বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ‘হলোকাস্ট’ বা ইহুদি নিধনযজ্ঞের পেছনে কেবল নাৎসিদের উগ্রবাদই দায়ী ছিল না, ছিল এক দানবীয় করপোরেট ও প্রযুক্তিগত যোগসাজশ। সেই অন্ধকার অধ্যায়কে ইতিহাসের পাতা থেকে টেনে বের করে এনেছেন প্রখ্যাত মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং ঐতিহাসিক এডউইন ব্ল্যাক।
এডউইন ব্ল্যাক একজন নিউইয়র্ক টাইমস বেস্ট-সেলিং লেখক, যিনি করপোরেট অপরাধ এবং ইতিহাসের গোপন যোগসূত্র উন্মোচনে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তার বাবা-মা দুজনেই ছিলেন পোলিশ ইহুদি এবং হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফেরা মানুষ। ফলে এই বিষয়ের প্রতি তার দায়বদ্ধতা কেবল পেশাদার নয়, বরং ব্যক্তিগত। তার কালজয়ী এবং বিতর্কিত গ্রন্থ “IBM and the Holocaust” প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, যা তাকে পুলিৎজার পুরস্কারের মনোনয়নও এনে দিয়েছিল।
নিবন্ধটি মূলত ২০০২ সালে বিখ্যাত আমেরিকান ঐতিহাসিক পোর্টাল History News Network (HNN)-এ প্রকাশিত হয়। এটি এমন এক সময়ে ছাপা হয় যখন আইবিএম তাদের জার্মান শাখার ওপর নিয়ন্ত্রণহীনতার দোহাই দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ব্ল্যাক নতুন নতুন নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, নাৎসিদের এই বিশাল মৃত্যু-মিশন সফল করতে আইবিএম-এর নিউ ইয়র্ক সদর দপ্তর সরাসরি কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল।
এই নিবন্ধের কেন্দ্রবিন্দু হল আইবিএম-এর ‘পাঞ্চ কার্ড প্রযুক্তি’। এটি কেবল একটি আদমশুমারি যন্ত্র ছিল না, বরং এটি ছিল নাৎসিদের জন্য একটি “ডিজিটাল ডেথ ওয়ারেন্ট”। কীভাবে একটি আমেরিকান কোম্পানি মুনাফার লোভে পোল্যান্ডে বিশেষ শাখা খুলেছিল এবং কীভাবে তাদের উদ্ভাবিত তথ্যের জাল ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে ট্রেনের মাধ্যমে গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হয়েছিল—সেই রুদ্ধশ্বাস এবং বেদনাদায়ক সত্যই এই লেখার মূল বিষয়।
আইবিএম: আর এভাবেই ট্রেনগুলি সময়মত চলত
এডউইন ব্ল্যাক
হিটলার যখন ক্ষমতায় এলেন, মানবতার জন্য এক হুমকি দেখতে পেল সারা বিশ্ব। কিন্তু আইবিএম নাৎসি জার্মানিকে দেখেছিল একটি লাভজনক ব্যবসায়িক অংশীদার হিসাবে। দ্রুতই এর প্রেসিডেন্ট থমাস জে. ওয়াটসন আইবিএম এবং রাইখ-এর (নাৎসি শাসন) মধ্যে একটি কৌশলগত ব্যবসায়িক জোট গড়ে তোলেন, যা হিটলার শাসনের প্রথম দিনগুলি থেকে শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই জোট মুহূর্তের মধ্যে নাৎসি জার্মানিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আইবিএম-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকে পরিণত করে। এই কৌশলগত জোটের অংশ হিসাবে, আইবিএম এবং নাৎসিরা যৌথভাবে নকশা করে এবং আইবিএম একচেটিয়াভাবে উৎপাদন করে এমন সব প্রযুক্তিগত সমাধান, যা হিটলারকে ইহুদি নিধনের মূল ধাপগুলিকে ত্বরান্বিত এবং স্বয়ংক্রিয় করতে সাহায্য করেছিল। যেটার বিস্তৃতি কিনা প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং সামাজিক বর্জন থেকে শুরু করে সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, ঘেটোতে বন্দি করা, নির্বাসন এবং শেষ পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা পর্যন্ত।
সম্প্রতি আবিষ্কৃত নাৎসি নথি এবং পোলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য স্পষ্ট করে দেয় যে, থার্ড রাইখের সাথে আইবিএম-এর এই জোট কেবল তাদের জার্মান শাখা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না। পোল্যান্ড দখল এবং পোলিশ হলোকাস্টের সময়, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল এবং একটি জাতিকে লুণ্ঠন করা হয়েছিল, সেখানে আইবিএম প্রযুক্তি ছিল একটি মূল নিয়ামক। সেই বিশেষভাবে তৈরি করা প্রযুক্তি কোনো জার্মান শাখার মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি নিউ ইয়র্কের আইবিএম সদর দপ্তরের (ম্যানহাটনের ৫৯০ এন. ম্যাডিসন) অধীনে থাকা একটি নতুন পোলিশ শাখার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল।
