Skip to content
সাহিত্য ডটকম সাহিত্য ডটকম

  • হোম
  • প্রবন্ধ
  • কবিতা
  • গল্প
  • আলাপ
  • প্রতিকৃতি
  • বই
  • বিবিধ
    • অ্যানেকডোট
  • ইতিহাস
  • দর্শন
সাহিত্য ডটকম
সাহিত্য ডটকম

জন কলিয়ারের গল্প: অ্যানাদার আমেরিকান ট্র্যাজেডি

Posted on October 6, 2026November 2, 2026 By সাহিত্য ডেস্ক

জন কলিয়ার নিষ্ঠুরতাকে রসিকতায় পাল্টে দিতে জানতেন। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এই মার্কিন গল্পকারের লেখা ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের দশক জুড়ে নিয়মিত ছাপা হয়েছে দ্য নিউ ইয়র্কারে। তার প্রায় প্রতিটি গল্পেই শেষে একটা মোচড় থাকে, যেখানে ঠাট্টা আর শিহরণ একসঙ্গে উপস্থিত হয়। ‘Another American Tragedy’ সেই ঘরানারই এক নিখুঁত নমুনা। নামটাই একটা ঠাট্টা। থিওডোর ড্রাইজারের মহাকায় উপন্যাস ‘An American Tragedy’-তে এক তরুণের সর্বনাশ ছিল সমাজ, শ্রেণি আর উচ্চাশার ভার টানা এক বিশাল বিয়োগান্ত ঘটনা। কলিয়ার সেই ভারি ট্র্যাজেডিকে টেনে নামিয়ে আনেন তার এই গল্পে, লোভের এক সস্তা প্রহসনে।

আরেকটি আমেরিকান ট্র্যাজেডি

জন কলিয়ার
দ্য নিউ ইয়র্কার, ১ জুন ১৯৪০


এক তরুণ একদিন এক নামকরা ডেন্টিস্টের চেম্বারে এসে চেয়ারে বসল। ডেন্টিস্ট হাসিমুখে ছোট্ট প্রোব আর আয়না হাতে এগিয়ে এলে সে অবজ্ঞাভরে সেগুলো সরিয়ে দিল। বলল, “সব দাঁত তুলে ফেলুন।”

“কিন্তু আপনার দাঁত তো একেবারে ভালো আছে,” ডেন্টিস্ট বললেন।

“তাতে কী?” তরুণ বলল, “আমার টাকাও তো ভালো আছে।”

ডেন্টিস্ট একটু ইতস্তত করলেন। বললেন, “খুব ভালো কোনো কারণ না থাকলে সুস্থ দাঁত তুলে ফেলা নৈতিক হবে না।”

‘নৈতিক’ শব্দটি শুনে তরুণের মুখে একটু হাসি ফুটেছিল। সে ভেস্টের পকেট থেকে এক বান্ডিল নোট বের করে এমনভাবে হাতে ধরল, যাতে ডেন্টিস্টের চোখে পড়ে।

ডেন্টিস্ট টাকাগুলোর দিকে একবারও তাকালেন না। বললেন, “আপনি যদি এই চমৎকার দাঁতগুলো তুলে ফেলতে চান, তাহলে নিশ্চয়ই আপনার মাথা খারাপ হয়েছে। অবশ্য দাঁতের গোলমাল থেকে অনেক সময় মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে…।”

“কথা বন্ধ করুন, দাঁত তুলুন,” তরুণ বলল।

ডেন্টিস্ট কাঁধ ঝাঁকিয়ে কাজে লেগে গেলেন। অপারেশনের শেষে তরুণটি যাতে পুরোপুরি সুস্থ মস্তিষ্কের হয়ে না যায়, সেই ভয়ে যেন তিনি মজা করেই নিজের ফোর্সেপের তেত্রিশতম টানে টাকার বান্ডিলটি তুলে নিলেন।

তরুণ কোনো মন্তব্য করল না। শুধু একটি আয়না চাইল। তাতে নিজের অবশ আর ভেঙে-পড়া গাল-মুখ দেখে সে বেশ সন্তুষ্ট বলেই মনে হলো। অস্থায়ী ডেনচার কবে তৈরি হবে, তা জেনে নিয়ে সে চলে গেল।

“হায় ঈশ্বর!” ডেন্টিস্ট মনে মনে বললেন, “লোকটা তো একেবারে পাগল!”

