Skip to content
সাহিত্য ডটকম সাহিত্য ডটকম

  • হোম
  • প্রবন্ধ
  • কবিতা
  • গল্প
  • আলাপ
  • প্রতিকৃতি
  • বই
  • বিবিধ
    • অ্যানেকডোট
  • ইতিহাস
  • দর্শন
সাহিত্য ডটকম
সাহিত্য ডটকম

ভাষা যেভাবে বাস্তবতাকে বিকৃত করে

Posted on October 23, 2026November 3, 2026 By সাহিত্য ডেস্ক

ভাষা হল অন্যদের কাছে পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার প্রধান মাধ্যম। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাতে আমরা বেশ ভেবেচিন্তে শব্দ বেছে নিই। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিজেই আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, তার মাধ্যমে আগে থেকেই গড়ে ওঠে। তাই ভাষা কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম নয়। ভাষা পৃথিবী যেমন ঠিক তেমনভাবে তুলে ধরে না। ভিন্ন ভিন্ন শব্দভান্ডার ব্যবহার করে আমরা বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন চিত্র তৈরি করি। তবে ভাষার বাইরেও যে বাস্তবতা রয়েছে, তা আমাদের এই ধারণা তৈরির ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণ করে দেয়। ভাষার প্রধান কাজ যদি সত্য প্রকাশ করা হয়, তাহলে ভাষাকে বেশ ত্রুটিপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু ভাষাকে অন্যদের বোঝানো ও কোনো বিষয়ে রাজি করানোর হাতিয়ার হিসাবে দেখলে এর শক্তিগুলিও বোঝা যায়। এই প্রস্তাব তুলে ধরেছেন নিক এনফিল্ড তার বইয়ে। ১৯৬০-এর দশকে প্রাইমেট বা মানুষ-সদৃশ প্রাণী নিয়ে গবেষক জন গ্লাক তার গবেষণাজীবন শুরু করেন। তখন তিনি সদ্যোজাত রিসাস বানরদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নিতেন। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব বোঝার জন্য তাদের একা একা খালি ইস্পাতের খাঁচায় বড় করতেন। একসময় তিনি নিজের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। তার কাজের কারণে প্রাণীদের যে ক্ষতি ও কষ্ট হয়েছে, তার জন্য তিনি গভীরভাবে অনুতপ্ত হন। সফল বৈজ্ঞানিক ক্যারিয়ারের মাঝপথে গ্লাক গবেষণা ছেড়ে দেন এবং প্রাণীদের কল্যাণে কাজ করা শুরু করেন। পরে নিজের অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি এমন একটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেন, যা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন একজন ভাল মানুষও খারাপ কাজ করতে পারে। সেই বিষয়টি হল ভাষা।


নিক এনফিল্ড এর Language vs. Reality বই থেকে সম্পাদিত অংশ


ক্যারিয়ারের শুরুতে তরুণ বিজ্ঞানী গ্লাক মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা, আচরণবাদ বা বিহেভিয়ারিজমের ভাষা পছন্দ করতেন। এই ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান প্রকাশ পেত। আচরণবাদী বলবেন না যে কোনো প্রাণী ভয় পেয়েছে—তিনি বলবেন, প্রাণীটি কোনো কিছু এড়িয়ে চলছে। তিনি বলবেন না যে প্রাণীটি বুদ্ধিমান—বলবেন, প্রাণীটি নির্ভুলভাবে কাজ করছে। তিনি বলবেন না যে প্রাণীটি ক্ষুধার্ত—বলবেন, প্রাণীটিকে খাবার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, অথবা খাবার গ্রহণ করতে তার কত সময় লাগছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা বিজ্ঞানীদের নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে গ্লাকের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। তার শিক্ষক ও সহকর্মীরা যে ভাষা ব্যবহার করতেন, সেই ভাষা অনুসরণ করতে গিয়ে গ্লাক তার গবেষণার প্রাণীদের ভেতরের অনুভূতিগুলিকে আড়াল করে ফেলেছিলেন—কেউ কেউ বলতে পারেন, একেবারে মুছে দিয়েছিলেন। গ্লাক লিখেছিলেন, “নিয়মিত ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলির বর্ণনা দিতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, সেটিকে যদি আপনাকে নিষ্প্রাণ ও নিরীহ করে তুলতে হয়, তাহলে আপনি নৈতিকভাবে বিপজ্জনক পথে পা দিয়েছেন।”

