ফয়সল নোই
১
মার ডাকে ঘুম ভাঙ্গনের লগে লগে ঝড়বাদলার দপটানি, একটা ঠাডার হব্দ আর কামের মাইয়া নাজমার চিক্কুইর এক লগে হুনি। হারাদিন মায় ছুতানাতায় নাজমারে পিডায়।
আমাগো নাড়ার ঘরের চালো গুপ গুপ কইররা বৃষ্টি পড়তেছে। বাপ আমার দুই পাও লুঙ্গির মইধ্যে লইয়া হের দুই পাও দিয়া প্যাঁচ দিয়া ঘ্যার ঘ্যার নাক ডাইক্কা ঘুম যাইতেছে। বাম আত দিয়া আমার গলা পেচাইন্না। আমারে লইয়া খাতার নিচে ডুব দিয়া রইচেন। আমি মোচড় দিয়া বাইর অইয়া আই।
ঘরভরা সাগর আলু পোড়া ঘ্রাণ। হওয়ালে খাওয়ানের লাইগ্গা মায় ঘুমের তন উইট্টাই আলু ভাজছে। মান্দার কাড পোড়া গন্ধও নাহ আইতাছে।
মাতার ধারে বেড়ার ফাক দিয়া হু হু কইররা বাতাস ডুইক্কা মশারি হুলাইয়া রাকছে। আমার শরীল কাডা দিয়া ওডে। মশারির উরপে একটা পাতিল পাতা। ফুডা চালের তন টুপ টুপ কইররা পানি পড়তে আছে।
চইর লগের কাডের জালানার খিল খুইল্লা দেহি ধাক্কাইয়া ধাক্কাইয়া ঠাণ্ডা বাতাস ঢোহে। বিষ্টির ছিডা আমার মোক বিজাইয়া দিল। সুপারি গাছ অদ্দেক বেকা অয়, ছোড ছোড জাম্বুরাগুলি একবার এই দিগ যায় ডোলতে ডোলতে আরেকবার অই দিগ যায়।
ছোবহান চাচাগো ঘরের ওডার সামনের তন পুরাডা উডান পানিত ডুইব্বা রইছে। আমাগো পইডা হোমান পানি। পুগুরের পানি বাইড়রা উডানে চইল্লা আইছে। অহনও জুমজুমাইন্না বিষ্টি।
আগুনের গোল্লা পড়ল যেমন। আরেকটা আসমান ফাডা ঠাডা পড়নের লগে লগে জালানা বন্ধ কইররা মাডিত নামি। আইজগা ইছকুলো যাওন লাগত না। পুরা রাস্তা পানিত ডুইব্বা গেছে মনে অয়। দরজার সামনের খালডাও নতুন পানি দিয়া ভইররা গেছে। অহনও হাক্কা বান্দা অয় নাই। ইছকুলো গেলে খাল হাতরাইয়া পারাইতে অইবো। কেউ যদি ভেউরকা বানাইয়া না থাহে। কাজী বাড়ির ইছকুলো ফাইবে পড়ি আমি। রুল নাম্বার তিন।
মা, ঝাহি জালডা কই গো?
চইত তলো দেখ।
চইত তলেই দেহি আছে। একটা লাডি দিয়া আগে গুতাইয়া, লাইররা-চাইররা দেহি। হাপ পেচাইয়া থাকলে যাইবুইগ্গা। নাই দেইকখা আনি।
“নাহার, একটা জগ লাইয়া আয়।” ছোড বইন ছামছুন নাহাররে ঘুমের তন উইড্ডা অহনও দেহি নাই।
নাহারে গরুর দুধ দোয়ায়, মায় ধমক মারে।
নাহার আমাগো ইছকুলো টুতে পড়ে। মার লগে লগে থাহে। হওয়ালে গরুর দুধ দোয়ায়, হাগ টোহায়, খোপের তন আস-মুরকার ডিম বাইর করে, আসের ছাওর লাইগ্গা হামুক টোগায়, কাইড্ডা খাওয়ায়, তরকারি কোডে, চাউল ধোয়।
আইত্তানো আইয়া দেহি দাদায় ঘুমের তন উইট্টা গেছে। পশ্চিমের জালানার ধারে টুপি মাতাত দিয়া বইয়া আলুপোড়া আর চা খায়। চার গন্ধডা খুব ভালা লাগে আমার ধারে।
দাদায় হাডাচলা করতারেন না। মীর্জাকালুর বাড়ি নদী লইয়া যাওনের পর আমাগো ঘরো আইয়া ওঠছেন দুই বচ্চর অয়। মায় পত্যেক দিন অন্য চাচিগরে গাইল্লাইতে গাইল্লাইতে দাদারে পয়-পরিষ্কার করান, গোছল করান, ভাত খাওয়ান। বাবায় কয়, তোরে যে আমার বাপের সেবা করনের সুযোগ দিছি এইডা তোর চৈদ্দগুষ্টির বাইগ্গ।
