমাকে পরে থাকতে দিয়েছিল সেটাও তাকে দিয়ে দিয়েছি। আর এখন তো দেখতেই পাচ্ছ, দুর্ভাগ্য ও মায়াবী নারী আমাকে কোথায় এনে দিয়েছে।”

“হায় খোদা,” বললাম আমি, “নিজের বাড়ি, নিজের বাচ্চাকাচ্চাকে ফেলে এসে এরকম এক বুড়ি ধামড়ি মাগীর সাথে লাম্পট্য করার শাস্তি হিসাবে একদম উচিতই হয়েছে। আরো বেশি শিক্ষা হওয়া দরকার ছিল তোমার।”

“আস্তে আস্তে! চুপ!” ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আর্তচিৎকার করে উঠল সে। আশেপাশে ভাল করে দেখল, আমাদের কথা কেউ শুনে ফেলল কিনা, “এরকম অতিমানবীয় নারীকে নিয়ে এসব কথা বোলো না, সাবধান! জবান খুলে পড়ে যাবে।”

“তাই নাকি? তোমার কথা শুনে ওই মহিলাকে তো সাধারণ সরাইখানার কর্ত্রী বলে মনে হচ্ছে না। এমন ভাব করছ যেন আধ্যাত্মিক ক্ষমতাওয়ালা কোনো মহারানি।”

“শোনো ভাই আরিস্তোমেনেস,” বিষণ্ন ভাবে বলতে থাকল সে, “আমার মেরো চাইলে আসমানকে হ্যাঁচকা টানে নামিয়ে জমিনকে উপড়ে ফেলতে পারে। নদীর স্রোতকে বরফের মতো নিশ্চল বা গোটা একেকটা পাহাড়ও গায়েব করে দিতে পারে। মরা মানুষের ভূতকে আবার জীবিত করে তুলতে পারে। দেবতাদেরকে তাদের আসন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে। জ্বলজ্বলে প্রতিটা তারা নিভিয়ে দেওয়া বা একেবারে নরকের গহীনেও আলো জ্বালানো তার কাছে তুড়ির ব্যাপার।”

“আরে ব্যাটা সক্রেটিস, কী শুরু করলে এসব? নাটক মঞ্চস্থ করছো নাকি? দোহাই লাগে ভাই, পর্দা নামিয়ে এবার সোজাসাপ্টা ভাষায় আসল কাহিনি বলো তো দেখি।”

ও জবাব দিল: “তার ক্ষমতার কয়টা নমুনা লাগবে তোমার? একটায় কাজ হবে? নাকি দুইটা লাগবে? বা তারও বেশি? সে যেভাবে পুরুষমানুষদের পাগলের মতো তার প্রেমে পড়তে বাধ্য করে ফেলে—শুধু যে গ্রিকদের তাও না, ভারতীয়দের, পূর্ব ও পশ্চিম মিশরীয়দের, এমনকি আন্তিপোদিসের বাসিন্দাদেরও—এসব তো তার ক্ষমতার ছিটাফোঁটা মাত্র। তুমি যদি এর চেয়েও বড় বড় কীর্তির উদাহরণ চাও, সেরকম কয়েকটার কথাও বলতে পারব তোমাকে আমি। একদম প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনে ঘটেছে সেগুলি। যাই হোক, প্রথমেই একটা ঘটনা বলি। তার এক প্রেমিক একবার অন্য এক বেটির সাথে পরকীয়া করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। মেরো কেবল একটা শব্দ উচ্চারণ করেছে, আর সাথে সাথে একটা বিবরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে ওই ব্যাটা।”

“এত জন্তু থাকতে বিবর কেন?”