আর এভাবেই ট্রেনগুলি সময়মত অশউইজে (Auschwitz) পৌঁছাত।
আইবিএম-এর জন্য সুসংবাদ
ওয়াটসন শুরুতেই বুঝেছিলেন যে, একটি পুনর্গঠনশীল সরকার, বিশেষ করে যে সরকার তার সমাজের ওপর কঠোর নজরদারি চালায়, তা আইবিএম-এর জন্য সুসংবাদ। যত বেশি ফরম, যত বেশি রিপোর্ট, যত বেশি নিবন্ধন আর পরিসংখ্যান—আইবিএম লাল ফিতার দৌরাত্ম্যেই সমৃদ্ধ হত।
১৯৩৩ সালে থার্ড রাইখ ওয়াটসনকে এমন এক পর্যায়ে নাৎসি সরকারের নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান, নজরদারি এবং কঠোর শৃঙ্খলার সুযোগ করে দেয় যা আগে কখনও দেখা যায়নি। হিটলার তার সাম্রাজ্য অন্য দেশগুলিতেও বিস্তার করার পরিকল্পনা করায় সম্ভাব্য মুনাফার পরিমাণ আরও বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রযুক্তি সরবরাহের বাজার প্রায় একচেটিয়াভাবে আইবিএম-এর দখলে ছিল কারণ প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের পাঞ্চ কার্ড এবং সর্টার (তথ্য বাছাইকারী যন্ত্র) বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
নৈতিক দ্বিধার কথা বলতে গেলে, আইবিএম-এর জন্য এর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। নাৎসিদের কাস্টমাইজড প্রযুক্তি এবং যৌথ পরিকল্পনা সরবরাহ করার বিষয়ে কোনো বিতর্কও হয়নি। আইবিএম সংক্রান্ত হাজার হাজার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, নাৎসি বাজারে আইবিএম-এর একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখা, প্রতিযোগীদের হঠিয়ে দেওয়া এবং বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য নিয়মিত চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু থার্ড রাইখকে স্বয়ংক্রিয় করার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বা ইহুদিদের গণহত্যার খবর হেডলাইনে আসার পর সম্পর্ক স্থগিত করার বিষয়ে একটি বাক্যও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হিটলার ক্ষমতা নেওয়ার পরপরই নাৎসি জার্মানি দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আইবিএম-এর সবচেয়ে মূল্যবান মক্কেল হয়ে ওঠে। আইবিএম-এর জার্মান শাখা ছিল ‘ডয়েচে হোলারিখ মেশিনেন গেজেলশ্যাফ্ট’, যা ‘ডিহোম্যাগ’ (Dehomag) নামে পরিচিত। ওয়াটসন এই লাভজনক জার্মান কার্যক্রম অত্যন্ত কঠোরভাবে পরিচালনা করতেন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত তিনি বছরে অন্তত দুবার বার্লিনে যেতেন ডিহোম্যাগ ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করতে। এমনকি জার্মান ম্যানেজাররা যদি অফিসের করিডোর রঙ করতে চাইতেন, তবে তার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হত। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জার্মান চিঠিপত্র নিউ ইয়র্ক অফিসে পর্যালোচনার জন্য অনুবাদ করা হত এবং ওয়াটসন নিজেই প্রায়ই সেগুলি পড়তেন। বড় কোনো নতুন অ্যাকাউন্ট গ্রহণ করার আগে ওয়াটসনের সম্মতি নিতে হত।
তিনি জার্মান ম্যানেজারদের লিখিত চুক্তির চেয়ে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়াকেই বেশি পছন্দ করতেন। প্রায়ই ডিহোম্যাগ ম্যানেজাররা তার এই “প্রভুত্বের” প্রতিবাদ করতেন, বিশেষ করে যেহেতু শাখার উপবিধিতে জার্মান সাবসিডিয়ারির যেকোনো পদক্ষেপের ওপর তার ব্যক্তিগত ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা ছিল।
ওয়াটসনের অডিটররা প্রতিটি ‘মার্ক’ এবং ‘ফেনি’ (জার্মান মুদ্রা) এর উৎস এবং অবস্থা ট্র্যাক করতেন—এমনকি মাত্র কয়েক ডলারের হিসাব নিয়েও আটলান্টিকের এপার-ওপার অনেক চিঠি বিনিময় হয়েছে। স্বভাবতই, বার্লিনের আইবিএম আইনজীবী এবং ম্যানেজাররা ওয়াটসনকে নিয়মিত আপডেট দিতেন এবং তাদের রিপোর্টের নিচে লিখতেন, “আপনার পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায়।”
