ভূমিকা: ডায়োজিনিস নাকি দিওজিনিস?
ইতিহাসের পাতায় গ্রিক দার্শনিক দিওজিনিস অফ সিনোপ এক প্রথাবিরোধী ও রোমাঞ্চকর নাম। ভাষাতাত্ত্বিক শুদ্ধতার বিচারে তাকে ‘ডায়োজিনিস’ না ডেকে ‘দিওজিনিস’ (Diogenes) বলাটাই অধিক সংগত। গ্রিক শব্দ ‘Diogenēs’ (Διογένης)-এর মূল উচ্চারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘Dio’ অংশটি এসেছে ‘Zeus’ থেকে এবং ‘genes’ মানে ‘বংশজাত’। অর্থাৎ, তার নামের অর্থ ‘জেউসের বংশধর’ বা ‘ঈশ্বরের সন্তান’। প্রমিত গ্রিক উচ্চারণের কাছাকাছি থাকতে গিয়ে আধুনিক অনেক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক তাকে ‘দিওজিনিস’ হিসেবেই অভিহিত করেন।
কিন্তু কেন তাকে ‘ডায়োজিনিস’ নামে ডাকা হয়? মূলত ইংরেজি ভাষান্তরের প্রভাবেই এই বিভ্রাটের শুরু। মধ্যযুগের শেষের দিকে এবং রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে যখন গ্রিক ক্লাসিকগুলি ল্যাটিন ও ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয়, তখন ‘Diogenes’-এর ‘Dio’ অংশটিকে ইংরেজি উচ্চারণের আদলে ভুলক্রমে ‘Dia’ বা ‘Dya’ (ডায়া) হিসাবে পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। ল্যাটিন অনুবাদের সময় উচ্চারণের এই বিচ্যুতি এতটাই পাকাপোক্ত হয়ে যায় যে, পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে ‘ডায়োজিনিস’ নামটাই প্রাতিষ্ঠানিক ও জনপ্রিয় রূপ লাভ করে। ভাষাগত এই ভুল আজও টিকে থাকলেও, দিওজিনিস এর দর্শনের ঔদ্ধত্য এবং জীবনযাপনের চরম বৈরাগ্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক। এই নিবন্ধে আমরা সেই কিংবদন্তি দার্শনিকের জীবনের পাঁচটি স্মরণীয় অধ্যায় ও তার প্রথাবিরোধী চিন্তার জগতটি অন্বেষণ করব।
দিওজিনিস অব সিনোপকে নিয়ে ৫টি গল্প
ডেভ রুস
দিওজিনিস অফ সিনোপ (খ্রিপূ ৪০৪ থেকে ৩২৩ খ্রি) ছিলেন সিরিয়াস দার্শনিকদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে কৌতুকপ্রিয়। দিওজিনিসকে প্লেটো ডাকতেন “পাগল সক্রেটিস” নামে। আর এথেনিয়ান অর্থাৎ এথেন্সের মানুষের কাছে দিওজিনিসের নাম ছিল “কুকুর”। এর কারণ দিওজিনিস ঘুমাতেন বাজারের মধ্যে একটা বড় সিরামিকের জারে, খাবার খেতেন মানুষের ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্ট থেকে আর বাজারে হেঁটে যাওয়া মানুষদের দেখে মজা করে কুকুরের মত ডাকতেন।
নর্দান অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক জুলি অ্যান পিয়েরিং বলেন, “দিওজিনিসের সিনিক দর্শনচর্চা ছিল অতি নাটকীয়।” সেই সময়ের কথা ভাবলে যথেষ্ট প্রথাবিরোধীও বলা যায়। পিয়েরিং সক্রেটিসের সাথে দিওজিনিসের মিল দেখেন, কারণ তারা দুইজনই বাজারে মানুষের সাথে সময় কাটাতেন এবং এথেন্সের নগরবাসীর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতেন।