সেই বিপজ্জনক পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় গ্লাক দুটি উদ্দেশ্যে ভাষার শক্তি ব্যবহার করেছিলেন। প্রথমটি ছিল নিজের কাজ ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবতার একটি ব্যাখ্যা তৈরি করা। দ্বিতীয়টি ছিল নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো, অর্থাৎ সেগুলিকে ন্যায্য প্রমাণ করা। শব্দ কীভাবে একটি জগৎ তৈরি করতে এবং সেই জগৎকে রক্ষা করতে পারে, তা বুঝতে পেরে জন গ্লাক একটি মৌলিক বিষয় উপলব্ধি করেন।

ভাষা যেমন ভৌত বাস্তবতা তৈরি করতে পারে না, তেমনি বাস্তবতা যেমন আছে, ভাষা কেবল সেটির প্রতিফলনও ঘটাতে পারে না। ভাষা সব সময় বাস্তবতার একটি ব্যক্তিনির্ভর চিত্র তুলে ধরে, যার দুটি দিক রয়েছে। একদিকে থাকে ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি, অন্যদিকে থাকে বক্তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, যা তিনি বেছে নেওয়া শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্দেশ্য ভাষাকে প্রভাবিত করে। আবার ভাষাও বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে গড়ে তোলে। গ্লাক আগে যে ভাষা ব্যবহার করতেন, তা যেমন তার পুরোনো বিশ্বদৃষ্টিকে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল, তেমনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতেও ভাষা ভূমিকা রেখেছিল। এর ফলে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে পরিবর্তন আসে এবং তিনি নিজের ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ পান। গ্লাকের গল্প থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, তা দিয়েই নিজেদের জগৎ তৈরি করি।

এর অর্থ এই নয় যে শব্দ দিয়ে আমরা সরাসরি, জাদুর মত বা অন্য কোনোভাবে বাস্তব জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যেমন, পৃথিবীতে আমার যত দিনই কাটুক না কেন, আমি যা-ই বলতে পারি, তাতে মাধ্যাকর্ষণ বলের অধীন থাকার সত্যটি বদলাবে না। ভাষা দিয়ে আমরা জগৎ তৈরি করি, কিন্তু এর ফলে ভৌত বাস্তবতার কাছে আমাদের জবাবদিহির দায় শেষ হয়ে যায় না। এ কারণেই সত্য অনুসন্ধান—যে কাজে ভাষা ও যুক্তি থেকে তৈরি হওয়া পক্ষপাত সম্পর্কে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হয়—আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মানুষের মন নিয়ে গবেষকেরা অনেক দিন ধরেই জানেন, সত্য খুঁজে বের করার জন্য মানুষের যুক্তিবোধ আদর্শ কোনো হাতিয়ার নয়। আমাদের উপলব্ধি ও যুক্তি প্রয়োগের ধরন নানা ধরনের পক্ষপাত ও সীমাবদ্ধতার শিকার হয়। ২০১৭ সালে প্রকাশিত দ্য এনিগমা অব রিজন বইয়ে জ্ঞানীয় বিজ্ঞানী হুগো মার্সিয়ে ও ড্যান স্পারবার যুক্তি দেন, এর অর্থ এই নয় যে মানুষের যুক্তিবোধ তার কাজের জন্য উপযুক্তভাবে গড়ে ওঠেনি। এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেত কেবল তখনই, যদি ধরে নেওয়া হত যে যুক্তিবোধের বিবর্তনীয় উদ্দেশ্য হল বস্তুনিষ্ঠ সত্যে পৌঁছানো। কিন্তু মার্সিয়ে ও স্পারবারের মতে, যুক্তিবোধের বিবর্তন ঘটেছে অন্য একটি উদ্দেশ্যে। মানুষের যুক্তিবোধ যেমন, তেমন হওয়ার কারণ হল এটি আসলে একটি সামাজিক হাতিয়ার। নিজের মনে একা বসে ধ্রুপদি যুক্তিবিদ্যার নিয়ম মেনে সত্যে পৌঁছানোর হাতিয়ার হিসাবে দেখলে যুক্তিবোধকে “ত্রুটিপূর্ণ” মনে হতে পারে। আসলে মানুষের যুক্তিবোধের বিবর্তন ঘটেছে অন্যদের বোঝানো ও রাজি করানো, তর্কে জেতা, অন্যদের কাছে নিজের কাজ ও সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেওয়া এবং সেগুলিকে ন্যায্য প্রমাণ করার জন্য। কোনো বক্তব্য সত্য না হয়েও, নির্বিশেষে এসব উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে। কোনো বিষয় মিথ্যা হলেও কাউকে তা বিশ্বাস করাতে পারলে আমার লাভ হতে পারে। (তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষকে মিথ্যা বিষয়ে বিশ্বাস করানো ভাল কাজ!)

