আমি কোনো তাত্ত্বিক নই, সমালোচকও নই। আমি একজন ঔপন্যাসিক।—এই কথায় পৌঁছানোর আগে হারুকি মুরাকামিকে একের পর এক কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। তার উপন্যাসে নারীরা কেন বারবার পুরুষের স্বার্থে আত্মত্যাগ করে? তাদের ভূমিকা কেন প্রায়ই যৌনতাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে? এই প্রশ্ন বহু পাঠকের দীর্ঘদিনের অস্বস্তির জায়গা। ২০১৭ সালের এক দীর্ঘ আলাপে প্রশ্নগুলি সরাসরি তুলেছিলেন মিয়েকো কাওয়াকামি, যিনি একাধারে মুরাকামির অনুরাগী পাঠক আর নিজেও একজন গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক। মুরাকামি একটা প্রশ্নও এড়িয়ে যাননি। কোথাও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, কোথাও দ্বিমত করেছেন। আর শেষে বলেছেন, “সবার আগে আমিই ক্ষমা চাইব।”


আজকাল হারুকি মুরাকামি (Haruki Murakami) খুব একটা সাক্ষাৎকার দেন না। তবে ২০১৭ সালে একটা ব্যতিক্রম করেছিলেন। মুখোমুখি বসেছিলেন ঔপন্যাসিক মিয়েকো কাওয়াকামির সঙ্গে, যার লেখা তার নিজেরও পছন্দের। কাওয়াকামি (Mieko Kawakami) নানা সময়ে লিখেছেন, মুরাকামির সাহিত্য তার নিজের লেখাকে কীভাবে গড়ে দিয়েছে। তখন তার বইও সবে ইংরেজিতে বেরোতে শুরু করেছে। দুজনের আলাপ বেশ জমেও গিয়েছিল বলে মনে হয়। টোকিওতে চার দফায় মোট ষোলো ঘণ্টা কথা বলেন তারা। সেই আলাপ থেকেই ২০১৭ সালে জাপানি প্রকাশনা সংস্থা শিনচোশা বের করে ‘দ্য আউল স্প্রেডস ইটস উইংস উইথ দ্য ফলিং অব দ্য ডাস্ক’ (The Owl Spreads Its Wings with the Falling of the Dusk) বইটি। কথোপকথনের এই অংশে কাওয়াকামি জানতে চেয়েছেন, মুরাকামির উপন্যাসে নারী চরিত্ররা কেন এমন ভূমিকায় থাকে, কেন এভাবে আচরণ করে। মুরাকামি জবাব দিয়েছেন।
মুরাকামির উপন্যাসের নারীবাদী সমালোচনা, স্বয়ং মুরাকামির সঙ্গে
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মিয়েকো কাওয়াকামি
লিটারারি হাব, এপ্রিল ৭, ২০২০
মিয়েকো কাওয়াকামি
‘কিলিং কমেন্ডাটোর’ (Killing Commendatore)-এর মারিয়ে আকিগাওয়া (Mariye Akikawa) চরিত্রটা নিয়ে জানতে চাই। নিজের স্তনের সঙ্গে তার পরিচয়বোধ এমন গভীরভাবে জড়ানো যে বোঝা যায় সে কতটা চাপে আছে। আপনার অন্য উপন্যাসের তরুণীদের বেলায় এমনটা দেখিনি। ‘ড্যান্স ড্যান্স ড্যান্স’ (Dance Dance Dance)-এর ইউকি বা ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’ (The Wind-Up Bird Chronicle)-এর মে কাসাহারা, এদের সঙ্গে আমি সহজেই নিজেকে মেলাতে পারি।
মনে পড়ছে সেই দৃশ্যটা, যেখানে মে কাসাহারা বলে, “মৃত্যুর একটা পিণ্ড… গোল, নরম, অনেকটা সফটবলের মত।” প্রধান চরিত্রের কথা বাদই দিলাম, পুরো উপন্যাসে মে অসাধারণ সব সংলাপ বলে। কখনও নিজের আর অন্যের ক্ষতি করার সূক্ষ্ম ফারাক নিয়ে, কখনও নিজের মৃত্যু আর অন্যের মৃত্যুর ঝাপসা সীমা নিয়ে। ভাষা অসাধারণ। একটা কিশোরী মেয়ের ভেতরটা ঠিক কেমন, তা নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। ওই অংশগুলি আমার ভীষণ প্রিয়। ইউকি বা মে, কেউই নিজের স্তন বা শরীর নিয়ে তেমন কথা বলে না। কিন্তু কিলিং কমেন্ডাটোর-এর মারিয়ে…
হারুকি মুরাকামি
হ্যাঁ, ওটা নিয়ে সে সত্যিই বুঁদ হয়ে আছে। প্রায় এক অবসেশনই বলা যায়।
মিয়েকো
ঠিক, কিন্তু একটু বেশিই অবসেশন নয় কি? একজন সম্পূর্ণ অচেনা কথকের সঙ্গে প্রথমবার একা হতে না হতেই তার মুখে প্রথম কথা, “আমার স্তন আসলেই খুব ছোট, তাই না?” ব্যাপারটা আমাকে সত্যিই চমকে দিয়েছে। স্তন নিয়ে এই অবসেশন আসে কোথা থেকে?
মুরাকামি
বলব না যে এর কোনো নির্দিষ্ট উৎস আছে। আমি শুধু ভাবি, হয়ত এমন কিছু মেয়ে আছে, যারা সত্যিই এভাবে অনুভব করে।
মিয়েকো
কিন্তু মারিয়ে আর কথকের মধ্যকার দূরত্ব? মারিয়ে যখন নিজের স্তন নিয়ে তাকে প্রশ্ন করতে শুরু করে, তখন কথক কীভাবে জবাব দেবে, তা নিয়ে কি একটুও ভাবতে হয়নি আপনাকে?