“কিন্তু সক্রেটিস কখনও নিজের সব সম্পদ বিসর্জন দেয়ার কথা বলেননি”, পিয়েরিং বলেন। “সক্রেটিস কেবল বলেছেন, তোমার আত্মার চেয়ে অর্থ, সন্মান অথবা ক্ষমতাকে বেশি প্রাধান্য দিও না। অন্যদিকে দিওজিনিস এই দর্শনকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যান।”
দিওজিনিস ও তার সিনিক অনুসারীরা ভিক্ষুক ছিলেন। এই সিনিকরা ময়লা কম্বল জড়িয়ে থাকতেন, রাস্তায় ঘুমাতেন আর মানুষের সামনে ‘লজ্জাজনক’ কাজ করতেন। কিন্তু এমন জীবনযাপনের জন্য তাদের যুক্তি ছিল।
সিনিকরা বলতেন মানুষের জন্য লজ্জাজনক বলে কোনো কাজ নেই। আনন্দময় জীবনের জন্য প্রয়োজন কেবল প্রবৃত্তি আর যুক্তি, আর কিছু নয়। এর বাইরে যা কিছু আছে সবই অর্থহীন।
দার্শনিক দিওজিনিস নিজে কোনো কিছু লিখে যাননি। তার বিষয়ে যা কিছু জানা যায়, সবই লিখেছেন দিওজিনিস লায়েরটিয়াস নামে এক গ্রিক ইতিহাসবিদ, সেটাও শত বছর পরে। দিওজিনিস লায়েরটিয়াস তার “লাইভস অফ এমিনেন্ট ফিলোসফারস” বইয়ে দিওজিনিস এর সেরা কিছু কমেডি রেকর্ড করে রাখেন। এর মধ্যে অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট আর প্লেটোর মত মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলা ব্যাঙ্গাত্মক কথাও ছিল।
আপনি যদি ইন্টারনেটে দিওজিনিস এর উক্তি লিখে সার্চ করেন, এমন অনেক উক্তি দেখবেন যেগুলি আসলে দিওজিনিস লায়েরটিয়াস এর কাছ থেকে নেয়া। দার্শনিক দিওজিনিস এর উক্তি হিসেবে এগুলি নতুন করে লেখা হয়েছে। এই লেখাতে আমরা ‘লাইভস অফ এমিনেন্ট ফিলোসফার’ বই থেকে সেই উক্তিগুলি দিওজিনিসের বয়ানে তুলে ধরব।
দিওজিনিস কীভাবে মৃত্যুবরণ করেন, তা নিয়ে অনেক উদ্ভট গল্প আছে। একটাতে বলা হয়, তিনি ইচ্ছা করে দম আটকে রেখে মারা যান। আরেকটাতে বলা হয়, তিনি কাঁচা অক্টোপাস খেয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান। কুকুরের কামড়ে মারা যান এমন গল্পও আছে। তবে ৯০ বছর বয়সে দিওজিনিস যখন মারা যান সেটা বার্ধক্যজনিত কারণেই ছিল।
আমরা এখানে দিওজিনিস অফ সিনোপ এর জীবনের পাঁচটি সবচেয়ে স্মরণীয় গল্পের কথা জানব।
১. ‘আমার রোদ থেকে সরে দাঁড়াও’
দৃশ্যটা কল্পনা করা যাক। এথেন্সে দিওজিনিস নামে এক কপর্দকহীন ভিখারী দর্শনচর্চা করেন। এক দিন তিনি আপন মনে অলস সময় কাটাচ্ছেন আর সূর্যের তাপ পোহাচ্ছেন। এমন সময় তার কাছে আসেন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট, তখনকার সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ। আলেক্সান্ডার দিওজিনিসের কাছে আসেন দারুণ একটা প্রস্তাব নিয়ে: আপনি আমার কাছে যা চান, আমি আপনাকে তাই দিব।
দিওজিনিস আলেক্সান্ডারের কাছে স্বর্ণমোহর চাইতে পারতেন, সুরম্য প্রাসাদ চাইতে পারতেন, এমনকি আলেক্সান্ডারের দরবারে উচ্চপদের কোনো চাকরিও চাইতে পারতেন। কিন্তু দিওজিনিস কী চেয়েছিলেন?