কোনো মেশিন বিক্রি করা হত না—কেবল লিজ দেওয়া হত। আইবিএম ছিল সমস্ত পাঞ্চ কার্ড এবং যন্ত্রাংশের একমাত্র উৎস এবং তারা তাদের অনুমোদিত ডিলার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরাসরি সাইটে মেশিনগুলি মেরামত করত। কোনো সার্বজনীন পাঞ্চ কার্ড ছিল না। প্রতিটি সিরিজের কার্ড আইবিএম ইঞ্জিনিয়াররা কাস্টম-ডিজাইন করতেন যাতে কেবল তথ্য ইনপুটই নয়, বরং নাৎসিরা যে ফলাফল চায় তা সঠিকভাবে বেরিয়ে আসে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সিরিজের পাঞ্চ কার্ড নকশা করা হয়েছিল কেবল ধর্ম, জাতীয়তা এবং মাতৃভাষা রেকর্ড করার জন্য নয়, বরং বিশেষ বিভাগ যেমন: ইহুদি, পোলিশ ভাষা, পোলিশ জাতীয়তা, পেশা হিসাবে পশম ব্যবসা এবং বার্লিন শহরকে চিহ্নিত করার জন্য।
নাৎসিরা খুব দ্রুত ক্রস-ট্যাবুলেশন করে বের করতে পারত ঠিক কতজন বার্লিন পশম ব্যবসায়ী পোলিশ বংশোদ্ভূত ইহুদি। রেলগাড়ি, যা খুঁজে বের করতে বা রুট ঠিক করতে আগে দুই সপ্তাহ সময় লাগত, তা পাঞ্চ কার্ড মেশিনের বিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হত। আইবিএম পরিষেবা ইউরোপ জুড়ে সমগ্র জার্মান অবকাঠামোর মধ্যে প্রবাহিত ছিল।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। জার্মানি উত্তর-পশ্চিম পোল্যান্ড দখল করে নেয়। বাকি পোলিশ অঞ্চলকে “অধিকৃত” হিসাবে গণ্য করা হয় এবং যার নাম দেওয়া হয় “জেনারেল গভর্নমেন্ট”। সেই উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্ব ছিল আইবিএম-এর জার্মান শাখা ডিহোম্যাগ-এর ওপর। অধিকৃত পোল্যান্ডে ডিহোম্যাগ মূলত সাইলেশিয়ান কয়লা খনি এবং ভারি শিল্পের পে-রোল বা বেতন ব্যবস্থাপনার কাজ করত।
ওয়াটসন বিজনেস মেশিনস
ঠিক সেই সময়ে, আইবিএম নিউ ইয়র্ক তাদের জার্মান শাখা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি নতুন শাখা প্রতিষ্ঠা করে। আইবিএম-এর এই নতুন পোলিশ কোম্পানির নাম ছিল ‘ওয়াটসন বিজনেস মেশিনস’। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পোল্যান্ড দখলের সময় নাৎসিদের সেবা দেওয়া। পোলিশ এই সাবসিডিয়ারিটি নাৎসিদের কাছে ‘ওয়াটসন ব্যুরোমেশিনেন’ (Watson Büromaschinen) নামেও পরিচিত ছিল। এই উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন ছিল ডজন ডজন কাস্টম-ওয়্যার্ড পাঞ্চ কার্ড মেশিন এবং প্রতিটি কাজের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা ও ছাপানো লক্ষ লক্ষ পাঞ্চ কার্ড। সেই সময়ে আইবিএম-এর জন্য থার্ড রাইখকে সেবা দেওয়া সম্পূর্ণ আইনি ছিল। এবং ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে আমেরিকা যুদ্ধে প্রবেশের আগ পর্যন্ত এটি বৈধই ছিল।
পোল্যান্ডের ওপর এই নৃশংসতার খবর আইবিএম নির্বাহীদের অজানা ছিল না। শুরু থেকেই বিশ্বজুড়ে হেডলাইন আসছিল বর্বর হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, পরিকল্পিত অনাহার, নিয়মতান্ত্রিক নির্বাসন এবং মহামারি সম্পর্কে। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালের মধ্যেই ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ খবর দিয়েছিল যে রাইখ পোলিশ ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর, যার শিরোনাম ছিল: “নাৎসিরা পোল্যান্ডে ইহুদি নিধনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।” একটি সাব-হেডলাইন ছিল: “৩,০০০,০০০ জনসংখ্যা জড়িত।” নিবন্ধটিতে ইউরোপীয় ডোমেইন থেকে “পোলিশ ইহুদি জনসংখ্যা অপসারণ” করার জন্য জার্মান সরকারের পরিকল্পনার কথা উদ্ধৃত করা হয়েছিল। টাইমস আরও যোগ করেছিল, “কীভাবে… নির্মূল করা ছাড়া পোল্যান্ড থেকে ইহুদিদের ‘অপসারণ’ সম্ভব… তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।”