আমরা ভাবি মানুষ সবসময় ঠান্ডা মাথায়, একদম হিসাব-নিকাশ করে লজিক্যালি সিদ্ধান্ত নেয়—কিন্তু আসলে তা নয়। আমাদের যুক্তির পেছনে অনেক সময়ই লুকিয়ে থাকে রাগ, ক্ষোভ, ভালবাসা বা পক্ষপাতিত্বের মত নানা আবেগ। আমরা যাকে নিজের ভেতরের বিজ্ঞানী বলে মনে করি, তিনি আসলে একজন আইনজীবী। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি, এখানে “বিজ্ঞানী” ও “আইনজীবী” শব্দ দুটি ব্যবহার করছি ভাষার কাজ সম্পর্কে চিন্তা করার দুটি ভিন্ন ধরন বোঝানোর জন্য। বিজ্ঞানী সত্য জানতে চান, আর আইনজীবী চান অন্যকে নিজের বক্তব্যে রাজি করাতে। রাজি করানোর সময় আইনজীবীর লক্ষ্য সত্য খুঁজে বের করা নয়, বরং নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করা—অথবা যারা তাকে পারিশ্রমিক দেন, তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করা। তার লক্ষ্য কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করা নয়, বরং নিজের অবস্থানকে রক্ষা করা। লক্ষ করুন, বিজ্ঞানী কখনও কখনও একা কাজ করতে পারেন, কিন্তু আইনজীবীর কাজ অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। আর ভাষা হল তার প্রধান হাতিয়ার।

ভাষা যে মূলত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক সমন্বয়ের অবকাঠামো—এই ধারণা ভাষার কিছু সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে। ভাষা কেন আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়, কেন এর অর্থ এত অস্পষ্ট ও আনুমানিক হয়, কেন এটি আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয় বা মূল বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, আর কেন কোনো অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে বা মনের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আমরা এর সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ি, তা এই ধারণা দিয়ে বোঝা যায়। একই সঙ্গে, ভাষাকে সামাজিক সমন্বয়ের হাতিয়ার হিসাবে দেখলে বোঝা যায়, কিছু কাজে এটি এত ভাল কেন। যেমন, মানুষের মনোযোগ নির্দিষ্ট দিকে চালিত করা, ইচ্ছেমত কোনো পরিস্থিতিকে একটি বিশেষভাবে উপস্থাপন করা, মানুষের পক্ষপাতকে কাজে লাগানো, পারস্পরিক যোগাযোগকে নিজেদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরিচালনা করা, অন্যদের কাছে নিজের সুনাম রক্ষা করা এবং সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করা।

ভাষার সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল, এর মাধ্যমে আমরা এমন কথাও বলতে পারি, যা সত্য নয়। বিপদটা শুধু এই নয় যে মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে; বিপদ হল, মিথ্যা কখনও কখনও সত্যের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। মানুষের সামাজিক জীবনের কারণে সত্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিপ্রাকৃত সত্তা ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে মানুষের দৃঢ় বিশ্বাসের পেছনে এই বিষয়টি কাজ করে। সারা বিশ্বের বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যেই এ ধরনের বিশ্বাস দেখা যায়। এর কারণ হল, কোনো বক্তব্য এবং সেই বক্তব্য যে বাস্তবতার বর্ণনা দেওয়ার দাবি করে, তাদের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। কোনো গোষ্ঠীর মানুষ যদি সম্মিলিতভাবে এমন একটি বিশ্বাস প্রকাশ করে, যা প্রত্যেকে মনে মনে মিথ্যা বলে জানে, তাহলে সেই বক্তব্য সন্দেহ তৈরি করার বদলে গোষ্ঠীর প্রতি প্রত্যেক ব্যক্তির আনুগত্যের অকপট সংকেত হয়ে উঠতে পারে। লেখক কার্টিস ইয়ারভিন ব্যাখ্যা করেছেন, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবাস্তব ধারণা কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক আনুগত্য নিশ্চিত করাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে মানুষকে একত্রিত করার জন্য যে বিশ্বাস ব্যবহার করা হবে, সেটি স্পষ্টতই মিথ্যা হওয়াই বরং বেশি কার্যকর হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “সত্যের চেয়ে অর্থহীন ধারণা মানুষকে সংগঠিত করার বেশি কার্যকর হাতিয়ার। … অর্থহীন কিছুতে বিশ্বাস করা হল আনুগত্যের এমন এক প্রমাণ, যা জাল করা যায় না। এটি রাজনৈতিক পোশাকের মত কাজ করে। আর আপনার কাছে যদি একটি পোশাক থাকে, তাহলে আপনার একটি সেনাবাহিনীও আছে।” কোনো অবস্থান রক্ষার জন্য মানুষের আনুগত্য নিশ্চিত করাই যদি আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে এই কৌশল কাজে লাগতে পারে। কিন্তু একসময় বাস্তবতা আপনার সামনে এসে দাঁড়াবেই। প্রকৃত সৈনিকেরা জাদুকরি ধারণার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাজ শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করা; জাদু নয়, বরং ভৌত বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। একবার গুলি ছুটে গেলে শব্দ কিংবা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা বিশ্বাস—কোনোটিই তা থামাতে পারে না।