দিওজিনিস আলেক্সান্ডারকে বলেন, “আমার রোদ থেকে সরে দাঁড়াও।”

আমরা অনুমান করতে পারি, দিওজিনিস হয়ত এই কথা বলার সময় তার চোখজোড়া খুলেও দেখেননি। তাহলে কি দিওজিনিস আলেক্সান্ডারকে অপছন্দ করতেন? নিশ্চিতভাবে তা বলা যায় না। তবে আমরা একটা বিষয় জানি যে দিওজিনিস এর মত সিনিকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অটার্কিয়া (autarkeia)। এই গ্রিক শব্দটির অনুবাদ হচ্ছে স্বনিয়ন্ত্রণ বা স্বাধীনতা। দিওজিনিস জানতেন আলেক্সান্ডারের এই প্রস্তাব তার জন্য কোনো আশীর্বাদ ছিল না। বরং এটা ছিল দিওজিনিস এর আনুগত্য কেনার চেষ্টা।
আপনি যখন কোনো রাজনীতিবিদ, শাসক অথবা সম্রাটের সাথে কৃতজ্ঞপাশে আবদ্ধ হবেন, আপনি স্বাধীনভাবে কথা বলার অথবা কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন, বিষয়টিকে পিয়িরিং এভাবেই দেখেন। তাই আলেক্সান্ডারের কাছে দিওজিনিসের কোনো চাহিদা তো নেই, উপরন্তু তিনি আলেক্সান্ডারের কাছ থেকে কিছু নিতেও চান না।”
ভাবতে পারেন সম্রাটকে অপমান করার দোষে দিওজিনিসের নিশ্চয়ই সমস্যা হতে পারে। কিন্তু সে সময়ের একজন ভাঁড় বা কমিক চরিত্র হিসাবে দিওজিনিস সকল ধরনের অপরাধ থেকে দায়মুক্ত থাকতে পারতেন। এমন কি এথেন্সের উচ্চশ্রেণির মানুষের মধ্যেও দিওজিনিস এর এই অপ্রতিরোধ্য স্বাধীনতার প্রতি একধরনের বিদ্বেষমূলক শ্রদ্ধা কাজ করত। দিওজিনিস লায়েরটিয়াস (ইনি অন্য দিওজিনিস) জানান, মহান সম্রাট আলেক্সান্ডার নাকি বলেছিলেন, আমি যদি আলেক্সান্ডার না হতাম, তবে দিওজিনিসের মত হতে চাইতাম।”
বোনাস: একবার কেউ একজন ক্যালিস্থিনিস (প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ) এর প্রভাব প্রতিপত্তি এবং আলেক্সান্ডারের সাথে একই বাড়িতে থাকার সৌভাগ্য নিয়ে কথা বলছিল। তাকে দিওজিনিস বলেন, “এটা তো ক্যালিস্থিনিস এর দুর্ভাগ্য। কারণ নিজের খাবারটাও তাকে আলেক্সান্ডারের ইচ্ছামত সময়ে খেতে হয়।”
২. “আমাকে এই লোকের কাছে বিক্রি করো; ওর একজন মনিব প্রয়োজন”
দিওজিনিস এর জীবনী নিয়ে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে আমরা একটা বিষয় জানি তিনি এসেছিলেন সিনোপ থেকে। সিনোপ তুরস্কের একটি প্রাচীন শহর, যেটা কৃষ্ণ সাগরের তীরে অবস্থিত। স্থানীয় মুদ্রা নকল করার অভিযোগে দিওজিনিসকে (অথবা তার পিতাকে, বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আছে) শহর থেকে বিতাড়ন করা হয়। এরপর তিনি এথেন্সে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। এখানে তিনি অ্যান্টিস্থিনিস এর শিষ্য হন। এই অ্যান্টিস্থিনিস ছিলেন সম্ভবত প্রথম সিনিক দার্শনিক।