মুরাকামি
আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝতে পারছি। তবে সে যে নিজের স্তন নিয়ে তার মতামত জানতে চায়, এতেই বোঝা যায় মারিয়ে তাকে পুরুষ হিসাবে দেখছে না। তার কাছে সে যৌন আকর্ষণের পাত্র নয়। এতে তাদের কথোপকথন আরও অন্তর্মুখী, আরও দার্শনিক হয়ে ওঠে। মারিয়ে তার কাছ থেকে ঠিক এমন একটা সম্পর্কই চায়। আমার ধারণা, অনেক দিন ধরেই সে এমন কাউকে খুঁজছিল, যাকে এসব কথা বলা যায়। ধরুন, সাধারণভাবে, কারও চোখে যৌন আকর্ষণের পাত্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা টের পেলে আপনি নিশ্চয়ই কথা শুরু করবেন না এই বলে যে আপনার স্তন ঠিকমত বড় হচ্ছে না, কিংবা স্তনবৃন্ত কত ছোট।
মিয়েকো
আপনার যুক্তি বুঝলাম। যদিও আমার উল্টাটাও মনে হয়েছিল। যেন মারিয়ে ইচ্ছা করেই এভাবে শুরু করছে, যাতে লোকটা তাকে যৌন চোখে দেখে। কিন্তু আপনি বলছেন, এতে বরং তাদের মধ্যকার যৌন টান উবে যায়, আর সম্পর্কের দার্শনিক দিকটা জোরালো হয়?
মুরাকামি
ঠিক তাই। আর তাতেই মারিয়ে ও কথকের সংলাপ উপন্যাসের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। তাদের কথা চালাচালির ভেতর দিয়ে গল্পটা নতুন আলোয় ধরা দেয়।
মিয়েকো
অর্থাৎ এই কথোপকথন কথকের স্বভাব-চরিত্র নিয়ে আমাদের অনেক কিছু জানায়। নইলে তিনি পাঠকের কাছে খানিকটা রহস্যই থেকে যেতেন।
মুরাকামি
ঠিক তাই। এমন একজন মানুষ, বারো বছরের একটা মেয়েও যার সঙ্গে নিজের স্তন নিয়ে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারে। তার ধাতটাই এমন।
মিয়েকো
এবার আপনার উপন্যাসের নারীদের নিয়ে আরেকটা প্রশ্নে আসি। আপনার লেখা নিয়ে কথা উঠলে যেটা বারবার ফিরে আসে। নারীদের কীভাবে দেখানো হয়, তাদের কী ভূমিকা দেওয়া হয়, সেই প্রসঙ্গ।
আমার নারী বন্ধুরা প্রায়ই বলে, “হারুকি মুরাকামির লেখা যখন এত ভালবাসো, তখন তার নারী-চিত্রণকে সমর্থন করো কীভাবে?” মানে, আপনার গল্পে নারীদের যেভাবে দেখানো হয়, তাতে অনেকের অস্বস্তি হয়। শুধু নারী নয়, পুরুষ পাঠকেরও। একটা চেনা ব্যাখ্যা হল, আপনার উপন্যাসে পুরুষ চরিত্ররা লড়াইটা লড়ে অবচেতনে, ভেতরে ভেতরে। আর বাস্তব জগতের লড়াইটা এসে পড়ে নারীদের কাঁধে।
মুরাকামি
তাই নাকি? কী করে?

মিয়েকো
প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে তারা বাস্তব নারীর মত বিশ্বাসযোগ্য কিনা। মূল কথা তাদের ভূমিকা। যেমন একটু আগে বলছিলাম, নারী চরিত্র অনেক সময় এক ধরনের ভবিষ্যদ্বক্তার কাজ করে। যেন সে নিয়তিরই এক মাধ্যম।
মুরাকামি
হাত ধরে আপনাকে কোথাও নিয়ে যায়।
মিয়েকো
ঠিক তাই। প্রধান চরিত্রের ভেতর সে একটা রূপান্তর ঘটিয়ে দেয়। আপনার অনেক লেখাতেই নারী যেন একটা প্রবেশদ্বার, কিংবা বদলে যাওয়ার একটা সুযোগ।
মুরাকামি
হ্যাঁ, এমন একটা ঝোঁক আছে বইকি।
মিয়েকো
এখানে যৌনতাকে যতক্ষণ একটা অচেনা জগতে ঢোকার পথ হিসেবে দেখা হবে, ততক্ষণ একজন হেটেরোসেক্সুয়াল প্রধান চরিত্রের পাশে নারীর ভূমিকা কেবল যৌনসঙ্গী হিসাবেই আটকে থাকবে; এর বাইরে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। একটা কোণ থেকে দেখলে অনেক পাঠকই বলবেন, শুধু নারী হওয়ার কারণেই আপনার নারী চরিত্ররা বারবার এই অতি-যৌনায়িত ভূমিকায় আটকে যায়। এ নিয়ে আপনার কী মত, জানতে চাই।
মুরাকামি
আমি ঠিক ধরতে পারছি না। এখানে “অতি-যৌনায়িত ভূমিকা” বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন?
মিয়েকো
সেই অজস্র নারী চরিত্রের কথা বলছি, যাদের থাকা যেন শুধু একটা যৌন ভূমিকা পালনের জন্য। গল্পের প্লট, আপনার লেখায় বারবার ফিরে আসা কূপ, কিংবা পুরুষ চরিত্র গড়ায় আপনার কল্পনার কোনো সীমা নেই। কিন্তু ওই পুরুষদের সঙ্গে নারীদের সম্পর্কের বেলায় সেই বৈচিত্র্য নেই। এই নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। প্রধান হোক বা পার্শ্বচরিত্র, খানিকটা স্বাধীনতা পেয়ে কিছুটা নিজেকে মেলে ধরলেও শেষমেশ তারা বারবার পুরুষ নায়কের স্বার্থের বলি হয়। তাই প্রশ্নটা হল, মুরাকামির উপন্যাসে নারীদের কেন এত ঘন ঘন এই ভূমিকাই নিতে হয়?