কিন্তু এখানে ডেন্টিস্ট একটি বড় ভুল করেছিলেন। তরুণটি মোটেও পাগল ছিল না। সে খুব ভালো করেই জানত, কী করতে যাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে লাগামহীন ভোগবিলাস আর নানারকম বদভ্যাসের পেছনে সে প্রায় সব টাকা উড়িয়ে ফেলেছিল। তবে আরও টাকা জোগাড় করার জন্য তার মাথায় ছিল একটি সুদূরপ্রসারী এবং নিখুঁত পরিকল্পনা।

নির্ধারিত দিনে সে আবার ডেন্টিস্টের কাছে ফিরে এল। এবার তার মুখে অস্থায়ী ডেনচার বসানো হলো। একেবারে সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে সেই দাঁত চুষল আর কড়মড় করে পিষল। প্রায় শেষ সম্বলটুকু দিয়ে ডেনচারের দাম মিটিয়ে সে বেরিয়ে এল। তারপর নিজের ঝকঝকে স্পোর্টস কারে উঠে এমনভাবে শহর ছেড়ে ছুটল, যেন কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানির লোক তার পিছু নিয়েছে। সত্যি বলতে, তারা তাকে দেখতে পেলে এমনটাই করত।

সে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাড়ি চালাল। পরদিন আবার যাত্রা শুরু করল। বিকেলের শেষ দিকে সে পৌঁছাল এমন এক অঞ্চলে, যেখানে বয়স্ক ও কৃপণ আঙ্কলরা সাধারণত নির্জন, জরাজীর্ণ গ্রাম্য বাড়িতে বাস করেন। আমাদের তরুণটির ভাগ্য ভালো ছিল। তার এমনই একজন আঙ্কল ছিলেন, যিনি বয়সে যেমন প্রবীণ, সম্পদেও তেমন ধনী। আর তাঁর বাড়িটি ছিল আশপাশের সব বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে নির্জন ও জীর্ণ।

সেই নির্জন বাড়িতে পৌঁছে তরুণ দরজায় কড়া নাড়ল। কিন্তু দরজা খুলল এক গোলগাল, চৌকো গড়নের স্বর্ণকেশী নারী। বয়স প্রায় তিরিশ, ওজন আনুমানিক দেড় শ পাউন্ড। তাঁর মুখ ছিল তরমুজের ফালির মতো চওড়া ও লাল। চোখের পাপড়ি ও ভ্রু গাঢ় করে আঁকা, আর মাথায় প্রচুর নকল সোনালি চুল। প্রথমে তরুণটি একটু ঘাবড়ে গেল। পরে বুঝতে পারল, মহিলাটি নার্সের পোশাক পরে আছেন। তবে তাঁর স্কার্ট ছিল বেশ ছোট। তাতে উজ্জ্বল লাল রঙের গার্টারও দেখা যাচ্ছিল। তরুণটি ভাবল, তার প্রিয় বৃদ্ধ আঙ্কল কি সত্যিই যথাযথ পেশাদার চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন?

যা-ই হোক, নার্সের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি ছিল। বিশেষ করে তিনি যেভাবে দরজার সামনে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাতে তাঁকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। তরুণটি টুপি খুলে এমন মাখো-মাখো হাসি দিল যে তার নকল দাঁতগুলো প্রায় মুখ থেকে খুলে পড়ার উপক্রম হলো।

“আমি বড় শহর থেকে এতটা পথ গাড়ি চালিয়ে এসেছি আমার অসুস্থ, বিছানায় পড়ে থাকা প্রিয় বৃদ্ধ আঙ্কলকে দেখতে। ঈশ্বর তাঁর মঙ্গল করুন! এত সুন্দর একজন নার্সকে দেখব, তা অবশ্য ভাবিনি।”

নার্স একটুও নড়লেন না। বরং সন্দেহ আর বিরক্তি নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

নেফিউ আবার বলল, “আমার আশঙ্কা, আঙ্কলের অবস্থা নিশ্চয়ই খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। আসলে একধরনের অন্তর্দৃষ্টি, যেন টেলিপ্যাথির মাধ্যমে পাঠানো বিপদসংকেত, আমাকে বলছিল যে দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এখানে ছুটে আসতে হবে। আমাকে তাঁর বিছানার কাছে যেতে দিন।”

নার্স অনিচ্ছার সঙ্গে একটু সরে দাঁড়ালেন। তরুণটি দ্রুত শোবার ঘরে ঢুকে পড়ল।

“প্রিয় আঙ্কল, আপনাকে আবার দেখতে পেয়ে কী যে ভালো লাগছে! কিন্তু আপনার হাত এত কাঁপছে কেন? চোখ এত বসে গেছে কেন? আপনি এত রোগা আর ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন কেন?”