“কারণ বিবর এমন এক প্রাণী, শিকারীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে কিনা নিজের বিচি কামড় দিয়ে ছিঁড়ে নদীর তীরে ফেলে রাখে, যাতে শিকারীরা গন্ধ শুঁকে তাকে খুঁজে বের করতে না পারে। মেরো আশা করেছিল যে তার প্রেমিকও এরকম কিছু করতে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হবে। তারপরে সরাইখানার ওই বুড়া মালিকের কথাই ধরো। মেরোর প্রতিবেশী ও ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ওই লোক। তাকে ব্যাঙ বানিয়ে দিল সে। এখন বেচারা তার সুরার পিপার ভেতর সাঁতার কেটে বেড়ায়। অথবা পিপার তলানিতে ডুবে থাকে আর ভাঙা গলায় নিজের পুরানো কাস্টমারদের ডাক দেয় “আসেন ভাই! আসেন! একবার ভিতরটা ঘুরে যান!” যে উকিল তার বিরুদ্ধে মামলা লড়েছিল, তার শাস্তি হলো ভেড়ার শিং। এখন তুমি যেকোনো দিন আদালতে গেলেই তাকে দেখতে পাবা, কীভাবে সে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে মামলা লড়ছে। পাণ্ডিত্যের সাথে সব অভিযোগ খণ্ডন করছে আর ওই বিশ্রী শিং দুইটা কীভাবে বাঁকা হয়ে বের হয়ে আছে তার কপাল থেকে!

মেরো’র আরেক প্রেমিকের বউ একবার আজেবাজে কথা বলেছিল ওর নামে, সেই মহিলাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাকে চিরকালের জন্য গর্ভবতী করে রেখে দিয়েছে সে। তার গর্ভে এমন এক জাদু করেছে, ওর বাচ্চা আর কখনো জন্মাবে না। আজীবন মায়ের পেটেই থেকে যাবে। এটা প্রায় আট বছর আগের ঘটনা। বেচারি প্রতি মাসে ফুলতে ফুলতে এমন অবস্থা, এখন দেখলে মনে হবে খুব সহজেই বাচ্চা একটা হাতি বের হতে পারবে ওর পেট থেকে।”

“কিন্তু এইসব কথা সবাই জানতে পারল কবে?”

“যখন তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে জনতার সালিশি আয়োজন করা হয় তখন। সেখানকার রায় ছিল, পরদিন তাকে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তাদের অনুগ্রহে পাওয়া একদিনের এ বাড়তি সময়ই মেরো’র জন্য যথেষ্ট ছিল, যেমনটা যথেষ্ট ছিল মেডিয়ার জন্য। রাজা ক্রিয়ন যখন মেডিয়াকে করিন্থ থেকে বিতাড়িত করার আদেশ দেন, তুমি তো জানোই সে কীভাবে একটা দিন বাড়তি সময় পেয়ে সেই সুযোগে তার উচ্ছেদকারীর বিয়ের পাগড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়? সেই আগুনে গোটা রাজপ্রাসাদ পুড়ে যায়; নববধূকে সাথে নিয়ে পুড়ে মারা যান রাজাও। কয়েকদিন আগেই মাতাল অবস্থায় এসব কাহিনি আমার কাছে খুলে বলেছে মেরো। সে মাটিতে একটা গর্ত খুড়ে সেখানে কিছু তন্ত্রমন্ত্র করে প্রেতাত্মাদের ডেকে আনে। তারপর তাদের গোপন শক্তি ব্যবহার করে হাইপাতার সব দরজা জানালায় বাণ মেরে দেয়, যাতে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় বাড়ি থেকে বের হতে না পারে কেউ। এমনকি বাড়ির দেয়াল ভেঙেও যেন রাস্তায় নামতে না পারে।

শেষ পর্যন্ত গোটা নগরীর সবাই জানালা থেকে মেরো’র কাছে আবেদন করে যে, তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হলে তারা কখনোই আর ওকে উত্যক্ত করবে না। এমনকি উল্টা সবরকমের বিপদাপদ থেকে তাকে রক্ষা করার ওয়াদা করে ওরা। এতে মেরো’র মন গলে, বাণ তুলে নেয়। কিন্তু সেই সালিশির যে মাতব্বর ছিল, তার ওপর ঠিকই প্রতিশোধ নেয় সে। মাঝরাতে মাতব্বরের বাড়িটাকে দেয়াল, জানালা আর ভিত সুদ্ধ গায়েব করে দিয়ে একশ’ মাইল দূরের এক শহরে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসে। তখন বাড়ির ভেতর মাতব্বর নিজেও ছিল। সেই শহর আবার শুকনা এক পাহাড়ের ওপর, ওখানকার লোকজন সবরকম কাজের জন্য বৃষ্টির পানির আশায় বসে থাকে। আর ওদের বাড়িগুলিও এমনভাবে বানানো যে একটা আরেকটার সাথে প্রায় লাগোয়া। এরকম ঘিঞ্জি এলাকায় তো মাতব্বরের বাড়ি ঢুকানোর জায়গা ছিল না। তাই শহরের মূল ফটকের বাইরেই বাড়িটা ফেলে রেখে চলে আসে মেরো।”