মুরাকামি
এবার বুঝলাম, আচ্ছা।
মিয়েকো
এ নিয়ে আপনার ভাবনাটা বলবেন?
মুরাকামি
ব্যাখ্যাটা হয়ত আপনার মন ভরাবে না। তবু বলি, আমার কোনো চরিত্রকেই আমি খুব জটিল বলে ভাবি না। নারী হোক বা পুরুষ, সে যে দুনিয়ায় বাস করে তার সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে ঠেকল, সেটাই আমার আসল আগ্রহ। বরং খেয়াল রাখি, অস্তিত্বের মানে, তার গুরুত্ব বা ইঙ্গিত নিয়ে যেন বেশি মাথা না ঘামাই। আগেও বলেছি, অতি-ব্যক্তিকেন্দ্রিক চরিত্র আমার পছন্দ নয়। আর এটা নারী-পুরুষ দুয়ের বেলাতেই সমান খাটে।
মিয়েকো
বুঝলাম।
মুরাকামি
তবে একটা কথা বলব, ‘1Q84’-এ একজন নারী চরিত্রকে নিয়ে আমি সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি। আওমামে তেঙ্গোর কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, আবার তেঙ্গোও আওমামের কাছে ততটাই। তবু তাদের যেন আর দেখা হয়ে ওঠে না। কিন্তু গোটা গল্পটাই ঘোরে তাদের একে অপরের দিকে এগিয়ে আসাকে ঘিরে। দুজনেই সমান মর্যাদার প্রধান চরিত্র। একেবারে শেষে এসে তারা মিলিত হয়। দুইয়ে মিলে এক। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এর মধ্যে যৌনতার লেশমাত্র নেই। সেই অর্থে গোটা উপন্যাসের কাঠামোয় আমি তাদের সমানই দেখি, কারণ বইটা সমানভাবে দুজনের ওপরেই দাঁড়িয়ে।
মিয়েকো
আপনার বড় উপন্যাসগুলি প্রায়ই কোনো না কোনো বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকে ঘিরে গড়ে ওঠে। ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’-এ তোরু আর কুমিকো ওকাদা মুখোমুখি নোবোরু ওয়াতায়ার। আবার ‘1Q84’-এ আওমামে ও তেঙ্গো লড়ছে এক প্রবল অশুভ শক্তির সঙ্গে। দুই উপন্যাসের মিল একটাই, পুরুষদের লড়াইটা চলে অবচেতনের জগতে।
মুরাকামি
এভাবে বললে, হ্যাঁ। হয়ত এখানে চেনা লিঙ্গভূমিকাগুলি উল্টে গেছে। নারীবাদী চোখে আপনি একে কীভাবে দেখেন? সত্যি বলতে, আমি নিজেই নিশ্চিত নই।
মিয়েকো
সেই চেনা ব্যাখ্যাটাই, আপনার পুরুষ চরিত্ররা অবচেতনে ভেতরে ভেতরে লড়ে, আর বাস্তবের কঠিন লড়াইটা নারীদেরই লড়তে হয়। যেমন ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’-এ কুমিকোই লাইফ সাপোর্ট বন্ধ করে নোবোরু ওয়াতায়াকে মারে, আর শেষে সেই মূল্যও তাকেই চোকাতে হয়। ‘1Q84’-এ লিডারকে মারে আওমামে। অবশ্য প্রতিটা উপন্যাসকে নারীবাদী মাপকাঠিতে বিচার করতেই হবে, এমন নয়। আর নীতিকথা শোনাতে তো কেউ কল্পকাহিনি লেখে না। তবু এই চোখে পড়লে অনেক পাঠকের সহজ প্রতিক্রিয়া হবে, “আবার একটা নারী, যার রক্ত ঝরল এক পুরুষের আত্ম-উপলব্ধির জন্য।”
বাস্তব জীবনে বেশির ভাগ নারীই কোনো না কোনো সময় এমন অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন, যেখানে শুধু নারী হওয়াটাই জীবনকে অসহনীয় করে তোলে। ধরুন যৌন সহিংসতার শিকার নারী, উল্টে যাকে দোষ দেওয়া হয়, যেন সে-ই ডেকে এনেছে। ব্যাপারটা শেষমেশ এই দাঁড়ায়, নারীর শরীর থাকার জন্য তাকে অপরাধী বোধ করানো মানে তার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। হয়ত এমন নারীও আছেন, যারা কখনও এভাবে ভাবেননি। কিন্তু বলা যায়, সমাজের চাপে তারা নিজের অনুভূতি চেপে রাখতে বাধ্য হয়েছেন। আর তাই কল্পকাহিনিতেও যখন বারবার এই ছকটা ফিরে আসে, পুরুষের আত্ম-উপলব্ধি বা যৌন কামনার জন্য নারীর আত্মত্যাগ, তখন সেটা দেখতে দেখতে সত্যিই ক্লান্ত লাগে।
মুরাকামি