পরবর্তীতে কোনো এক সময় দিওজিনিসকে জলদস্যুরা ধরে নিয়ে যায়, তাকে করিন্থ-এ দাস হিসেবে নিলামে ওঠানো হয়। পিয়িরিং জানান, দিওজিনিসের মত দাসদের সেই সময় নিলামের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হত এবং তাদের বলা হত সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে যেন তারা নিজেদের দক্ষতার কথা বলে। দক্ষতা বিবেচনায় একজন যোদ্ধাকে হয়ত দেহরক্ষী বা রান্নায় দক্ষ কোনো দাসকে রান্নার লোক হিসাবে বিক্রি করা হত।
নিলামকারী দিওজিনিসকে যখন জিজ্ঞেস করে, “তুমি কোন কাজে দক্ষ?” দিওজিনিস বলেন “মানুষকে শাসন করতে।” একজন দাস কীভাবে এমন কথা বলতে পারে, কিন্তু দিওজিনিস তার উত্তরে অনড় থাকেন। তিনি ভিড়ের মধ্যে জেনিয়াদেস নামের একজন ধনী লোককে দেখিয়ে বলেন, “আমাকে এই লোকের কাছে বিক্রি করো, ওর একজন মনিবের প্রয়োজন।”
এখানেও স্বাধীনতা নিয়ে দিওজিনিস কৌতুকের মাধ্যমে নিজ দর্শন প্রকাশ করলেন। আমরা দেখতে পাই, একজন দাস হয়েও দিওজিনিস তার মনিবের চেয়ে বেশি স্বাধীন।
“দিওজিনিস পরিষ্কার করে দেন, মনিব-দাসের এই সম্পর্কে তিনিই হচ্ছেন আসল মনিব, যে তাকে ক্রয় করছে সে নয়। অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট এর ঘটনাতেও আমরা দেখি, অ্যালেক্সান্ডারের চেয়ে দিওজিনিসই অধিক স্বাধীন”, পিয়িরিং বলেন। “পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসে এই প্রথমবার আমরা স্বাধীনতার এমন বৈপ্লবিক দৃষ্টান্ত দেখি। আপনি সক্রেটিস, প্লেটো অথবা এরিস্টটলের মধ্যে এমন দেখতে পাবেন না। সিনিকদের মাধ্যমেই এটি শুরু হয়েছিল।”
বোনাস: একবার কেউ একজন দিওজিনিসকে একটা বিলাসবহুল প্রাসাদে নিয়ে যায় এবং সতর্ক করে বলে এদিক-সেদিকে থুতু না ফেলতে। কিন্তু দিওজিনিস তার গলা পরিষ্কার করে সেই লোকের মুখেই একদলা থুতু ফেলে। দিওজিনিসের যুক্তি থুতু ফেলার জন্য এর চেয়ে বাজে জায়গা তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
৩. “আপনি যদি লেটুস ধুয়ে খেতে পারতেন, তবে আপনাকে ডাইয়ানিসিয়াসের দরবারে যেতে হত না”
পুরো ঘটনাটি এমন ছিল যে, একদিন প্লেটো দিওজিনিসকে মানুষের ফেলে দেয়া লেটুস পরিষ্কার করতে দেখেন। প্লেটো তখন দিওজিনিসের কাছে এসে চুপিসারে বলেন, “আপনি যদি ডাইয়ানিসিয়াসের দরবারে যেতেন তাহলে আর লেটুস ধুয়ে খেতে হত না।” এর জবাবে দিওজিনিস ততধিক শান্ত স্বরে বললেন, “আপনি যদি লেটুস ধুয়ে খেতে পারতেন, তাহলে আপনাকে ডাইয়ানিসিয়াসের দরবারে যেতে হত না।”