কিন্তু জার্মানির পরিকল্পনা ছিল। পোলিশ ইহুদিদের ধারাবাহিক আদমশুমারি এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছিল যাতে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রাখা যায় এবং সেই তথ্য নাৎসিদের বিভিন্ন পরিকল্পনা সংস্থা ও অধিকৃত অফিসগুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। অস্ত্র কারখানার জন্য তাদের কাছ থেকে কতটুকু শ্রম পাওয়া যাবে? নাৎসিদের তৈরি অনাহারী পরিবেশে মাস থেকে মাসে কত হাজার মানুষ মারা যাবে? নাৎসি আদমশুমারি, নিবন্ধন এবং পরিসংখ্যানগত সারণির এই পুরো বর্ণালীটি আইবিএম-এর কাস্টম-মেড পাঞ্চ কার্ড প্রোগ্রাম এবং যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছিল।
প্রথমে পোল্যান্ডের সাথে আইবিএম-এর সম্পৃক্ততা তাদের জার্মান শাখা ডিহোম্যাগ-এর মাধ্যমে পরিচালিত হত। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে ডিহোম্যাগ-এর জেনারেল ম্যানেজার হারম্যান রটকে নিউ ইয়র্কে ওয়াটসনকে সরাসরি চিঠি লিখে উন্নত আলফাবেটাইজার চেয়ে পাঠান। তিনি তাকে মনে করিয়ে দেন:
“জুলাইয়ের শুরুতে বার্লিনে আপনার শেষ সফরের সময়, আপনি আমাকে সদয় প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে আপনি আমাদের দীর্ঘ ডেলিভারি সময় কমানোর জন্য এন্ডিকট [নিউ ইয়র্ক] থেকে জার্মান কোম্পানিকে মেশিন সরবরাহ করতে ইচ্ছুক হতে পারেন… আপনি এই অনুরোধটি পালন করেছেন, যার জন্য আমি আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই, এবং যোগ করেছেন যে জরুরি প্রয়োজনে আমি অন্যান্য আমেরিকান মেশিন ব্যবহার করতে পারি… আপনি বুঝতে পারবেন যে আজকের পরিস্থিতিতে এমন কিছু মেশিনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে যা আমরা জার্মানিতে এখনও তৈরি করি না। তাই, আমি আপনার সদয় প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে চাই এবং জার্মান কোম্পানির কাছে বর্ণানুক্রমিক ট্যাবুলিং মেশিনগুলি রেখে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি…”
২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে, পরাজিত ওয়ারশ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করার পরের দিন, জেনেভাতে আইবিএম-এর ইউরোপীয় জেনারেল ম্যানেজার জে. ডব্লিউ. শোট্টে ওয়াটসনের অনুমতি নিশ্চিত করার জন্য বার্লিনে টেলিফোন করেন। কোম্পানির নোটে সেই কলের “বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের” কথা লিপিবদ্ধ আছে।
ইতিমধ্যে, হিমলারের নিরাপত্তা সংস্থা এসডি (SD)-এর প্রধান রেইনহার্ড হাইড্রিক অধিকৃত অঞ্চলে কর্মরত তার ঘাতক বাহিনী ‘আইনসাৎজগ্রুপেন’ (Einsatzgruppen)-এর প্রধানদের কাছে একটি টপ সিক্রেট এক্সপ্রেস লেটার পাঠান। হাইড্রিকের ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালের মেমোর শিরোনাম ছিল: “অধিকৃত ভূখণ্ডে ইহুদি প্রশ্ন”। এটি শুরু হয়েছিল এভাবে: “আমি আবারও বলতে চাই যে পরিকল্পিত মোট ব্যবস্থাগুলি (অর্থাৎ চূড়ান্ত লক্ষ্য) কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে।”
মেমোতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, প্রথম পদক্ষেপ ছিল কৌশলগত আদমশুমারি এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। প্রথমে ইহুদিদের তথাকথিত কনসেন্ট্রেশন টাউনে স্থানান্তরিত করতে হবে যেগুলি “হয় রেলওয়ে জংশনে অবস্থিত অথবা অন্তত একটি রেললাইনের পাশে।” ক্রাকোর পূর্ব থেকে সাবেক স্লোভাক-পোলিশ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে হাইড্রিক নির্দেশ দেন, “এই ভূখণ্ডের মধ্যে ইহুদিদের কেবল একটি অস্থায়ী আদমশুমারি নেওয়া প্রয়োজন।”
হাইড্রিক দাবি করেছিলেন যে “আইনসাৎজগ্রুপেন প্রধানরা ক্রমাগত তাদের জেলার ইহুদিদের আদমশুমারি সম্পর্কে আমাকে রিপোর্ট করবেন…”
এর পরপরই, হাইড্রিক পোল্যান্ড, আপার সাইলেশিয়া এবং চেকোস্লোভাকিয়ার দখলদার বাহিনীর কাছে একটি ফলো-আপ কেবল পাঠান। এই কেবলে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল কীভাবে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৯ সালে নির্ধারিত একটি নতুন আদমশুমারি প্রক্রিয়াটি কেবল শনাক্তকরণ এবং ক্যাটালগিং থেকে নির্বাসন এবং মৃত্যুদণ্ডে নিয়ে যাবে, কারণ মানুষকে দ্রুত পোলিশ ঘেটোতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল পরবর্তী ধাপের অপেক্ষায়।