দাদার অনেক জমিজমা আছিল হুনছি। আমার বাপে অনেক আগে বাড়িত তন পলাইয়া আইয়া দাদার এই চরের জমিত থাকতে থাহেন। পরে বড় বাড়ি নদী খাইলে বেক্কেরে এইয়ানো লইয়া আইয়েন। আমার বাপেরে আমার এইয়ার লাইগ্গা অনেক ভালা লাগে।
দাদার বিছনাত তাইম্মুমের চ্যাপ্টা মাডি। মাতার দিকে ফুডা কইররা হুতা বান্দা। এইডা দিয়া অজু করেন দাদায়। অজু শেষ হইলে পালার তারকাডার লগে জুলাইয়া রাহেন। দাদায় কতা কইতে পারেন কিনা হুনি নাই কহনো। কিছু কন না। খালি চাইয়া থাহেন। জাল লইয়া উডানে নামনের লগে সেলাম দিলেও গেডি গুড়াইয়া চাইলেন না।
বাড়ির কেউ অহনও ঘুমের তন জাগে নাই। খালি পশ্চুম ঘরের জালানা একটা খোলা। উত্তর ঘরোর খোলা আইত্তানো বড় চাচা দুই আত আডুর মইদ্যে দিয়া গোল অইয়া হুইয়া রইছেন। ঘরের পালার লগে হিয়ল দিয়া পাও বান্দা আছে হের। আমাগো ঘরের জালনার দিহে চাইয়া দেহি দাদায়ও হের বড় পোলার ঘুম যাওন দেকতাছে। বড় চাচায় গুমেত তন উডলে কেউ গুমাইতারে না আর।
হেয়ও পাগল অইছে বাড়ির বেক্কেরেও পাগল বানায় চিল্লাইয়া। মাইধ্যে মাইধ্যে জোরে জোরে কোরান শরিফের সুরা পড়েন, অনেক ডর লাগে আমার। রাইতে হপ্নেও দেহি মইধ্যে মইধ্যে। ডরে আমার শইল কাডা দিয়া ওডে।
ঘরের পিড়াত খাড়াইয়াই আন্দাজে উডানোর পানিত ঘুরাইয়া জাল মারলাম। টাইন্না দেহি পাচ ছয়ডা চল্লাপুডি, ছোড একডা আইড় মাছ ওঠছে। পুডি মাছগুলির পেডে লাল দাগ দেওইন্না। মনে অয় নতুন পানির লগে খালের তন আইছে।
জাল লইয়া ঘরো উইট্টা আহি।
“নাহার, এই নাহার! তোরে কইলাম না জগ লইয়া আয়। অহন যদি মাছগুলি যাইগ্গা তয়লে কী অইবো!”
“অইছে অইছে আর হুডানকি করন লাগব না, দেহি কী পাইছত!” মায় একটা টিনের জগ লইয়া আইছে। কাডির পাশের তন মাছগুলি বাইর কইররা মার জগে দিয়া দেহি দাদায় চাইয়া আসতাছে। মাছ পাওন দেইক্কা দাদায় মনে অয় খুশি অইচে।
মায় কয়, চাউল দুইতাম যামু। পুগুর গাডো যা।
দুপদুপাইন্না বিষ্টি। মায় চাউল কচলাইয়া পাতিলের তন পানি হালাইতে না হালাইতে পুডি মাছগুলির যেমন মাতা আউলাইয়া গেল। পাল্লে পাতিলো ওডে লাফ মাইররা। জাল মারনের লগে লগে মনে অয় জালের দড়ি ছিড়রা লাইব। দেড় আত বড় একডা রুইত মাছ পানির উরপে লাফ দিয়া উইট্টা পলায়। জাল টাইন্না উরপে উডাইলে কাডির নিচ দিয়া সব যাইবোগ্গা।
তাড়াতাড়ি পুগুরে নাইম্মা ডুব মারি। নিচের দিকে কাডি গুডাইতে গিয়া রুইত মাছের ছোডখাডো দুইডা ডুস খাইলাম। নিচের দিকে জাল দুই হাতো একখানো কইরা উল্ডা কইরা খইলতার মতোন বানাইয়া গাডলায় উইড্ডা দেহি জালভরা পুডি, বোয়াল পাতা, মলন্দাগুড়া, এক আত লম্বা দুইডা রুইত মাছ।
মায় কয়, উরপে লইয়া আয়।
“আল্লাগো কত মাছ!” ফিইররা দেহি নাজমায় আর আমার বইন নাহারে ভিজ্জা-ভিজ্জা লাফাইতাছে।
“নাহার যা, বড় পাচ সেইররা ভাতের পাতিলডা লইয়ায় কাড়ের তন।”
নাহারে আর নাজমায় এক লগে পাহাল পারাইয়া উগুর ঘরো যায়। পাতিল লইয়া ফিরনের সময় পিছে দেহি বাপও আইছে। হের মাতাত একটা গামছা।
“দেহি দেহি কী মাছ পাইছত!”