আমার মনে হয়, এমন কোনো ছক থাকলে সেটা নেহাতই কাকতালীয়। অন্তত আমি কখনও ইচ্ছা করে এভাবে সাজাইনি। হতে পারে, একেবারে অবচেতন স্তরে কোনো গল্প এমন রূপ নেয়। কথাটা যেন এড়িয়ে যাওয়া না শোনায়, তবু বলি, আমার লেখা কোনো বাঁধা ছক মেনে চলে না। ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর কথাই ধরুন। নাওকো আর মিদোরি লড়ছে অস্তিত্বের দুই আলাদা দিকের সঙ্গে, একজন অবচেতনের, আরেকজন সচেতন জীবনের। পুরুষ কথক দুজনের প্রতিই মুগ্ধ। আর সেই মুগ্ধতা তার পৃথিবীটাকে যেন দুভাগ করে দেয়। এরপর ‘আফটার ডার্ক’ (After Dark)। ওখানে গল্প প্রায় পুরোটাই এগোয় নারী চরিত্রদের ইচ্ছার জোরে। কাজেই নারীরা সবসময় শুধু যৌন-ভবিষ্যদ্বক্তার সহায়ক ভূমিকায় আটকে থাকে, এ কথায় আমি সায় দিতে পারি না। গল্পের কাহিনি ভুলে গেলেও নারীরা আমার মনে থেকে যায়। ‘নরওয়েজিয়ান উড’-এর রেইকো বা হাতসুমির কথাই ভাবুন। আজও তাদের কথা ভাবলে আমি আবেগে ভরে উঠি। আমার কাছে তারা নিছক গল্প এগোনোর যন্ত্র নয়। প্রতিটা লেখার নিজস্ব দাবি থাকে। অজুহাত দিচ্ছি না। শুধু নিজের অনুভব আর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
মিয়েকো
আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝি। নিজে লিখি বলে অনুভব থেকে লেখার ব্যাপারটা আমার চেনা। আবার এটাও বুঝি, আমরা এতক্ষণ যে পাঠ-অভিজ্ঞতার কথা বলছিলাম, পাঠক কেন সেখানে গিয়ে পৌঁছান।
আপনি একটা জরুরি কথা বললেন। আপনার মতে, নারী যৌনায়নের গণ্ডি পেরিয়ে যেতে পারে, ওর বাইরে দিব্যি টিকে থাকতে পারে, এমনকি গল্পটাকে একেবারে অন্য দিকেও নিয়ে যেতে পারে।
মুরাকামি
ঠিক। আমার সত্যিই মনে হয়, নারী আর পুরুষের কাজ অনেকটাই আলাদা। কথাটা হয়ত গতানুগতিক, তবু এভাবেই তো নারী-পুরুষ টিকে থাকে, একে অন্যকে সামলে, একজনের ঘাটতি অন্যজন পুষিয়ে। কখনও তাতে ভূমিকা বা দায়িত্ব অদলবদলও হয়ে যায়। কেউ একে স্বাভাবিক দেখবেন, কেউ কৃত্রিম; কেউ ন্যায্য, কেউ অন্যায্য। সবই নির্ভর করে মানুষটার ওপর, তার পরিস্থিতির ওপর। কেউ নারী-পুরুষের ফারাককে দেখেন কঠিন বিরোধ হিসাবে, কেউ দেখেন সুরেলা ভারসাম্য হিসাবে। হয়ত ব্যাপারটা ঘাটতি পোষানোর নয়, বরং একে অন্যকে কাটাকাটি করে সমান করে দেওয়ার। আমার বেলায়, এই জটিল প্রশ্নগুলির মোকাবিলা আমি কেবল কল্পকাহিনি দিয়েই করতে পারি। ইতিবাচক বা নেতিবাচক, কোনো দাবি না রেখে আমার ভেতরে গল্প যেমন আছে, ঠিক তেমনভাবেই তার কাছে পৌঁছাই। আমি তাত্ত্বিক নই, সমালোচকও নই, সমাজকর্মীও নই। আমি স্রেফ একজন ঔপন্যাসিক। কেউ যদি বলেন, কোনো একটা মতবাদের চোখে আমার লেখায় খুঁত আছে, কিংবা আরেকটু ভেবেচিন্তে লিখলে হত, তাহলে আমি শুধু আন্তরিকভাবে বলতে পারি, “আমি দুঃখিত।” সবার আগে আমিই ক্ষমা চাইব।
মিয়েকো
রেমন্ড চ্যান্ডলারের ‘হার্ড-বয়েল্ড’ (Hard-Boiled) উপন্যাসে নারীরা সাধারণত কোনো একটা লক্ষ্য নিয়ে হাজির হয়, কিংবা পুরুষকে দিয়ে কিছু একটা করানোর জন্য। খানিকটা হলেও আপনার লেখাতেও নিশ্চয়ই মিশে আছে, এত যে উপন্যাস পড়েছেন সেখানে নারীদের যেভাবে দেখানো হয়েছে তার ছাপ। কারণ যা পড়ি, তা-ই তো আমাদের লেখায় গভীর ছাপ ফেলে।
তবে আপনার লেখা সব নারীর মধ্যে যাকে আমি সবচেয়ে বেশি দিন মনে রেখেছি, সে “Sleep” (The Elephant Vanishes, ১৯৯৩) গল্পের প্রধান চরিত্র। নারী লেখকদের লেখা অজস্র নারী চরিত্র পড়েছি, পুরুষ লেখকদের লেখাও কম পড়িনি। কিন্তু আজ পর্যন্ত “Sleep”-এর ওই নারীর মত আর কাউকে পাইনি। আমার কাছে এ এক অসাধারণ সাহিত্যিক-অর্জন।
মুরাকামি
গল্পটা দ্য নিউ ইয়র্কার-এ বেরিয়েছিল, তখন আমেরিকায় আমি কার্যত অচেনা এক লেখক। যারা পড়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ভেবেছিলেন “হারুকি মুরাকামি” নিশ্চয়ই একজন নারী। পরে অনেক নারী পাঠকের চিঠি পেয়েছিলাম, একজন নারীর অনুভব এত ভালভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে। এমনটা যে হবে, ভাবিনি।
মিয়েকো
আমি কি ঠিক বলছি, ‘স্লিপ’ই (Sleep) প্রথম গল্প যেখানে আপনি নারীর চোখ দিয়ে লিখলেন?
মুরাকামি
হ্যাঁ, তা-ই তো মনে হয়।
মিয়েকো
তখন এমন কী ঘটেছিল, যা আপনাকে নারী চরিত্রকে কেন্দ্রে রাখতে টানল? নাকি ব্যাপারটা আপনিই ঘটে গেল?