এই ঘটনাটি বুঝতে হলে এর প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। প্রথমত দিওজিনিস রাস্তায় বসবাস করতেন এবং ‘টাব’-এ ঘুমাতেন, যেটা আসলে বড় সিরামিকের জার। শস্য অথবা ওয়াইন রাখার জন্য ব্যবহার করা হত। আর এথেন্সে সেই সময় বাজারে খাওয়াদাওয়া করত কেবল ভিক্ষুক আর কুকুর। আর সবচেয়ে নিচু শ্রেণীর মানুষেই ময়লার মধ্যে মানুষের ফেলে দেয়া খাবার খুঁজত।

দিওজিনিসও সেই দিন তাই করছিলেন। বাজার থেকে ফেলা দেয়া লেটুস ধুয়ে পরিষ্কার করছিলেন দিওজিনিস। মহান প্লেটো তা দেখে ভাবলেন এই নরাধমকে কিছু পরামর্শ দেয়া যাক। দিওজিনিস যদি কোনো ক্ষমতাবান শাসকের অনুগত হয়ে থাকতেন, তার অবশ্যই থাকার মত একটা বাড়ি থাকত আর এভাবে রাস্তায় মানুষের উচ্ছিষ্ট থেকে খাবার খুঁজতে হত না।
মজার বিষয় হচ্ছে প্লেটো নিজে সিরাকুজ-এ গিয়েছিলেন ডাইয়ানিসিয়াসকে নৈতিক দর্শন শেখানোর মত কঠিন কাজ করতে। এই স্বেচ্ছাচারী শাসক প্লেটোর সংযমের শিক্ষা গ্রহণ করতে চাননি। তিনি প্লেটোকে কেবল চাকরিচ্যুতই করেননি, তাকে দাস হিসাবে বিক্রি করে দেন। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে প্লেটো কেন দিওজিনিসকে একই কাজ করার পরামর্শ দিলেন?
পিয়িরিং বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, প্লেটো ছিলেন অভিজাত শ্রেণীর মানুষ, শাসক শ্রেণীর সাথে ওঠাবসা ছিল তার। প্লেটো বিশ্বাস করতেন একজন দার্শনিকের জন্য সবচেয়ে ভাল হচ্ছে কোনো ক্ষমতাবান পরিবারের সাথে নিজেকে যুক্ত করা। কিন্তু দিওজিনিস ঠিক এর বিপরীত চিন্তা করতেন।
“শাসকের ওপর নির্ভর করে দারিদ্র্য মুক্তির চেয়ে, দিওজিনিস দারিদ্র্যকেই আলিঙ্গন করেন যাতে তিনি অপশাসকদের থেকে বাঁচতে পারেন”, পিয়িরিং বলেন। মূলত এটাই ছিল এই দুই দার্শনিকের মধ্যে পার্থক্য।
বোনাস: “প্লেটো মানুষকে বলতেন “দ্বিপদী ও পালকবিহীন জন্তু।” প্লেটোর দেয়া এই সংজ্ঞা তার অনুসারীদের মধ্যে বেশ প্রশংসা পায়। একদিন প্লেটো যখন লেকচার দিচ্ছিলেন দিওজিনিস তখন একটা পালক তোলা মুরগি এনে সবাইকে দেখিয়ে বলেন, “এই হচ্ছে প্লেটোর মানুষ।”
৪. “আমাকে যারা কিছু দেয় তাদের আমি প্রশংসা করি। আমাকে যারা দিতে চায় না, আমি তাদের বিদ্রূপ করি এবং সেই মূর্খদের গায়ে কামড় বসাই”
দিওজিনিসের কাছে যখন তার ‘কুকুর’ নামকরণের কারণ জানতে চাওয়া হয় তখন তিনি এই কথাটি বলেন। কাউকে অপমান করার জন্য এথেন্সবাসীর কাছে কুকুর শব্দটি খুব প্রিয় ছিল এবং দিওজিনিসকে প্রায়ই এই নামে ডাকা হত। দিওজিনিস এথেন্সবাসীর এই অপমান সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন।