আঙ্কল বললেন, “সেই কথা যদি ওঠে, তাহলে তুমিও তো খুব একটা মোটা-তাজা বা গোলাপি চেহারার নও। হ্যাঁ, তোমাকে বেশ ক্লান্ত আর শীর্ণ দেখাচ্ছে, মাই বয়। চুল পাতলা হয়ে গেছে, পেকেও গেছে। মুখজুড়ে কত দাগ, চোখের নিচে থলে, কত ভাঁজ! তোমার ওই সুন্দর সাদা দাঁতগুলো না থাকলে তোমাকেও আমার মতো বুড়ো দেখাত।”

নেফিউ বলল, “ওটা নিরন্তর পরিশ্রমের ফল। এই সময়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো খুব কঠিন, আঙ্কল। বিশেষ করে হাতে যদি কোনো পুঁজি না থাকে।”

“তাহলে তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছ?” বৃদ্ধ বললেন। “এখন আর মদ খাও না?”

“না, আঙ্কল। এখন আমি একেবারেই মদ খাই না,” নেফিউ উত্তর দিল।

“তাহলে তো মুশকিল,” আঙ্কল বললেন। বালিশের নিচ থেকে একটি বিশাল ফ্লাস্ক বের করে বললেন, “সে ক্ষেত্রে তোমাকে আমার সঙ্গে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে পারছি না।” এই বলে তিনি ফ্লাস্কে বিশাল এক ঢোঁক দিলেন, তারপর ঠোঁট মুছে বলে চললেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমার একজন ভালো ডাক্তার আছেন। পুরোনো দিনের আদর্শ গ্রাম্য ডাক্তার। সোজাসাপটা কথা বলেন, কোনো রাখঢাক নেই। তিনিই ওষুধ হিসেবে এটা খেতে বলেছেন।”

নেফিউ বলল, “সম্ভবত সে কারণেই আপনার হাত এত কাঁপছে।”

আঙ্কল বললেন, “তোমার নিজের হাতও তো খুব একটা স্থির নয়। মনে হচ্ছে, তুমি অতিরিক্ত পরিশ্রম করছ। বলো তো, তাসে কখনো একটু বাজি ধরো?”

“ঈশ্বর! না, আঙ্কল!” নেফিউ চিৎকার করে বলল। “অনেক আগেই ওই বোকামি থেকে নিজেকে মুক্ত করেছি।”

“শুনে খারাপ লাগল,” আঙ্কল বললেন। “তাহলে তো আমরা কয়েক হাত কাটথ্রোট খেলতে পারতাম। ডাক্তার বলেন, এই উত্তেজনা আমাকে চাঙা রাখে। আমরা প্রায়ই মধ্যরাতের পর পর্যন্ত খেলি।”

নেফিউ বলল, “সম্ভবত সে কারণেই আপনার চোখ এত গভীরে বসে গেছে।”

বৃদ্ধ বললেন, “তোমার চোখও তো একই রকম বসে গেছে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়া উচিত। আচ্ছা, প্রিয় নেফিউ, মেয়েদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে একটু ফুর্তি-তামাশা করো তো?”

“মেয়েদের সঙ্গে!” নেফিউ দুই হাত তুলে চিৎকার করে বলল। “এমন জঘন্য কথা আপনি কীভাবে ভাবলেন?”

“তাহলে তো মুশকিল,” আঙ্কল বললেন। “আমার ডাক্তারের চিন্তাভাবনা কিন্তু বেশ আধুনিক। বার্ডিকে তিনিই আমার কাছে পাঠিয়েছেন।”

এই বলে তিনি বালিশ ঠিক করতে থাকা নার্সের দিকে ঘুরে এমনভাবে আদর করলেন, যা বর্ণনা করার চেয়ে কল্পনা করাই ভালো।

নার্স ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে নেফিউ চিৎকার করে বলল, “এবার বুঝতে পারছি, আমার বেচারা আঙ্কল এত রোগা আর ফ্যাকাশে হয়ে গেছেন কেন!”