মুরাকামি
গল্পটা লিখেছিলাম রোমে থাকতে। ঠিক ভেঙে পড়িনি, তবে নরওয়েজিয়ান উড (Norwegian Wood)-কে ঘিরে জাপানে যে হইচই শুরু হয়েছিল, তাতে ভীষণ অস্থির লাগছিল, বইটা তো ওখানে হুড়মুড়িয়ে বেস্টসেলার। যথেষ্ট হয়েছে, এবার অন্য এক জগতে পালাই, এমন মনে হচ্ছিল। তাই জাপান ছেড়ে ইতালিতে চলে যাই, কিছুদিন একদম আড়ালে থাকি। খানিকটা বিষণ্নতাও পেয়ে বসেছিল, লেখা প্রায় বন্ধ। তারপর একদিন হঠাৎ আবার লেখার তাগিদ ফিরে এল, আর তখনই লিখলাম ‘টিভি পিপল’ (TV People) আর ‘স্লিপ’ (Sleep)। মনে আছে, তখন সবে বসন্ত।
মিয়েকো
কোনটা আগে শেষ করেছিলেন? ‘টিভি পিপল’?
মুরাকামি
মনে হয় ‘টিভি পিপল’-ই আগে। এমটিভিতে লু রিডের একটা মিউজিক ভিডিও দেখেছিলাম, এমন অনুপ্রেরণা পেলাম যে প্রায় এক বসাতেই লিখে ফেলি। এরপর ‘স্লিপ’-এর জন্য বেছে নিই এক নারী কথককে। তখনকার অনুভবটা প্রকাশ করার এটাই সবচেয়ে ভাল উপায় মনে হয়েছিল। খানিকটা দূরত্ব চাইছিলাম, হয়ত নিজের কাছ থেকেও। সে কারণেই বোধ হয় প্রধান চরিত্র হিসাবে এক নারীকে নিলাম। যত দূর মনে পড়ে, ওটাও বেশ দ্রুতই লেখা হয়ে গিয়েছিল।
মিয়েকো
‘স্লিপ’ একেবারে অসাধারণ। ঘুমাতে না পারা যেন এমন এক জগতে বেঁচে থাকা, যেখানে মৃত্যু বলে কিছু নেই। সেই অস্বস্তি, এক মুহূর্তের জন্যও আলগা না হওয়া সেই বিশেষ টানটান ভাব। নারীর অস্তিত্বের এ যেন নিখুঁত এক রূপক। ছোটগল্প বলে ধরে নিচ্ছি লিখতে কয়েক দিন লেগেছিল?
মুরাকামি
হ্যাঁ, তবে ঘষামাজা করে দাঁড় করাতে সপ্তাহখানেক লেগেছিল।
মিয়েকো
আমি নিজে ‘স্লিপ’ লাইন ধরে ধরে পড়তে কয়েক দিনের বেশিই কাটিয়েছি। সত্যিই এর আগে এমন কোনো নারী পড়িনি। একজন নারী হিসাবে কোনো লেখায় এমন এক “নতুন নারী”র দেখা পাওয়া ছিল ভারি আনন্দের। আরও অবাক লাগে, চরিত্রটা লিখেছেন একজন পুরুষ। পড়াটা আমার কাছে দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
আপনার লেখা সব নারীর মধ্যে ‘স্লিপ’-এর এই নারী আমার কাছে সবার ওপরে। একজন নারীবাদী হিসাবে এই চরিত্রকে পেয়ে আপনার লেখার প্রতি আমার এক আস্থা জন্মেছিল, আর তা রীতিমত গভীর আস্থা। মানে, লেখার প্রতি, শব্দের প্রতি এক নিশ্চিন্ত ভরসা। জানি, আপনি নারী লেখক গ্রেস প্যালির ছোটগল্প জাপানিতে অনুবাদ করেছেন, তাই ভাবি হয়ত কোথাও একটা যোগ আছে। নারী চরিত্র গড়ার ব্যাপারে।
মুরাকামি
আমি ঠিক তা বলব না। গ্রেস প্যালির গল্প আমার দারুণ লাগে বলেই অনুবাদ করার কথা ভেবেছিলাম। তিনি নারীদের কীভাবে আঁকেন, তা নিয়ে সচেতনভাবে ভাবিনি। ‘স্লিপ’ লেখার সময়ও মনে যা এসেছে তা-ই লিখেছি, ভেবেছি ওই পরিস্থিতিতে একজন নারী কেমন হতেন। ওইবার কাকতালীয়ভাবেই কথক একজন নারী। নারীর মন খুঁড়ে দেখার সচেতন কোনো চেষ্টা আমার ছিল না।
সাহিত্য বক্স
মুরাকামির অনুবাদে গ্রেস প্যালি

মুরাকামি শুধু ঔপন্যাসিক নন, দক্ষ অনুবাদকও। রেমন্ড কারভার, ফিটজেরাল্ড, স্যালিঞ্জার—আমেরিকান সাহিত্যের অনেককেই তিনি জাপানি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু নারী লেখকদের মধ্যে প্রথম যাকে বেছে নিলেন, তিনি গ্রেস প্যালি (Grace Paley)। নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে জন্মানো, রুশ থেকে আসা ইহুদি অভিবাসী পরিবারের এই লেখক সারা জীবনে লিখেছেন মাত্র তিনটি ছোটগল্প-সংকলন। মুরাকামি প্রায় ত্রিশ বছর ধরে সেই তিনটিই অনুবাদ করেছেন (১৯৯৯, ২০০৫, ২০১৭)।
তার ভাষায়, প্যালিকে কেন এত পছন্দ, কেন তার তিনটি বইয়ের সবই নিজেকে অনুবাদ করতে হবে, তা তিনি নিজেও ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারেন না—তবু প্যালির গল্প-জগতের সহজ শক্তি, তার অবিচল দৃষ্টি আর প্রায়ই ছক-ভাঙা অথচ নিখুঁত শব্দচয়ন তাকে টানে।