তবে সিনিকদের মধ্যে ‘কুকুর’ বা গ্রিক ভাষায় ‘কুওন’ নামটি যে কেবল দিওজিনিসের ছিল তা নয়। দিওজিনিসের শিক্ষক এন্টিথেনিসকে মানুষ ডাকত ‘হাপলোকুওন’ নামে, যার অর্থ সাধাসিধে কুকুর। এন্টিসথেনিসের রূঢ় আচরণ ও বদমেজাজ ছিল এই নামকরণের কারণ।
সিনিক দার্শনিকদের প্রতি গ্রিসের মানুষ যে মনোভাব প্রকাশ করত, সেই অর্থেই এখন ‘সিনিক’ শব্দটি আমরা ব্যবহার করি। সিনিক দার্শনিকদের বলা হত ‘কুনিকো’ অথবা ‘কুকুর-সদৃশ’। আপনি যদি ইংরেজি লেটার K বদলে C ব্যবহার করেন তবে দেখবেন কুনিকো (kunikos) শব্দটি কীভাবে সিনিক (cynic) হয়ে যায়। এখন অবশ্য সিনিকাল শব্দের অর্থ ভিন্ন (নেতিবাচক এবং নৈরাশ্যবাদী)। শব্দের এই অর্থ অনেক পরে এসেছে।
৫. দিনেদুপুরে রাস্তায় বাতি হাতে দিওজিনিস বলছেন, “আমি একজন মানুষ খুঁজছি”
দিওজিনিসকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পগুলির মধ্যে এটি একটি। অবশ্য অনেক সময় উক্তিটি অন্যভাবে বলা হয়, “আমি একজন সৎ ব্যক্তি খুঁজছি।” পিয়িরিং এর মতে আসল গ্রিক উক্তিতে ‘সৎ’ অথবা ‘ব্যক্তি’ এমন কোনো শব্দ ছিল না। কেবল বলা হয় দিওজিনিস ‘একজন মানুষ’ খুঁজছেন।
ভর দুপুরে বাতি জ্বালিয়ে, এথেন্সের রাস্তায় মানুষ খোঁজার মত নাটকীয় কাজ করা দিওজিনিসের পক্ষেই সম্ভব ছিল। আরেকটা গল্প আছে, দিওজিনিস মূর্তির কাছে ভিক্ষা চাইছেন। এর কারণ তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, দিওজিনিস বলেন “আমি প্রত্যাখাত হওয়ার অভ্যাস করছি।”

দিনের বেলা বাতি জ্বালিয়ে দিওজিনিস যে কাণ্ডটি করলেন, এর আসল উদ্দেশ্য কী ছিল?
দিওজিনিসের কাছে ‘মানুষ’ নামের যোগ্য হওয়ার জন্য আগে কিছু গুণ অর্জন করতে হয়। সিনিকরা যেগুলিকে গুণ বলতেন, সক্রেটিস বা প্লেটোর কাছে কিন্তু সেগুলি গুণ ছিল না। সিনিকদের চোখে একজন গুণবান মানুষ তিনিই যিনি কেবল তার প্রবৃত্তি ও বুদ্ধি অনুসারে কাজ করেন।
এথেন্সের যেসব মানুষ অর্থ, ক্ষমতা ও সামাজিক প্রথা নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকে তারাই হচ্ছে আসল ‘উন্মাদ’—এটাই ছিল দিওজিনিস এর দর্শন এবং তার রচিত ‘কমেডি’র সারকথা। শহরভর্তি পাগলদের ভিড়ে দিওজিনিসই ছিলেন একমাত্র মানুষ।
বোনাস: দিওজিনিস বলেন, অধিকাংশ মানুষ উন্মাদ হওয়ার এত কাছাকাছি থাকে যে সামান্য আঙুলের হেরফেরের কারণে অনেক কিছু ঘটে যায়। আপনি যদি তাদের মধ্যাঙ্গুলি দেখান, তবে আপনাকে তারা পাগল মনে করবে। কিন্তু আপনি যখন কনিষ্ঠা আঙুল দেখাবেন, তখন আর তারা তেমন কিছু মনে করবে না।
অনুবাদ. আমিন আল রাজী
জুলাই, ২০২৪, হাউ স্টাফ ওয়ার্কস