এ কারণেই বলা যায় না যে আমরা যেভাবে কথা বলি, তার বাইরে কোনো বাস্তবতা নেই, কিংবা আমরা যা বলি, বাস্তবতা তা-ই। উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা অনেক সময় দাবি করেন যে পরম সত্য বা বাস্তব বলে কিছু নেই, সবকিছুই মানুষের মনের ধারণা। এই ধারণাটির যে অদ্ভুত বা অতি-কাল্পনিক রূপ আমাদের সামনে তুলে ধরা হয়—যা আসলে কোনো মানুষই তার বাস্তব জীবনে মেনে চলে না—তা সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে হয় এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে আমরা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছি এবং যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খাদ্য, বাতাস, পানি, আলো আর যেকোনো ধরনের আঘাত বা ক্ষতি এড়িয়ে চলার ওপর নির্ভর করতে হয়। যারা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, তারাও বাস্তবতার কাছে নিয়ম মেনে ও অনুমানযোগ্যভাবে নতি স্বীকার করেন। দার্শনিক ডেভিড হিউম একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, বাস্তব পৃথিবীর অস্তিত্ব নিয়ে যদি আপনার সন্দেহ থাকে, তাহলে আপনি চাইলে দোতলার জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন।

কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য ভৌত বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া আর সামাজিক উদ্দেশ্যে বাস্তবতা সম্পর্কে একটি অভিন্ন ধারণার ভিত্তিতে সমন্বয় করা এক বিষয় নয়। আমরা যখন কথা বলি, তখন আমাদের শব্দ দিয়ে বাস্তবতার এমন সব সংস্করণ তৈরি হয়—তা সামাজিক হোক বা ভৌত—যেগুলির ভিত্তিতে আমরা একমত হয়ে কাজ করতে পারি। যেমন, আমরা যখন কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চাই, কাউকে প্রভাবিত করতে চাই, কারও সাহায্য পেতে চাই, কিংবা সম্মিলিতভাবে কোনো পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে বুঝতে চাই কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে এবং এখন কী করা উচিত, তখন এমন অভিন্ন ধারণার প্রয়োজন হয়। বাস্তবতা সম্পর্কে সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আমাদের এই ধারণাগুলির মাধ্যমেই সামাজিক সমন্বয় সম্ভব। আর কোনো একটি সময়ে আমরা সব সময় বাস্তবতার মাত্র একটি সংস্করণকে ভিত্তি করে সমন্বয় করি। শব্দের মাধ্যমে তৈরি করা সেই সংস্করণটিকেই আমরা তখন কাজের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করি।

Post View: 2

পোস্ট শেয়ার করুন:

Share on X (Twitter) Share on Facebook Share on Pinterest Share on LinkedIn Share on Email Share on WhatsApp
প্রবন্ধ ভাষা

Post navigation

Previous post
Next post

মন্তব্য করুন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Tags

খইট্টাল পাখি ভাষা মার্গারেট অ্যাটউড

সম্পাদক: ব্রাত্য রাইসু

©2026 সাহিত্য ডটকম | WordPress Theme by SuperbThemes

Terms and Conditions - Privacy Policy