প্যালির গল্প বলা মানে সাধারণ নারীর দৈনন্দিন কণ্ঠস্বর: রান্নাঘর, সন্তান, প্রতিবেশী, চাপা ক্ষোভ। বড় কোনো কাহিনি নয়, শুধু জীবন্ত এক গলা। এই আলাপে কাওয়াকামি ইঙ্গিত করেন, “Sleep”-এর সেই নারীর জন্ম হয়ত এখান থেকেই। মুরাকামি অবশ্য সরাসরি যোগসূত্র মানতে চান না; বলেন, প্যালিকে ভাল লেগেছিল বলেই অনুবাদ করেছেন, নারী-চিত্রণের কথা ভেবে নয়।
একটা কথা তিনি স্পষ্ট বলেন, যা এই সাক্ষাৎকারের সঙ্গেও মেলে: প্যালির সঙ্গে তার নিজের লেখার তেমন মিল নেই বলেই তার ধারণা। তবে সমালোচকেরা মনে করেন, যারা মুরাকামির “আফটারনুন অব দ্য লাস্ট লন” বা “চিজকেকের মত আকারের আমার দারিদ্র্য”-এর জগত পছন্দ করেন, তারা প্যালির গল্পেও সেই স্বাদ পাবেন।
তবু ব্যাপারটা এত সহজে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। যে লেখক নারীর ভেতরের গলা শুনতে এতটা মন দিয়েছেন—তিন দশক ধরে, স্বেচ্ছায়—তার নিজের কলমে যদি কোনো “নতুন নারী” জন্ম নেয়, সেই টান হয়ত অস্বীকারের চেয়ে গভীর।
বি.স.
মিয়েকো
নারী চরিত্র লিখতে গিয়ে অনেক লেখক এমন কিছু চেনা ছাঁচ কাজে লাগান, যাতে নারী-পুরুষ দু’রকম পাঠকেরই মনে হয়, হ্যাঁ, এ তো “বিশ্বাসযোগ্য নারী”। কিন্তু এই গল্পে ওসবের কিছুই নেই।
মুরাকামি
শুধু শেষটুকু বাদে, যখন সে রাতে সমুদ্রের ধারে গাড়ি থামায়। ওই একটা দৃশ্যেই আমি তীব্রভাবে টের পাচ্ছিলাম, প্রধান চরিত্রটা একজন নারী। আঁধার রাতে দুটো লোক একটা নারীর গাড়ি ঘিরে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করেছে, ভাবুন তো কতটা ভয়ের!
মিয়েকো
একজন পুরুষের কাছেও ওটা ভয়ের। তবে নারীর কাছে বোধ হয় আরও বেশি।
মুরাকামি
ওই দৃশ্যটুকু বাদে গল্পের বাকি সবখানে চরিত্রটিকে আমি নিছক একজন মানুষ হিসেবেই লিখেছি। আলাদা করে নারী ভেবে নয়।
মিয়েকো
ঠিক। আমার মনে হয়, এই যে খানিকটা দূরত্ব রেখে আগে মানুষটাকে দেখা, নারী চরিত্রের ভেতরকার মানুষটাকে, এটাই শেষ পর্যন্ত তার নারীসত্তাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। অন্তত আমার চোখে। এমন নারী আর কোথাও পড়িনি। কী চমৎকার গল্প।
মুরাকামি
এখন পেছন ফিরে মনে হয়, প্রধান চরিত্রটা যদি ঘরকন্না-করা এক পুরুষ হত, আর স্ত্রী হতেন ডাক্তার কিংবা দন্তচিকিৎসক, তাহলেও গল্পটা দিব্যি দাঁড়াত। স্বামী ঘুমাতে পারছে না, সারারাত জেগে রাঁধছে, কাপড় কাচছে, এমন কিছু একটা। তবে সে-গল্প কোথাও কোথাও অন্যরকম হত, সন্দেহ নেই।
মিয়েকো
আমার মনে হয়, দম্পতির একটা ছেলে থাকাটা এখানে খুব জরুরি। সন্তান জন্ম দিয়েছে নারীই। আর এই বোধটাই তাকে এমন এক হতাশায় ঠেলে দেয়, যা বাবা ঠিক ভাগ করে নিতে পারে না।
মুরাকামি
তার ওপর স্বামীর প্রতি ওই চাপা ক্ষোভ। আমার মনে হয়, ওই ধরনের ক্ষোভ যেন নারীদেরই একেবারে নিজের।
মিয়েকো
ক্ষোভ বললে তো কমই বলা হয়, এর তলায় আরও কিছু আছে। তবে ক্ষোভ যে আছে, সেটা ঠিক।
মুরাকামি
হ্যাঁ। মাঝেমধ্যে বাড়িতে পায়চারি করতে করতে টের পাই, জিনিসটা যেন আমার পেছন পেছন হাঁটছে। ঘরের ভেতর চুইয়ে ঢুকছে।
মিয়েকো
“চুইয়ে ঢোকা” নিয়ে যদি নালিশ, তাহলে তো ভাগ্য ভালই বলতে হয়! বেশির ভাগ সংসারে ওটা রীতিমত বান ডাকে। যাক, একটা জিনিস ভাবছিলাম। ছেলে আর বাবা, দুজনকেই আপনি অনেকটা একইভাবে চলতে দেখিয়েছেন। যেমন দুজনেই তাকে একই ভঙ্গিতে হাত নাড়ে। ক্ষোভটা যেহেতু সরাসরি বলা হয়নি, পাঠক ওটাকে একটা নামহীন অনুভূতি হিসাবেই ধরতে পারেন। আর তাকে ‘আন্না কারেনিনা’ পড়তে দেওয়াটাও দারুণ।
মুরাকামি
আন্না কারেনিনা। স্বামীর প্রতি ক্ষোভের আরেক ক্লাসিক নমুনা। হয়ত তলস্তয়ও নিজের সংসারে এমন চাপা টান টের পেতেন, যা নিঃশব্দে ঘরময় চুইয়ে পড়ত।
মিয়েকো
আপনি দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে অজস্র পুরুষ চরিত্র গড়েছেন। সামনে কি এমন কোনো নারী চরিত্রও আসবে, যে ‘কিলিং কমেন্ডাটোর’-এর মেনশিকির মত রহস্যময়, একটু অচেনা, যাকে দেখে মনে হবে, “বাহ, এ তো একদম নতুন”? নাকি আপনার নারীরা ভবিষ্যতেও মূলত প্রতীকী বা পৌরাণিক ভূমিকাতেই, মানে গল্পে নির্দিষ্ট একটা কাজ সেরে দেওয়ার ভূমিকাতেই থেকে যাবে?