মায় আর নাজমায় মাছ পাতিলো লইয়া ঘরো চইল্লা যায়। বাবায় আরো কয়েক খেপ জাল মারেন। নাহারে পিছে পিছে জগ লইয়া মাছ টোগায়।
আমি পুগুরে ডুব দিয়া উপরের দিকে মুখ কইররা চোখ খুইল্লা পানির নিচের তন বিষ্টি দেহি কতক্ষণ। উপুর অইয়া পিড ভাসাইয়া পিডের উরপে বিষ্টির ফোডার শব্দ হুনি।
আমাত তন বেশি ডুব দিয়া পানির নিচে কেউ থাকতো পারে না, পুগুরের মাজের তন মাডি তোলতেও পারে না, এক ডুবে বেশিদূরও কেউ যাইতারে না।
ঘরো আইয়া আতমুখ মুইচ্চা চা আর আলুপোড়া খাইতে না খাইতেই বিষ্টি কইম্মা গেল। সুজজোও উইট্ঠা গেল চিকচিকাইয়া। জালনার বাইরে টাঙ্গাইন্না আউত্তায় কমলা রঙ্গের টাইমফুল ফুইট্টা উঠলো। এহন তাইলে সাড়ে আটটার মতো বাজে। আমাগো ইছকুল শুরু অয় দশটার সময়। না যাইয়া পারন যাইব না।
বইগুলি একটা পলিথিন ব্যাগো পেচাইয়া পঞ্জের স্যান্ডেল আরেক আতো লইয়া ইছকুল রওনা দিলাম। মায় কইলো, “নাহারের যাওনের দরকার নাই। জর উটবো। তুই যা। হেড ছারেরে কইয়া দিছ।”
উডানে অহনও এক আডু পানি। দরজায় আইয়া দেখলাম আরেট্টু বিষ্টি অইলেই ডুবত। দরজার পাশের বড় দীঘিডায়ও পাড় সমান পানি।
দরজার মাতাত আইয়া দেখলাম, হাক্কা বানান পরায় শেষ। পশ্চিমদারের বাড়ির নাজিম ম্যাভাই, হাওলাদার বাড়ির মফিজল দুদু, ইব্রাহিম চাচা, জাকির চাচা, আমাগো আইল্লা মালেক ভাই ডুইব্বা ডুইব্বা বাঁশ গাড়তেছেন খালো। বাবায় পাড়ে খাড়াইয়া আছেন। মালেক ভাই আমারে কান্দে লইয়া খাল পার কইররা দিলেন।
পত্যেকদিন ইছকুলের ক্লাশের তন গোবর হালাইতে অয় আমাগো। কাজী বাড়ির বরকত, শাহনুর, উমেশ ডাক্তার বাড়ির মৃণাল আর চৌমাতার দোকানের দারের নুরুল ইসলাম মিল্লা গোবর হালাই। কাজী বাড়িত অনেক ঘর। অনেক মানুষ। কিছু কইলে হ্যারা ছারেগোরে মাডো খাড়াইয়া ছাত্রগো সামনে গালাগালি করেন। হের লাইগ্গা ছাররাও ডরে কিছু কয় না। ইছকুলের জমিও এই বাড়ির মাইনষে দিছে।
পত্যেক রাইতে ইছকুলো বাড়ির সব গরু-ছাগল বাইন্দা রাহে হেরা। আমরা সকালে টেবিল-চেয়ার গোছাই, গোবর পরিষ্কার করি, পানি ঢালি।
আমাগো ইছকুলের দরজা-জালানা নাই। চাচের ইছকুল। হলুদ রঙ্গের। কাজী বাড়ির পোলাইনে শীতের সময় ইছকুলের চাচ ভাইঙ্গা নিয়া আগুন পোয়ায়। কটকডিআলা আইলে দেওয়াল ভাইঙ্গা নিয়া আইসক্রিম, কটকডি খায়। অনেক বড় ইছকুল আমাগো এই জন্য এহনও শেষ করতে পারে নাই।
ইছকুল ভাঙচে বইল্লা কাজী বাড়ির মাইনষেরে বালাও লাগে আমাগো। টিক্কা দিত আইলে দূর থেইক্কা দেখলেই আমরা তিন-চাইরশো পোলাপাইন ফুডা-ফাডা দিয়া ভাইগ্গা যাই। শিক্ষা অফিসার আইলেও আমরা ভাইগ্গা যাই গা। কেউ আমাগোরে এহন পর্যন্ত টিক্কা দিতো পারে নাই।