“সক্রেটিস ভাই,” আমি বললাম, “এ গল্পগুলি খুবই অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর—সন্দেহ নাই। আমার নিজেরও একটু ভয় ভয় লাগছে। আসলে রীতিমত আতঙ্কিত বোধ করছি। ধরো, তোমার ওই বুড়ি মহিলা যদি নিজের পোষা প্রেতাত্মাদের কাছ থেকে আমরা যা আলাপ করলাম সেসব শুনে ফেলে? তার চেয়ে বরং আজকের মতো ঘুমায়ে যাই। রাতও বেশি হয় নাই, সকাল সকাল উঠে রওনা দেয়া যাবে। এই বালের শহর ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি যদ্দুর যাওয়া যায় ততই ভালো।”

আমার কথা বলার ফাঁকেই দেখি সক্রেটিস হুট করে ঘুমিয়ে গেছে; জোরে জোরে নাক ডাকাও শুরু করল। ওর মতো এত ক্লান্ত অবস্থায় ভাল খাবারদাবার আর একগাদা সুরা খেলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। শোবার ঘরের দরজা ভাল করে খিল এঁটে লাগিয়ে দিলাম আমি। আমার খাটটা টেনে নিয়ে দরজার পাল্লার সাথে ঠেস দিয়ে, মাদুরটা একটু ঝেড়ে টেড়ে শুয়ে পড়লাম।

বেশ কিছুক্ষণ ঘুম আসেনি, সক্রেটিসের উদ্ভট গল্পগুলি মাথায় ঘুরছিল। কিন্তু মাঝরাতে যখন আরামসে তন্দ্রার মতো এসেছে, তখন আচমকা দরজা ভাঙার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল আমার। এত জোরে দরজাটা খুলে গেছে, কোনো ডাকাতদল একসঙ্গে তাদের কাঁধ দিয়ে ধাক্কা মারলেও এমনটা হয় না। তালা, হুড়কা, খিল সবকিছু একসাথে ছিটকে গেল। আমার খাট তো এমনিতেই ছিল পোকায় খাওয়া পুরাতন এক খাটিয়া, তাও আবার আমার চেয়ে আকারে একটু ছোট আর এক পায়া নড়বড় করে। সেই খাটিয়া বাতাসে উড়ে গিয়ে উল্টা হয়ে মেঝের ওপর পড়ে গেল, আর আমি খাটের তলায় চাপা পড়লাম।

তারপর আমি বুঝলাম, মানুষের কত অনুভূতিই তো ঠিক বিপরীত উপায়ে নিজেকে প্রকাশ করে। খুশিতে যেমন কান্না চলে আসে অনেকের, আমারও তেমনি ওই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে হাসি পেল খুব। ভাবলাম, “দ্যাখ বেটা আরিস্তোমেনেস, কী সুন্দর একখান কচ্ছপ হয়ে গেছিস তুই!” মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকলেও খাটের তলায় বেশ নিরাপদ লাগছিল আমার। আস্তে ধীরে কচ্ছপের মতো খোলস থেকে উঁকি দেওয়ার ভঙ্গিমায় মাথাটা একপাশে ঘুরিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম কী হচ্ছে।

দুইটা বিকট চেহারার বুড়ি এসে ঢুকল রুমে। একজনের হাতে একটা জ্বলন্ত মশাল, আরেকজনের এক হাতে তলোয়ার, আরেক হাতে এক টুকরা স্পঞ্জ। ওরা দু’জনে সক্রেটিসের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, শালা তখনো ঘুমাচ্ছে। যার হাতে তলোয়ার সে তার পাশের জনকে বলল, “দ্যাখো প্যান্থিয়া আপা, এই সেই পুরুষ যাকে আমার প্রেমী হবার সৌভাগ্য করে দিয়েছিলাম আমি৷ দেবি ডায়ানা যেভাবে রাখাল এন্ডিমিয়নকে পছন্দ করেছিল, যেমন করে অলিম্পিয়ান জোভ পছন্দ করেছিল সুন্দরতম গ্যানেমিডকে, ঠিক সেভাবেই তাকে নিজের করে নিয়েছিলাম আমি। সারা দিন সারা রাত আমার যৌবনের নম্রতা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে সে। আর এখন সে আমার ভালবাসাকে প্রত্যাখান করছে। আমার নামে মানুষের কাছে শুধু কুৎসা রটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, রীতিমতো পালিয়ে যাওয়ার ধান্দা করছে! নিজেকে ওডিসিয়াস ভাবে নাকি, যে আমাকে ফেলে গেলে আমিও ক্যালিপসোর মতো চিৎকার করে আজীবন একাকী কাঁদব?”