হাইড্রিকের মেমো, যার শিরোনাম ছিল “নতুন পূর্ব প্রদেশগুলির উচ্ছেদ” (Evacuation of the New Eastern Provinces), নির্দেশ দিয়েছিল:
“নতুন পূর্ব প্রদেশগুলিতে পোল এবং ইহুদিদের উচ্ছেদ নিরাপত্তা পুলিশ দ্বারা পরিচালিত হবে… আদমশুমারি নথিগুলি উচ্ছেদের ভিত্তি প্রদান করে। নতুন প্রদেশের সমস্ত ব্যক্তির কাছে একটি অনুলিপি রয়েছে। আদমশুমারি ফরমটি হল থাকার অনুমতি দেওয়ার অস্থায়ী পরিচয়পত্র। তাই উচ্ছেদের আগে সব ব্যক্তিকে কার্ডটি হস্তান্তর করতে হবে… এই কার্ড ছাড়া কাউকে পাওয়া গেলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে… অনুমান করা হচ্ছে যে আদমশুমারি ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৯ তারিখে হবে।”
পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের নির্বাসন পরিমাপ এবং সংগঠিত করতে কত সময় লাগত? কাগজ ও পেন্সিল ব্যবহার করলে কয়েক বছর লেগে যেত। হোলারিখ মেশিনের বিদ্যুতগতির ওপর নির্ভর করায় এতে মাত্র কয়েক দিন সময় লেগেছিল। নাৎসি জার্মানি আদমশুমারি পরিচালনার জন্য কেবল একটি পদ্ধতিই ব্যবহার করত: আইবিএম পাঞ্চ কার্ড প্রসেস, যার প্রতিটি ছিল নির্দিষ্ট আদমশুমারির জন্য কাস্টম-ডিজাইন করা।
মেশিনের ওপর নিউ ইয়র্কের নিয়ন্ত্রণ
নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ডে আইবিএম-এর সম্পৃক্ততা অব্যাহত ছিল, কিন্তু এবার নিউ ইয়র্ক নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষ সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে যার নাম ছিল ‘ওয়াটসন বিজনেস মেশিনস’, যার সদর দপ্তর ছিল ওয়ারশর ক্রুজ ২৩-এ।
ওয়াটসন বিজনেস মেশিনসের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক সাইট, যা নতুন আবিষ্কৃত হয়েছে, সেটি ছিল ক্রাকোর ২২ পাভিয়া স্ট্রিটে অবস্থিত পোলিশ রেলওয়ের হোলারিখ বিভাগ। এই অফিসটি জেনারেল গভর্নমেন্টের সমস্ত ট্রেনের ওপর নজর রাখত, যার মধ্যে সেই ট্রেনগুলিও ছিল যেগুলি ইহুদিদের ট্রেবলিংকা এবং অশউইজে মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে দিত। লিওন ক্রজেমিয়েনিকি সম্ভবত একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি সেই হোলারিখ বিভাগে কাজ করেছিলেন। তবে এটি গুরুত্ব দিয়ে বলতে হবে যে, ক্রজেমিয়েনিকি সেই ঘাতক ট্রেনগুলির গন্তব্যের কোনো বিবরণ বুঝতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে তার দায়িত্ব ছিল সাধারণ যাত্রী থেকে মালবাহী ট্রেন পর্যন্ত সমস্ত ট্রেনের তথ্য সারণিবদ্ধ করা। সশস্ত্র রেলওয়ে পুলিশ দ্বারা পাহারা দেওয়া উচ্চ-নিরাপত্তার পাঁচ কক্ষের সেই অফিসটি পনেরোটি পাঞ্চার, দুটি সর্টার এবং “সোফার চেয়ে বড়” একটি ট্যাবুলেটর দিয়ে সজ্জিত ছিল।
পনেরো জন পোলিশ মহিলা কার্ডগুলি পাঞ্চ করতেন এবং সর্টারগুলি লোড করতেন। তিনজন জার্মান নাগরিক অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে চূড়ান্ত সারণি এবং সারসংক্ষেপ পরিসংখ্যান তদারকি করতেন। এক মুঠো প্রিন্ট-আউটকে একটি ছোট খামে সারসংক্ষেপ তথ্যে রূপান্তর করা হত, যা পরে একটি গোপন গন্তব্যে পাঠানো হত। ক্রজেমিয়েনিকি স্মরণ করেন যে ট্রাক ভর্তি প্রাথমিক প্রিন্ট-আউট এবং ব্যবহৃত কার্ডগুলি নিয়মিত পুড়িয়ে ফেলা হত।
একজন জোরপূর্বক শ্রমিক (forced laborer) হিসাবে ক্রজেমিয়েনিকি দুই বছর ধরে দিনে দশ ঘণ্টা “সর্টার এবং ট্যাবুলেটর” হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি কখনোই উপলব্ধি করেননি যে তার কাজ ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে পরিবহনের সাথে জড়িত। তিনি বলেছেন, “আমি শুধু জানি যে এই আধুনিক সরঞ্জামগুলি জেনারেল গভর্নমেন্টের সমস্ত রেলওয়ে ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব করেছিল।”
ক্রজেমিয়েনিকি বর্ণনা করেন যে একজন “বাইরের টেকনিশিয়ান”, যিনি জার্মান এবং পোলিশ বলতে পারতেন এবং “রেলওয়ের জন্য কাজ করতেন না”, মেশিনগুলি চালু রাখার জন্য প্রায় সবসময় সেখানে থাকতেন। সেই টেকনিশিয়ান সাধারণত মাসে একবার মেশিনগুলির বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন।