ইছকুলের লেইজারের সময় আবার এক লগে ঠাডা আর বিষ্টি। বিষ্টি আইলেই আমাগো ইছকুল ছুডি। পত্যেক ক্লাসেই অদ্দেক ছাদ নাই। হর হর কইররা পানি পড়ে। ছারেরাও কইলো তাড়াতাড়ি বাইত যা তোরা।
ছুডির ঘণ্টা বাজাইয়া দিল দপ্তরি চাচা। বিষ্টির লাইগ্গা আইজ পোলাইন কম আইছে ইছকুলো। যারা আইছি ভিজ্জা ভিজ্জা বাইদ্দিকে দৌড়াইতে লাগলাম। পিছল রাস্তায় ছালমায় আছাড় খাইয়া অনেক ব্যাথা পাইল। অনেক ক্ষণ খাড়াইয়া খাড়াইয়া কানলো। ফিরনের সময় আমার খালি মনে অইতেছে মায় বেশি হলুদ দিয়া পুডি মাছ রানছে। গরম ভাত দিয়া খামু। অনেক সাদ অইব। বিষ্টিত ভিজ্জা আত-পাও ফুডা দিয়া গেছে।
ভিজ্জা চুপ-চুইপ্পা হইয়া উডানো খাড়াইতে না খাড়াইতেই খাড়াঝিলকি দিয়া আমার মাতাত আসমান ভাইঙ্গা পড়ল। উত্তরের ঘরের সামনে পাগল চাচার লাশ ঘিইররা অনেক মানুষ। চাইর পাশের বাড়ির বেক মানুষ আইছে। কেউ কোন কথা কয় না। কান্দেও না। বিষ্টির মইধ্যে খাড়াইয়া চাচার দিগে চাইয়া রইছে। ওগলার বিছানাত চিত কইররা হোয়ানো চাচার পরনের ভিজা হাপপ্যান পাডের হুতলি দিয়া কোমরের লগে বান্দা। আমার বড় চাচা অনেক দিন ধইররাই পাগল আছিলেন।
মায় যে কুনডে গেল। অনেক খুইজ্জাও পাইলাম না। চাচায় মনে অয় গোছল করানের সময় মইররা গেছে। গোছল করানের লাইগ্গাই কবির ম্যাভাই হেইতেরে বল খেলনের হাপপ্যান পরাইতো। আর হাপপ্যান দেখলেই হেয় যে কী কান্দন কানতো! চাচায় বোঝতো অহন গোছল করান অইব। যহন লুঙ্গি পরাইয়া গোছল করাইতে নামাইত, লুঙ্গির মইধ্যে বাতাস জমাইয়া অনেকক্ষণ ডুব দিয়া থাকতেন। কবির ম্যাভাই বুদ্ধি কইররা আলমারির তন চাচার বল খেলার হাপপ্যানগুলি বাইর কইররা গোছলের সময় পিন্দাইতেন। কবির ম্যাভাই চাচার বড় পোলা।
মায় যে কই গেল! উডানের মাজে খাড়াইয়া টোগাইতে টোগাইতে দেহি দাদায় জানলা দিয়া উত্তর ঘরের বারিন্দার দিগে চাইয়া রইছে। মোকটা মেগের মতন আন্দাইর।
কয়েক বচ্ছর আগে আমার চাচারা বড় বড় নৌকায় আস্তা আস্তা টিনের চাল, লোহা কাডের খুডি, চাইলের কোলা-মটকা, ডোলা, হাড়ি-পাতিল, গরু-ছাগল, মুরকা-আস লইয়া, চকি, গাট্টি-গুট্টি লইয়া বাড়ির সামনের খালের গাডো আইয়া থামে। চাইর-পাচ নৌকায় মালামাল, এক নৌকায় সব মানুষ। হাজের আগে আগে অনেক নৌকা আইছে দেইক্কা আমি দৌদ্দিয়া যাইয়া খালপাড়ে খাড়াইছি। এমুন সময় কবির ম্যাভাই বেক্কের আগে কোমরে দড়িবান্দা বড় চাচারে লইয়া নৌকাত তন লাফ দিয়া খালের কম পানিতে নাইম্মা আহেন। চাচা আসিমোখে জিগাইছেন, “এইডা নি নেছুর পোলা?”