তারপর ওই বুড়ি আমার দিকে আঙুল তাক করে বলল: “আর এই যে মহাশয় আরিস্তোমেনেস, খাটের তলা থেকে উঁকি মেরে সব দেখছে; এ জানোয়ারটাই পালিয়ে যাওয়ার কানপড়া দিয়েছে সক্রেটিসকে। ও ভাবছে আমার হাত থেকে অক্ষত বেরিয়ে যেতে পারবে সে। কিন্তু একদিন—কীসের একদিন, এখনই, এই মুহূর্তেই—ও আগে যেসব ধৃষ্টতা করেছে, আর এখন যে বেয়াদবি করছে তার উপযুক্ত সাজা তাকে দিব আমি।”

তার কথা শুনে ঘামে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল আমার। আমি এত জোরে কাঁপা শুরু করলাম যে আমার খিঁচুনিতে খাটটাও ওপর নিচে দুলতে থাকল৷ এদিকে প্যান্থিয়া মেরো’কে বলল (ওইটা মেরো ছাড়া আর কে-ই বা হবে): “বোন, আমরা কি আগে ব্যক্কান্তদের মতো করে ওর অঙ্গগুলি একেক করে টেনে ছিঁড়ে ফেলব, নাকি হাত-পা বেঁধে খোজা করে দিব ওকে?”

“না, থাক ওরকম কিছু করার দরকার নেই,” মেরো বলল, “কালকে এমনিতেও আমার প্রিয় সক্রেটিসের কবর খোঁড়ার জন্য কাউকে না কাউকে তো লাগবেই।”

কথা বলতে বলতেই সক্রেটিসের মাথাটা বালিশের ওপর ঘুরিয়ে একপাশে কাত করে দিল সে। তারপর গলার বাম পাশটায় একদম হাতল পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিল তলোয়ার। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হলেও মেরো’র হাতে চামড়ার ঝোলা ছিল একটা, এক ফোঁটাও যেন বাইরে না পড়ে এমনভাবে সবটুকু রক্ত ঝোলায় ভরে নিল সে। সক্রেটিসের শ্বাসনালী পুরা কেটে ফালি হয়ে গেছে, তাও সে কেমন যেন হালকা আর্তনাদ করে উঠল, অনেকটা গল গল শব্দের মতো। তারপর সব নীরব।

এই বলিদানের অনুষ্ঠান পুরাদস্তুর সম্পন্ন করার জন্য জাদুময়ী মেরো সেই কাটা জায়গা দিয়ে তার একটা হাত আমার বেচারা বন্ধুর শরীরে ঢুকিয়ে দিল। ভিতরে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে তার হাত যখন বাইরে বের করল, সেখানে দেখি আমার বন্ধুর হৃদপিণ্ড। সাথে সাথে প্যান্থিয়া ওর বোনের হাত থেকে স্পঞ্জের টুকরা নিয়ে সক্রেটিসের গলার হাঁ করা ক্ষতস্থান বন্ধ করে দিল। স্পঞ্জ দিয়ে জায়গাটা আটকে দেওয়ার সময় ও বলছিল: “হুশিয়ার! সাগর থেকে এসেছিস তুই, সাগরেই ফিরে যাবি। যাবার পথে কেবল নদীর ঢেউয়ে ভিমড়ি খাবি!” যাওয়ার আগে আমার খাটিয়াটা তুলে দিল ওরা। তারপর আমার মুখের ওপর বসে ইচ্ছামতো পেশাব করল৷ ওদের দুর্গন্ধময় পেশাবে সারা শরীর ভিজে গেল আমার।