মুরাকামি
পুরোনো চরিত্রের পুনরাবৃত্তি আমি নিশ্চয়ই চাই না। বরাবরই নতুন চরিত্র গড়তে চাই, নারীর বেলাতেও ঠিক তেমন। ধরুন শোকো আকিগাওয়ার কথাই। পার্শ্বচরিত্র হতে পারেন, কিন্তু আমার আগের বেশির ভাগ নারী চরিত্র থেকে তিনি আলাদা। তার ভেতরে এমন কিছু আছে, যা আমাকে সত্যিই টানে। তাকে আরও জানতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, এখনও তার উপরিভাগটুকুই ছুঁয়েছি।
মিয়েকো
শোকো কী পড়ে, সেটা জানতে আমার ভারি কৌতূহল। বলুন তো, তার বিছানার পাশে কোন বই থাকে? পেতে পারলে সবচেয়ে রুক্ষ হার্ড-বয়েল্ড উপন্যাসটাই? সত্যিই জানতে ইচ্ছে করছে। এই যে সে বই খুলে বসল, কী পড়ছে সে? আমি কিন্তু আন্দাজই করতে পারছি না।
মুরাকামি
সম্ভবত ‘রোম্যান্স অব দ্য থ্রি কিংডমস’-এর মত কোনো মহাকাব্য।
মিয়েকো
শোকো তাহলে বেশ শক্ত ধাতের মানুষ! কোনো কোনো উপন্যাসে নারী চরিত্রের চুল, পোশাক, সবকিছুর খুঁটিনাটি বর্ণনা থাকে। যেমন চ্যান্ডলারের লেখায় কোনো নারী প্রথম এলেই মাথা থেকে পা পর্যন্ত এমন বর্ণনা, যে চোখের সামনে স্পষ্ট ছবি ভেসে ওঠে। আপনার উপন্যাসেও চরিত্রকে অনেক সময় পোশাকের সূক্ষ্ম বর্ণনায় পরিচয় করানো হয়। নারীদের পোশাকের এত খবর আপনি পান কোথা থেকে?
সাহিত্য বক্স
শোকোর নাইটস্ট্যান্ডে তিন রাজ্যের যুদ্ধ
মিয়েকো জানতে চেয়েছিলেন, শোকো আকিগাওয়া বিছানায় শুয়ে কী পড়েন। মুরাকামির উত্তর: “রোম্যান্স অব দ্য থ্রি কিংডমস”-এর মত কোনো মহাকাব্য। বইটা চিনলেই বোঝা যায়, কেন মিয়েকো সঙ্গে সঙ্গে শোকোকে “শক্ত মনের মানুষ” বলেন।

চতুর্দশ শতকে লুও গুয়ানঝং-এর হাতে লেখা এই চীনা মহাকাব্য দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত পর্বের ওপর, “তিন রাজ্যের কাল” (২২০–২৮০ খ্রিস্টাব্দ)। রাজবংশের পতন, সেনাপতিদের ছল, যুদ্ধের কৌশল, বিশ্বাসঘাতকতা—শত শত চরিত্র নিয়ে বিস্তৃত এক আখ্যান। ইতিহাস, লোককথা আর কল্পনা মিশে গেছে এতে। রোম্যান্স অব দ্য থ্রি কিংডমস চীনা ধ্রুপদী সাহিত্যের “চার মহাগ্রন্থের” একটি; বাকি তিনটি: ‘ওয়াটার মার্জিন’, ‘জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট’ আর ‘ড্রিম অব দ্য রেড চেম্বার’। আজও পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি, সমরচিন্তা, এমনকি ভিডিও গেম পর্যন্ত এর ছায়া টের পাওয়া যায়।
কোমল প্রেমকাহিনি নয়, শোকো হাতে তুলে নেন সেনাপতি আর সাম্রাজ্যের এই মহাগ্রন্থ। মুরাকামির এই ছোট্ট ইঙ্গিতেই তার চরিত্রের ভেতরের জোরটা ধরা পড়ে—যে জোরের কথা তিনি সরাসরি না বলে পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেন।
মুরাকামি
কোথাও থেকে না। মনে যা আসে, লিখি। এসব নিয়ে আলাদা করে ঘাঁটাঘাঁটি করি না। কোনো নারী চরিত্রের ছবি মনে গড়ে উঠলে সে কী পরে আছে, সেটাও আপনিই ছবির সঙ্গে চলে আসে। তবে একটা কথা বলি… বাস্তব জীবনেও বোধ হয় নারীদের পোশাক আমি বেশ খুঁটিয়ে দেখি। কারণ কেনাকাটা আমার নিজেরও ভারি পছন্দ।
মিয়েকো
“Tony Takitani” (Blind Willow, Sleeping Woman, ২০০২) গল্পে স্ত্রীর চরিত্রটা কেনাকাটার নেশায় বুঁদ। শেষমেশ সেই নেশাই তাকে গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। পোশাকের কথা ভাবলেই তার গা কেঁপে ওঠে, এই ছোট্ট বর্ণনাটুকু আমার দারুণ লাগে।
কথায় কথায় আপনার গড়া নারী চরিত্রগুলির কত রকম চেহারা মনে পড়ছে। সবাইকে এক পাল্লায় মাপা যায় না, সেটা মানি। তবে একটা নারী চরিত্র তৈরি করা আর তাকে গল্পে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা, দুটি এক জিনিস নয়।
আরো পড়ুন: দ্য টেল অফ কাহো: তিন বছর পর মুরাকামি এবার এক নারীর চোখ দিয়ে
মুরাকামি
সত্যি বলতে, আমার লেখায় কোনো একটা ছক বা পুনরাবৃত্তি আছে, এই ধারণাটাই আমার মাথায় ঢোকে না। নারী চরিত্রদের একসঙ্গে নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তারা একেকজন আলাদা মানুষ। একদম গোড়ায়, নারী বা পুরুষ ভাবার আগে আমি তাদের মানুষ হিসাই দেখি। যাক ওসব, “The Little Green Monster” (The Elephant Vanishes, ১৯৯৩) গল্পের সেই স্ত্রীর কথা কী বলবেন? বেশ ভয়ের মানুষ, তাই না?
