১.
ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলার যে বুদ্ধিজীবিতা এইটারে অ্যাকটিভিজম বলে। কৌশল বাদ দিয়া সত্যই বলতে হবে। সম্ভবত এই অবধারণরেই গ্রিকরা পারহেসিয়া বলতেন।
ফ্রেঞ্চ বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক মিশেল ফুকোও হয়তো এটাই চাইতেন, বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে। যে ক্ষমতার সঙ্গে বুদ্ধিজীবীদের অবশ্যই ডায়লগ করতে হবে, এবং তাদেরকে সত্য শোনাইতে হবে।
২.
আমি ‘পারহেসিয়া’ কথাটা প্রথম শুনছি মাসরুর আরেফিনের ‘আলথুসার’ উপন্যাসে। তাতে আমি এই রকমই বুঝছি, পারহেসিয়া বিষয়ে।
ঠিকঠাক বুঝছি কিনা তা বুঝতে সত্যবাদী উইকিপিডিয়ার শরণ লইছিলাম আজকে সকালে। ওনার জবানে পাইলাম:
“In rhetoric, parrhesia is a figure of speech described as: “to speak candidly or to ask forgiveness for so speaking”. This Ancient Greek word has three different forms, as related by Michel Foucault. Parrhesia is a noun, meaning “free speech”. Parrhesiazomai is a verb, meaning “to use parrhesia”. Parrhesiastes is a noun, meaning one who uses parrhesia, for example “one who speaks the truth to power”.
৩.
আমার দিককার আপত্তির জায়গা হইল, হোয়াই মি. ফুকো, যেই শোনাক, কেন ক্ষমতার কানে ‘সত্য’ শোনাইতে হবে?
ক্ষমতার সঙ্গে সৎ থাকার অর্থ কী?
সম্ভবত এর সঙ্গে ফ্রি স্পিচ বা “জনতাই ক্ষমতা” নামক আধ্যাত্মিক ধারণার যোগ আছে।
৪.
প্রথমে বুঝতে হবে, যাকে সত্য শোনাইতে হবে সেই ক্ষমতা মানেই যিনি বা যারা ক্ষমতা দখল করেন তাদের ক্ষমতা।
গণতন্ত্রেরই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে হবে বা গণতন্ত্রই ক্ষমতার যোগ্যতম পাত্র—এইটা মিডল ক্লাসের বাক স্বাধীনতা বা ফ্রি স্পিচ চাহিদা হিসাবে যথাযথ।
কিন্তু ফ্রি স্পিচ জিনিসটা জনতার দিককার কোনো আধ্যাত্মিক লক্ষ্য হইতে পারে না। যেমন আধ্যাত্মিক লক্ষ্য আছে ইহুদি জাতির। মুসলমানের। হিন্দুর। খ্রীষ্টানের।
অর্থাৎ গণতন্ত্র জিনিসটা ঐশ্বরিক। তার বাইরে যা কিছু তা যেন মিথ্যা, তা যেন গড আমাদের লেইখা দেন নাই। এভাবে দেখার যে প্রচলিত অভিনয় বা আন্দোলন আছে এর নাম ধর্মাচার।
গণতন্ত্রকে ধর্মের আকৃতি দেওয়ার কারণে যে ফ্রি স্পিচ, পারহেসিয়া বা বিবেকের উদ্ভব হয় তা ক্ষমতার ধারা অবিকল রাখে, নৈরাজ্য ঘটতে দেয় না।
ফ্রি স্পিচ জিনিসটা সিস্টেমের বিরোধী মনে হইলেও ফ্রি স্পিচই সিস্টেম। ক্ষমতার অধিক ক্ষমতা ধরে এই ফ্রি স্পিচ। তো ক্ষমতার অন্য সিস্টেম এই সিস্টেমকে উঠতে দিবে কেন?
ফ্রি স্পিচ যেমন সত্য তেমনই স্বৈরাচারী সরকার, অত্যাচারী সরকার, হত্যাকারী সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তাও সত্য ঘটনাই।
৫.