ওরা বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দরজাটা খাড়া হয়ে গেল আপনা থেকেই। তারপর হুড়কা, খিল এবং তালাও বসে গেল জায়গামতো। আমি হাত-পা ছড়িয়ে ভূলুণ্ঠিত হয়ে রইলাম। গায়ে কিছু নাই, দম পাচ্ছি না, ঠাণ্ডা লাগছে, আর ওদের জঘন্য সেই পেশাবের জন্য চট চট করছে শরীর, নিজেকে মনে হচ্ছে সদ্যোজাত কোনো শিশু—কিংবা বলা যায়, অর্ধমৃত কেউ, মারা যাবার পর বেঁচে ফেরত এসেছি, নিজের মরণোত্তর সন্তান আমি নিজেই। ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য আমার চেয়ে ভালো প্রার্থী তখন আর কেউ হয় না।

আমার কী হবে এখন, মনে মনে বললাম আমি, সকালে যখন গলাকাটা অবস্থায় ওকে খুঁজে পাওয়া যাবে তখন? আমি নাহয় সত্যি কথাটাই বললাম, কিন্তু সে কথা বিশ্বাস করবে কে? আমার কথা শুনে ওরা কী বলবে খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি, “তোর মতো এত বিশাল সোমত্ত ব্যাটা লোক যদি একটা মেয়ের সাথে না-ই পারলি, অন্তত সাহায্যের জন্য ডাক তো দিবি কাউকে? একটা লোক তোর সামনে খুন হয়ে গেল, তুই টু শব্দও করলি না? আর ওই দুই মহিলা ডাকু তোকেও তোর বন্ধুর মতো খালাস করে দিল না কেন? তুই তো ওদের কুকর্মের সাক্ষী, তাহলে ওদের নিষ্ঠুর নৃশংসতার হাত থেকে তোকে রেহাই দিল কেন ওরা? মরণকে ফাঁকি দিয়েছিস না তুই? এবার যা মরণের কাছেই ফিরে যা।”

আমি এসব কথা ভাবতে থাকলাম, আর এদিকে রাত শেষ হয়ে দিনের দিকে আগাতে থাকল। ভোর হওয়ার আগেই আস্তে করে কেটে পড়াটা সবচেয়ে ভাল বুদ্ধি হবে। যদিও রাস্তায় নেমে কোনদিকে যাব তা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম না। মালপত্র কাঁধে নিয়ে দরজার হুড়কা খুলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পিঠ টান টান করে থাকা দৃঢ়, অনুগত ও বিবেকবান যে দরজা আগে নিজে থেকেই সুন্দর মতো খুলে গিয়েছিল, সে এবার বেশ গড়িমসি শুরু করল। অনেকবার করে চাবি না ঘুরানো পর্যন্ত খুলল না। তারপর আমি ডাক দিলাম, “অ্যাই দারোয়ান! কই তুমি? সদর দরজাটা খুলে দাও তো। সকাল সকাল বের হতে হবে।”

দারোয়ান দরজার পেছনে মাটির ওপর শুয়েছিল। তখনও অর্ধেক ঘুমে। “একটু মাথা ঠাণ্ডা করে কথা বলেন,” বলল সে, “রাস্তায় ডাকাতরা গিজ গিজ করছে জানেন না? রাতের এই সময়ে রওনা দেয় নাকি কেউ? আপনি হয়ত কোনো পাপ-অপরাধ করেছেন, মন খচ খচ করছে, তাই মরার খুব শখ জাগছে। কিন্তু আমি তো ভাই এত মোটা মাথার লোক না যে আপনার তরফ থেকে মরতে যাব।”

“দেখ ভাই,” আমি বললাম, “এখন প্রায় সকাল হয়ে গেছে। তাছাড়া আমার মতো নিঃস্ব ভবঘুরের কাছ থেকে চুরি করার মতো আছেই বা কী? দশজন পালোয়ান মিলেও কি আর ন্যাংটার শরীর থেকে কাপড় খুলে নিতে পারে, বলো?”