মিয়েকো
হ্যাঁ, তার কথাও তো আছে।
মুরাকামি
ওই গল্পে নারীদের ভেতর মাঝেমধ্যে দেখা এক ধরনের নিষ্ঠুরতা খুঁজে দেখতে চেয়েছিলাম। ওই নিষ্ঠুরতা আছে, টের পাই, কিন্তু তার ভেতরটা পুরো বুঝি, এমন দাবি করি না। নারী-পুরুষের ফারাকের তর্কে ফিরে গিয়ে আবার বিপদে পড়তে চাই না। তবু মনে হয়, এমন নিষ্ঠুরতা পুরুষের মধ্যে কমই মেলে। পুরুষও নিষ্ঠুর হয় বইকি। তবে তাদের নিষ্ঠুরতার ছাঁদ বেশি গোছানো। হয় যুক্তির খোঁচায় আঘাত করে, নয়ত একেবারে সাইকোপ্যাথের মত। কিন্তু নারীর নিষ্ঠুরতা অনেক বেশি রোজকার, অনেক বেশি সাদামাটা। মাঝেমধ্যে অসতর্ক মুহূর্তে ধরে ফেলে। মজার ব্যাপার, “The Little Green Monster” অনেক নারী পাঠকেরই ভারি পছন্দের। কিংবা ভেবে দেখলে, এতে অবাক হওয়ার কী-ই বা আছে।
মিয়েকো
হ্যাঁ, আমার অনেক বন্ধুও গল্পটা ভালোবাসে। আমারও অন্যতম প্রিয়। কী বলি বলুন তো… এর ভয়টা আলাদা করে ভয় বলে বাজে না। পাঠক ওটাকে জীবনের একদম সহজ-স্বাভাবিক অংশ হিসাবেই মেনে নেন। খুব চেনা, খুব ঘরোয়া এক নিষ্ঠুরতা।
পরিচিতি
হারুকি মুরাকামির জন্ম ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োতোতে; এখন থাকেন তোকিওর কাছে। সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক তিনি, লেখা অনূদিত হয়েছে পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায়। তার বইয়ের মধ্যে আছে ‘Norwegian Wood’, ‘The Wind-Up Bird Chronicle’, ‘Kafka on the Shore’, ‘1Q84’ ও ‘Killing Commendatore’। আন্তর্জাতিক সম্মাননার মধ্যে আছে ফ্রানৎস কাফকা পুরস্কার (২০০৬), জেরুজালেম পুরস্কার (২০০৯), হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেন সাহিত্য পুরস্কার (২০১৬) এবং প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস সাহিত্য পুরস্কার (২০২৩)। লিয়েজ, প্রিন্সটন, টাফটস, ইয়েল, নোভা গোরিৎসা ও আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দিয়েছে।
মিয়েকো কাওয়াকামির জন্ম ১৯৭৬ সালে জাপানের ওসাকায়। গায়িকা ও গীতিকার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করে ২০০৬ সালে কবি হিসাবে সাহিত্যে পা রাখেন। ২০০৭ সালে বেরোয় তার প্রথম নভেলা ‘My Ego, My Teeth, and the World’, যা আকুতাগাওয়া পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং তরুণ উদীয়মান লেখকদের সুবোউচি শোয়ো পুরস্কার পায়। পরের বছর ছোট নভেলা আকারে প্রকাশিত ‘Breasts and Eggs’ জিতে নেয় জাপানের সবচেয়ে মর্যাদার সাহিত্যসম্মান আকুতাগাওয়া পুরস্কার, প্রশংসা কুড়ায় খ্যাতিমান লেখক ইয়োকো ওগাওয়ার। পরে তিনি বইটিকে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে সম্প্রসারিত করেন, যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা পায়। তার বইয়ের মধ্যে আছে ‘Breasts and Eggs’, ‘Heaven’ ও ‘All the Lovers in the Night’; লেখা অনূদিত হয়েছে ২০টিরও বেশি ভাষায়। তিনি আকুতাগাওয়া, তানিজাকি ও মুরাসাকি শিকিবু পুরস্কার পেয়েছেন। থাকেন তোকিওতে।
আ ফেমিনিস্ট ক্রিটিক অব মুরাকামি নভেলস, উইথ মুরাকামি হিমসেলফ; জাপানি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ: স্যাম বেট ও ডেভিড বয়েড; বাংলা অনুবাদ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: ব্রাত্য রাইসু