নিউ ইয়র্কে আইবিএম-এর মুখপাত্র ক্যারল মাকোভিচ এক বছরেরও বেশি সময় আগে দেওয়া একই আনুষ্ঠানিক বিবৃতির পুনরাবৃত্তি করেন: “এই সময়কাল সম্পর্কে আইবিএম-এর কাছে খুব বেশি তথ্য নেই।”
আইবিএম-এর তৈরি বিশেষ রেলওয়ে ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম, ওয়ারশ ঘেটোর উল্টাদিকে আইবিএম-এর ৬ রিমারস্কা প্রিন্ট শপে ছাপা হওয়া কয়েক মিলিয়ন কাস্টম-ডিজাইন করা পাঞ্চ কার্ড এবং রেলওয়ের লিজ নেওয়া মেশিনগুলি জার্মান শাখার অধীনে ছিল না, বরং ছিল নিউ ইয়র্ক নিয়ন্ত্রিত ওয়ারশর সেই শাখার অধীনে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে হলোকাস্টে আইবিএম-এর সম্পৃক্ততার তথ্য প্রথম জনসমক্ষে আসার পর থেকে কোম্পানিটি ক্রমাগত দাবি করে আসছে যে তাদের জার্মান শাখার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিন্তু ওয়াটসন বিজনেস মেশিনস পোল্যান্ডে আইবিএম নিউ ইয়র্ক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নাৎসি আক্রমণের পর, যাতে রাইখ-এর লুণ্ঠন এবং জাতিগত নিধন কার্যক্রম থেকে মুনাফা অর্জন করা যায়।
ক্রজেমিয়েনিকি স্মরণ করেন, “আমি জানতাম ওগুলি জার্মান মেশিন ছিল না। লেবেলগুলি ছিল ইংরেজিতে… যে ব্যক্তি মেশিনগুলি রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামত করতেন তিনি মাঝে মাঝে ডায়াগ্রামগুলি ছড়িয়ে রাখতেন। সেই মেশিনগুলির ডায়াগ্রামের ভাষা ছিল কেবল ইংরেজি।”
আমি ক্রজেমিয়েনিকিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম মেশিনের লোগো প্লেটগুলি জার্মান, পোলিশ নাকি ইংরেজিতে ছিল। তিনি উত্তর দিলেন, “ইংরেজি। এতে লেখা ছিল ‘Business Machines’।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস (IBM) বোঝাচ্ছেন?” ক্রজেমিয়েনিকি উত্তর দিলেন, “না, ‘ওয়াটসন বিজনেস মেশিনস’।” সেটিই ছিল সঠিক উত্তর। পোল্যান্ডে আইবিএম নিউ ইয়র্কের নতুন শাখাটি জার্মান আইনি নাম ‘ওয়াটসন ব্যুরোমেশিনেন’ নামে চলত। কিন্তু পোলিশ মেশিনগুলিতে গর্বের সাথে ইংরেজিতে সাবসিডিয়ারির নাম সম্বলিত লোগো ট্যাগ লাগানো ছিল: ‘Watson Business Machines’। ওয়াটসন নিজের নাম দিয়ে বেশ কয়েকটি আইবিএম সাবসিডিয়ারি তৈরি করেছিলেন, যার প্রতিটি একটি নির্দিষ্ট জাতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ওয়াটসন বেলজ ছিল বেলজিয়ান সাবসিডিয়ারি। ওয়াটসন ইতালিয়ানা ইতালীয় কোম্পানি হিসাবে কাজ করত। সুইডেনে এটি ছিল সোভেনস্কা ওয়াটসন। অনেক জায়গায় ‘ওয়াটসন’ এবং ‘আইবিএম’ নাম দুটি ছিল সমার্থক এবং অবিচ্ছেদ্য।
পোল্যান্ডের রেলওয়ে কার্যক্রমের চেয়েও বড় ছিল ক্রাকোর ২৪ মুর্নারস্ট্রাসে অবস্থিত বিশাল হোলারিখ পরিসংখ্যান কেন্দ্র, যেখানে ৫০০ জনেরও বেশি পাঞ্চিং এবং ট্যাবুলিং কর্মী এবং ডজন ডজন মেশিন ছিল। নতুন গবেষণায় বার্লিনের একটি পূর্বে অজানা সংস্থা ‘সেন্ট্রাল অফিস ফর ফরেন স্ট্যাটিস্টিকস অ্যান্ড ফরেন কান্ট্রি রিসার্চ’-এর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা ক্রাকোর পরিসংখ্যান অফিস থেকে ক্রমাগত বিস্তারিত তথ্য গ্রহণ করত। এই অফিস সম্পর্কে নতুন আবিষ্কারগুলি পোল্যান্ডের সমস্ত তথ্য কোথায় প্রসেস করা হত সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে আক্রমণের দিন থেকেই অধিকৃত পোল্যান্ড জুড়ে হোলারিখ-সজ্জিত নাৎসি অফিসগুলি কাজ করছিল। আমেরিকা তখনও যুদ্ধে ছিল না। ফলে আইবিএম পোল্যান্ড আক্রমণের প্রাথমিক সময় জুড়ে হিটলার শাসনকে পূর্ণ বাণিজ্যিক সমর্থন দিয়ে গিয়েছিল। এই কৌশলগত বাণিজ্যিক সমর্থনের অংশ হিসাবে, আইবিএম নিউ ইয়র্ক নাৎসি পরিসংখ্যান মেশিনের এত বিশাল সংস্থাপন করতে সম্মত হয়েছিল যে একে কেবল হোলারিখ বিভাগ নয়, বরং ‘হোলারিখ গ্রুপে’ (Hollerith Gruppe) বলা হত। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি নাৎসিদের পোল্যান্ডে পরিকল্পিত লুণ্ঠন এবং বশীকরণ সংগঠিত করার পাশাপাশি পোলিশ নাগরিকদের জন্য অন্যান্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছিল।