কিন্তু ও তখন আধোঘুমে ঝিমাচ্ছে। পাশ ফিরে বিড় বিড় করে বলল, “কালকে রাতে যে বন্ধুকে নিয়ে এখানে এসে উঠলেন, আপনি যে তাকে খুন করে পালিয়ে যাওয়ার ধান্দা করছেন না, সেটাই বা আমি বুঝব কেমনে?”

ঠিক ওই মুহূর্তে, আমার মনে আছে, আমার মনে হলো আমি যেন পায়ের তলার মাটি ফাঁক হয়ে যেতে দেখলাম, যে মাটির তলায় নরকের আগুন জ্বল জ্বল করছে, আর নরক কুক্কুর স্বয়ং কেরবেরুস হন্যে হয়ে আছে আমার মাংস খাওয়ার আশায়। বুঝলাম, মেরো মহাশয়া আসলে করুণার খাতিরে আমার জীবন ভিক্ষা দেন নাই। আমাকে যন্ত্রণায় জর্জরিত হতে দেখার যে আনন্দ, ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মরে যেতে দেখার যে পাশবিক আনন্দ, সেই আনন্দের আশাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আমাকে।

আমি তাই কীভাবে আত্মহত্যা করা যেতে পারে তা ভাবার জন্য আবার ঘরে এসে ঢুকলাম। যেহেতু ভাগ্যদেবী আমার জন্য ওই খাটিয়া ছাড়া আর কোনো প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবস্থা রাখেন নাই, তাই আর্তকণ্ঠে বলে উঠলাম, “ও আমার খাটিয়া, প্রাণপ্রিয় খাটিয়া! আমার যন্ত্রণার ভাগিদার, আজ রাতের সব কারবারের তুমিই তো সাক্ষী, আমার বিশ্বস্ত সঙ্গী। আমি যে নির্দোষ, তা কেবল তুমিই জানো। আমার দায়মোচনের সময় হয়েছে। প্রেতলোকে যাবার উপায়টা কি করে দেবে না আমাকে?”

আর এই বলে যে দড়ি দিয়ে খাটিয়াটা বাঁধা ছিল সেটা খুলতে থাকলাম আমি। দড়ির একপ্রান্ত নিয়ে জানালার তলা দিয়ে বেরিয়ে থাকা কড়িকাঠের সাথে বেঁধে দিলাম। আর অন্য প্রান্তে শক্ত করে বেঁধে নিলাম ফাঁস। তারপর খাটের ওপর উঠে দাঁড়ালাম, বেয়ে উঠলাম নিজের ধ্বংসের মুখে। ফাঁসির গোলকে ঢুকিয়ে দিলাম মাথা।

আমার ভার বহন করে থাকা অবলম্বনটা লাথি দিয়ে সরিয়ে দিলাম, যাতে দড়িটা গলা আঁকড়ে ধরে আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু যে-ই লাথি দিয়েছি, তখনই শালার দড়িটা ছিঁড়ে গেল৷ এমনিতেই পুরানো দড়ি, তার ওপর নষ্ট হয়ে গেছে; এটাই হবে, স্বাভাবিক। আমি উপর থেকে একেবারে গিয়ে পড়লাম সক্রেটিসের ওপর। তারপর ওকে সাথে নিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে গেলাম।

ঠিক ওই মুহূর্তেই দারোয়ানটা ভেতরে এসে ঢুকে চিৎকার করে বলে উঠল, “কই? আপনি না সেই গভীর রাতে চলে যাওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠছিলেন? আর এখন আবার খাটে শুয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন?”

আর তখন, আমার পড়ে যাওয়ার কারণে হোক বা দারোয়ানের তর্জন গর্জনেই হোক, আমি কিছু করার আগেই সক্রেটিস সুন্দর মতো উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, “মানুষ যে সরাইখানার লোকদেরকে দেখতে পারে না, ঠিকই আছে একদম। দেখো, গেঁয়ো ভূতের বাচ্চাটার কাণ্ড দেখো। কীরকম আগবাড়ায়ে মাতব্বরি করতে আসছে। ওকে ডেকেছে কেউ? নিশ্চয়ই দেখতে এসেছে কোন জিনিসটা চুরি করা যায়। আমি ক্লান্ত লোকটা ঘুমায়ে আছি। শুধুই এত সুন্দর ঘুমটা ভেঙে দিল।”

(চলবে)

(গোল্ডেন অ্যাস এর ভূমিকা)