পরে হুনছি, বড় চাচায় বল খেলার মাডো মাইনষের পিডা খাইয়া পাগল হইয়া গেছেন। হেই দিন তজুমদ্দি আর মীর্জাকালুর ফাইনাল খেলা। মীর্জাকালু হাইস্কুল মাডো হাজার হাজার মাইনষে আইছে খেলা দেখতো। চাচা যত বার বল মারেন গোলকি সামনে খাড়াইয়া আটকাইয়া দিত বইল্লা রাগ কইররা হের গাইত মুইত্তা দিছিলেন। পরে মাইনষে মাডো পিডাইয়া মাতা হাডাইয়া দিছিল। ছাতির বাড়িত আতও বাঙছিল। বাকরগঞ্জের ডাক্তররাও কইছিল হে মইররা যাইব। পরে বাইচ্চা আইলেও বাইত্তন পলাইয়া যাইতেন। একলা পাইলে মাইনষেরে দৌড়ান দিতেন।
ঘর উডানের পরের তনই চাচারে আইত্তানো পালার লগে বাইন্দা রাকতো। আমার অনেক মায়া লাগত দেইকখা। কান্দন আইত। অনেক সময় গৈয়ম খাইতে দিতাম হেরে। আমার লগে কতাও কইতো মইধ্যে মইধ্যে। একদিন গৈয়ম দেওনের পরে কাসেইম্মার মাতাত মাইররা রক্ত বাইর কইররা দিছিল। মায় আমারে লাডি লইয়া দৌড়াইছিল হেই দিন। হের পরের তন আমি দূরে দূরে থাকতাম।
পরায় পত্যেক দিনই ভোর রাইতে বারির বেক্কে ঘুমের তন জাগতো চাচার চিক্কুইর-বাক্কুর, কান্না-কাডি আর কবির ম্যাভাইর ধমকা-ধমকি, গালাগালিতে। বল খেলার প্যান দেখলেই কান্দাকাডি লাগাইতেন চাচায়। বোজদেন পানিত নামাইব হেইতেরে। ম্যাভাই বালা বালা কতা কইয়া পুগুর পার নিয়া ঠেলা মাইররা পানিত হালাইয়া দিতেন। আর কইতেন, “ডুব দে, ডুব দে!”
চাচায় খালি পাড়ের দিগে হাতরাইয়া আইতে চাইতেন। পারে আইলে আরো কয়েক জনরে লগে লইয়া পানিত ঝাপ মাইররা চাচারে গরুডুবানি ডুবাইতেন। গোছলেত তন ওডলে চাচায় দুর্বল হইয়া যাইতেন পুগুরের পানি খাইয়া খাইয়া। পুগুর পারে উইড্ডা নিজেই পেট চাইপ্পা চাইপ্পা পানি বাইর করতেন মাজে-মইদ্যে। হেরপর কিচ্ছু অয় নাই এমন ভাব লইয়া কইতেন, “কবিররার মা, বাত দে।”
হুইন্না অন্য চাচিরা কইতো, “পাগল ঠিক অইচে।” বারির মাইনষে কইতো, “পানিত ডুবানোর চাইতে ভালো চিকিসসা পাগলের জন্য আর নাই।”
চাচিরে দেখতাম কানতে কানতে চাচারে ভাত খাওয়াইতেন। পাংখা লারতেন মরা মাইনষের মতন।
মারে টোগাইয়া না পাইয়া জোরে ডাক দিলাম, “মা গো ও মা, ভোগ লাগজে।”
আমার ডাক শেষ না অইতে না অইতেই মাইজ্জা চাচা গলা খাকারি দিয়া কইলেন, “কবিইররা, ও কবিইররা, শুয়রের বাচ্চা তুই কই!”
রিংকু কইলো, “দুরপের পরেই কামাইল্লারে আর চাচিরে লইয়া পলাইয়া গেছেইগ্গা।”
(চলবে)