পরিসংখ্যানের জাদুকর
২ নভেম্বর ১৯৩৯ সালের মধ্যে রাইখ-এর ইহুদি-জনসংখ্যা পরিসংখ্যান জাদুকর ফ্রিটজ আরল্টকে জেনারেল গভর্নমেন্টের জনসংখ্যা ও কল্যাণ প্রশাসনের প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। আরল্ট ছিলেন একজন হোলারিখ বিশেষজ্ঞ এবং আইখম্যানের সহকর্মী। তিনি তার নিজস্ব পরিসংখ্যান প্রকাশনা ‘পলিটিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস অফ দ্য জেনারেল গভর্নমেন্ট’ সম্পাদনা করতেন। সেই প্রকাশনায় প্রতি বর্গ মিটারে ইহুদি জনসংখ্যার মত বিস্তারিত তথ্য থাকত এবং জোরপূর্বক শ্রম ও অনাহারের মত আরোপিত পরিস্থিতির ফলে জনসংখ্যা হ্রাসের সম্ভাব্য প্রক্ষেপণ (projections) দেখানো হত। আরল্টের একটি নিবন্ধে দাবি করা হয়েছিল, “আমরা কিছু বশীভূত গোষ্ঠীর মৃত্যুহারের ওপর নির্ভর করতে পারি। এর মধ্যে রয়েছে শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিরা, সেইসাথে অন্যান্য বয়সের যারা মূলত দুর্বল ও অসুস্থ।”
দ্রুতই তথ্য-ক্ষুধার্ত নাৎসিরা ক্রাকোতে একটি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অফিস স্থাপনের নির্দেশ দেয়। ১৯৪০ সালের এপ্রিলের মধ্যে নাৎসিরা একজন জার্মান পরিসংখ্যান বিশেষজ্ঞ এবং পোলিশ পরিসংখ্যান সার্ভিসের প্রাক্তন কর্মীদের নিয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে। এই গ্রুপটি আগে থেকে সরবরাহ করা সমস্ত হোলারিখ মেশিন এবং স্টাফসহ ওয়ারশ থেকে ক্রাকোর নতুন নাৎসি সংস্থায় স্থানান্তরিত হয়।
সেপ্টেম্বর ১৯৪০ সালের মধ্যে রাইখ পোল্যান্ডে পরিসংখ্যানের জন্য একটি ডিক্রি জারি করে নতুন সম্প্রসারিত “পরিসংখ্যান অফিস” তৈরি করে। কয়েক মাসের মধ্যে ক্রাকোর ২৪ মুর্নারস্ট্রাসের পরিসংখ্যান অফিস পোল্যান্ডের অন্যান্য পরিসংখ্যান কার্যক্রমকে নিজের অধীনে নিয়ে নেয়। এই পরিসংখ্যান অফিসটি ছয়টি পৃথক গ্রুপে বিভক্ত ছিল—গ্রুপ ১: প্রশাসন; গ্রুপ ২: জনসংখ্যা ও সংস্কৃতি; গ্রুপ ৩: খাদ্য ও কৃষি; গ্রুপ ৪: অর্থনৈতিক বাণিজ্য ও পরিবহন; গ্রুপ ৫: সামাজিক পরিসংখ্যান; এবং গ্রুপ ৬: অর্থ ও কর। ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ সালের একটি পরিসংখ্যান অফিসের রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: “হোলারিখ গ্রুপে-র কাজের ক্ষেত্র সমস্ত বিষয় জুড়ে বিস্তৃত,” এবং যোগ করা হয়েছে যে একটি বড় সম্প্রসারণ পরিকল্পনার মাধ্যমে কর্মীর সংখ্যা এক মাসের মধ্যে ৫০০ জনে উন্নীত করা হবে।

এই সম্প্রসারণ নির্ভর ছিল আরও লিজ নেওয়া মেশিন, যন্ত্রাংশ, কোম্পানির টেকনিশিয়ান এবং লক্ষ লক্ষ অতিরিক্ত আইবিএম কার্ডের গ্যারান্টিযুক্ত সরবরাহের ওপর। যেহেতু হোলারিখ মেশিনের অর্ডার ডেলিভারি দিতে এক বছর বা তার বেশি সময় লাগত, তাই আইবিএম-এর দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিনগুলি থেকেই ছিল। প্রকৃতপক্ষে সেই ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ সালের পরিসংখ্যান অফিসের রিপোর্টটি লেখা হয়েছিল আইবিএম-এর ইউরোপীয় জেনারেল ম্যানেজার ওয়ার্নার লিয়ার কর্তৃক বার্লিন সফরের ঠিক কয়েক সপ্তাহ পরে। লিয়ার ১৯৪১ সালের অক্টোবরের শুরুতে বার্লিন সফর করেছিলেন পোল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশে আইবিএম নিউ ইয়র্কের মেশিনের ব্যবহার তদারকি করতে। ইউরোপীয় কার্যক্রম সম্পর্কে দুটি বিস্তারিত রিপোর্টে, যা সরাসরি ওয়াটসন এবং নিউ ইয়র্কের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, লিয়ার রিপোর্ট করেছিলেন যে রুমানিয়ায় ইহুদি আদমশুমারির জন্য পোল্যান্ড থেকে একটি ছোট মেশিন গ্রুপ সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে অন্য হোলারিখ মেশিনগুলি তাদের জায়গা পূরণ করে নিয়েছিল।