কথা হচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের কেন এই সকল ক্ষমতার সঙ্গে সত্যই বলতে হবে? কেন তারা ফ্রি স্পিচ, পারহেসিয়া বা বিবেকের সৈনিক হবেন?
গ্রিকরা বা ফুকোরা বা যারা এই রকম বলেন তারা কেন এই রকম বলেন?
ক্ষমতার সঙ্গে আদৌ কথা বলতে হবে কেন? আর সত্যই বা কেন বলতে হবে?
৬.
বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞায় পারহেসিয়া যুক্ত করার অর্থ অ্যাকটিভিজম বা পৌর কর্তব্যকে বুদ্ধিজীবীদের জন্য আবশ্যিক কর্তব্য হিসাবে ঘোষণা দেওয়া।
কিন্তু বুদ্ধিজীবীরা যেমন সরকারের অংশ নয়, তারা জনতারও অংশ নয়। তাদের উপর সত্য, বীরত্ব বা সাহস প্রদর্শনের কোনো নৈতিক চাপ নাই।
পারহেসিয়া যেহেতু এই নৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, খতিয়ে দেখা দরকার তাতে বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও কার্য বিবেক নামক পারহেসিয়া সাহেবের সঙ্গে শর্তযুক্ত হইয়া পড়ে কিনা।
৭.
তো পাওয়ারের সঙ্গে ডিল করার একটা পদ্ধতি এই পারহেসিয়া। আমি শিওর না, এই লেনদেনটা করতেই হবে, তা বলে কিনা পারহেসিয়া। পারহেসিয়া বুদ্ধিজীবীদের উপর অর্পিত দায়িত্ব নাকি এইটাও একটা পথ মাত্র, তা আমি বুঝি নাই। কারণ পারহেসিয়া বিষয়ে অধিক উইকি পাঠ আজিকে আর করা হইয়া ওঠে নাই।
৮.
ইতিহাসে এই রকম দেখা গেছে, প্রাণ যায় তবু সত্য বলবেই। এরে বলে বীরত্ব বা সাহস। এই সাহসটাই কি পারহেসিয়া—যে পারহেসিয়ার বলি হইছিলেন সক্রেটিস?
এই বীরত্ব বা সাহসের সমস্যা হচ্ছে এইটা ক্ষমতার নিয়মরে মান্য করার পরেই বীরত্ব বা সাহস।
বোঝা গেল কি?
মানে হইল, ক্ষমতা উৎখাতের ক্ষেত্রে কৌশল বা মিথ্যাকে বাদ দিতে বলে এটি।
অর্থাৎ ক্ষমতা উৎখাতের ক্ষেত্রে মিথ্যাকে বাদ দিতে গিয়া কৌশলকেও বাদ দিতে হয়।
কেন এই রকম বলে?
৯.
বলে কারণ বিবেক বা পারহেসিয়া মনে করে, ক্ষমতাকে উৎখাত করা যাবে না। কারণ ক্ষমতা পবিত্র, ক্ষমতা মানেই ঐশ্বরিক বা জনতার ক্ষমতা।
জনতার ক্ষমতা যারা দখল করে তাদেরকে সত্য বা ঐশ্বরিকতার মাধ্যমেই সরানো যাইতে পারে, এই ধর্মচিন্তার গ্রাহক গ্রিকরা, ফুকোও কি?
অথচ সত্য বা ঐশ্বরিকতা, পারহেসিয়া বা বিবেক এবং পদ্ধতি বা ক্ষমতার এই আকার আদৌ এই আকারে থাকবে নাকি ধূলিস্মাৎ হবে তা ঠিক করারই ভার বুদ্ধিজীবীদের উপর।
বুদ্ধিজীবী অ্যাকটিভিস্ট নন। সত্য, সাহস ও ক্ষমতা তার পথ নয়।
২৩/১১/২০২০