ক্রাকো পরিসংখ্যান অফিসের সেই ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ সালের রিপোর্ট বার্লিনকে আশ্বস্ত করেছিল: “হোলারিখ গ্রুপে-র কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে যে বছরের শেষের দিকে সরঞ্জামগুলি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে এবং সম্ভাব্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ শুরু করা যেতে পারে।”
পরিসংখ্যান অফিস বার্লিনকে আরও আশ্বস্ত করেছিল যে তাদের ‘হোলারিখ গ্রুপে’ প্রাক-যুদ্ধকালীন পোলিশ সংস্থাগুলিতে পাওয়া পুরোনো আইবিএম যন্ত্রপাতির চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করবে, যার ফলে নাৎসি অফিসটি প্রচুর পরিমাণে “বৃহৎ আকারের আদমশুমারি” শুরু করতে পারবে। সবকিছু গণনা করা হবে, এবং ঘন ঘন। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “বছরের শুরু থেকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল আদমশুমারি—জনসংখ্যা ও পেশাভিত্তিক আদমশুমারি—প্রস্তুত করা হচ্ছে।”
বিশেষ আদমশুমারি ছাড়াও রিপোর্টটিতে “নিরবচ্ছিন্ন পরিসংখ্যানগত সমীক্ষার” একটি দীর্ঘ তালিকা দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল জনসংখ্যা, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, সংক্রামক ব্যাধি এবং মৃত্যুর কারণ। তদুপরি, নিয়মিত খাদ্য ও কৃষি সমীক্ষাগুলি “জনসংখ্যা এবং জাতিগত গোষ্ঠীগুলির সারসংক্ষেপ সমীক্ষার সাথে যুক্ত” ছিল। জাতিগত সংখ্যার বিপরীতে খাদ্য সরবরাহের হিসাব রাখা নাৎসিদের ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ রেশন করার সুযোগ করে দিয়েছিল, কারণ তারা ইহুদি সম্প্রদায়কে ক্রমান্বয়ে অনাহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
পরিসংখ্যান অফিসের সেই ৩০ নভেম্বর ১৯৪১ সালের রিপোর্টটি এই বলে শেষ হয়েছিল, “আমাদের কাজ কেবল ফল দিতে শুরু করেছে।”
পার্ল হারবারের পর আইবিএম যেভাবে মুনাফা অব্যাহত রেখেছিল
১০ ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে প্রবেশের পর, রাইখ হারম্যান ফেলিঙ্গারকে—যিনি আইবিএম-এর প্রতি অনুরক্ত একজন নাৎসি ছিলেন—শত্রু সম্পত্তি রক্ষক (enemy property custodian) হিসাবে নিযুক্ত করে। তিনি মূল কর্মী ও ম্যানেজারদের বহাল রাখেন এবং ‘ওয়াটসন বিজনেস মেশিনস’কে রাইখ-এর জন্য উৎপাদনশীল এবং আইবিএম নিউ ইয়র্কের জন্য লাভজনক রাখেন। পোলিশ শাখাটি দক্ষতার সাথে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে, তবে এখন সেটি আইবিএম-এর জেনেভা অফিসের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কে রিপোর্ট করত। কোম্পানিটি লুণ্ঠন করা হয়নি, এর লিজ দেওয়া মেশিনগুলিও জব্দ করা হয়নি। তথাকথিত “রয়্যালটি” জেনেভার মাধ্যমে আইবিএম-এর কাছে পাঠানো হত। লিজ পেমেন্ট এবং মুনাফা বিশেষ অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত ছিল। যুদ্ধের পর আইবিএম তাদের সমস্ত পোলিশ মুনাফা এবং মেশিন ফিরে পেয়েছিল।
পোলিশ হলোকাস্টে আইবিএম-এর পোলিশ শাখার সম্পৃক্ততা নিয়ে যোগাযোগ করা হলে নিউ ইয়র্কে আইবিএম মুখপাত্র ক্যারল মাকোভিচ একই আনুষ্ঠানিক বিবৃতির পুনরাবৃত্তি করেন: “এই সময়কাল সম্পর্কে আইবিএম-এর কাছে খুব বেশি তথ্য নেই।” যতবারই জিজ্ঞেস করা হয়েছে, মাকোভিচ কেবল এই বাক্যটিই বলে গেছেন। এই বাক্যটিই হল এই বিষয়ের ওপর আইবিএম-এর ছয় অনুচ্ছেদের একমাত্র বিবৃতির মূল দাবি, যা এক বছরেরও বেশি সময় আগে জারি করা হয়েছিল এবং এখনও তাদের ওয়েবসাইটে রয়েছে।
মাকোভিচের এই অস্পষ্টতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আইবিএম-এর সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তারা তাদের ইতিহাস নিয়ে লেখা প্রায় প্রতিটি স্বাধীন লেখকের সাথে অসহযোগিতা বা বাধা প্রদান করে এসেছে।
কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর নীরবতা ঐতিহাসিক নথিপত্রকে পরিবর্তন করতে পারে না। ইউরোপ জুড়ে সাবসিডিয়ারিগুলির একটি জাল আইবিএমকে নাৎসি জার্মানির সাথে তাদের অংশীদারিত্বের সুবিধা নিতে সাহায্য করেছিল। এটি কখনোই ইহুদি-বিদ্বেষ বা নাৎসিবাদ নিয়ে ছিল না। এটি ছিল সবসময় টাকা নিয়ে। আইবিএম-এর ক্ষেত্রে “বিজনেস” বা ব্যবসাই ছিল সবকিছুর মূলে।