আঙ্কল উত্তর দিলেন, “তুমিও তো একই রকম। অথচ তোমার বয়স আমার অর্ধেক।”

নেফিউ এবার অন্য কৌশল অবলম্বন করল। বলল, “আচ্ছা, আপনার ডাক্তার হয়তো ঠিকই বলেছেন। হয়তো আমারও আপনার চিকিৎসাপদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।”

বৃদ্ধ বললেন, “আমি মনেপ্রাণে সেটাই পরামর্শ দেব।”

নেফিউ বলল, “সমস্যা হলো, এই চিকিৎসা নিতে গেলে তো আর একই সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হবে না। আপনি কি আমাকে কিছু টাকা দিতে রাজি হবেন? তাহলে আমিও এই চিকিৎসার সুবিধা উপভোগ করতে পারব।”

“না, তা আমি করব না,” আঙ্কল বললেন।

“আমি সেটাই ভেবেছিলাম,” নেফিউ বলল। “মনে হচ্ছে, আমাকে পরিশ্রম করেই যেতে হবে। তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আমার কৌতূহল মেটানোর জন্য সামান্য একটা বিষয় বলবেন? আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার কোনো আশা কি আমার আছে? আপনার উইলে কি আমার জন্য কিছু রেখেছেন?”

“আরে, এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ কেন?” আঙ্কল বললেন।

“বলুন না। আপনি জানেন না, এ বিষয়ে আমার কত আগ্রহ।”

“আচ্ছা, যদি সত্যিই জানতে চাও,” বৃদ্ধ বললেন, “আমি আমার সব সম্পত্তি ডাক্তারকে দিয়ে দিয়েছি। তিনি একেবারে সৎ, সরল, পুরোনো দিনের আদর্শ গ্রাম্য চিকিৎসক। তাঁর চিকিৎসাপদ্ধতি আমার যে কত ভালো লাগে, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।”

“সত্যিই?” নেফিউ বলল। “আমি অবশ্য এমন কিছুই আশঙ্কা করেছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে, ঠিক এমন পরিস্থিতির কথা ভেবেই আমি একটি পরিকল্পনা করে রেখেছি। একটু অনুমতি দিন, প্রিয় আঙ্কল।”

এই বলে সে বৃদ্ধের মাথার নিচ থেকে বালিশটি টেনে বের করে তাঁর মুখের ওপর চেপে ধরল। বৃদ্ধ বিরক্ত হয়ে দু-একবার পা ছুড়লেন। কিন্তু নানা কারণে তাঁর শরীরে তখন আর বিশেষ প্রাণশক্তি অবশিষ্ট ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যেই সেটুকুও নিভে গেল।

দরজার দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নেফিউ দ্রুত নিজের পোশাক খুলে বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখল। তারপর আঙ্কলের নাইটশার্টটি ধার করে পরল। এরপর আঙ্কলের মৃতদেহটিকেও বিছানার নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে তাঁর জায়গায় বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল। সবশেষে নিজের নকল দাঁত খুলে আগে থেকে এ কাজের জন্য সঙ্গে আনা পরিষ্কার রুমালে মুড়ে রাখল। তারপর বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। এখন তাকে দেখতে অবিকল বৃদ্ধ আঙ্কলের মতো লাগছিল।

কিছুক্ষণ পর সে গলা তুলে ডাকল, “বার্ডি! বার্ডি!”

ডাক শুনে নার্স দ্রুত ঘরে ছুটে এলেন। “আরে, হানি বয়! তোমার ওই অকর্মা নেফিউ কোথায় গেল?”

“একটু বেড়াতে বেরিয়েছে,” নেফিউ বৃদ্ধের মতো গলা করে বলল। “তাছাড়া, আমার মনে হয় না, তাকে অকর্মা বলা উচিত। না, ওই তরুণকে আমি ভুল বুঝেছিলাম। এখন আমি চাই, তুমি লইয়ারকে খবর দাও। আমি আমার উইলে তার প্রতি সুবিচার করতে চাই।”

“আরে, ড্যাডি!” নার্স চিৎকার করে উঠলেন। “হঠাৎ তোমার এমন পরিবর্তন হলো কেন?”

নেফিউ তাড়াতাড়ি বলল, “পরিবর্তন? আমার কোনো পরিবর্তন হয়নি, ডিয়ার। শুধু মনে হচ্ছে, আমার জীবনের শেষ সময়টা বোধহয় ঘনিয়ে এসেছে। তা ছাড়া আমি আগের মতোই আছি।”

এ কথা বিশ্বাস করানোর জন্য সে আঙ্কলের মতো করেই নার্সকে একটু আদর করল। নার্স চিৎকার করে হেসে উঠলেন। তারপর খুশিমনে লইয়ারকে খবর দিতে চলে গেলেন।

নেফিউ আরামে শুয়ে লইয়ারের আসার অপেক্ষা করতে লাগল।

সে মনে মনে ভাবল, “আমি নতুন উইল লিখিয়ে নেব। লইয়ারের সামনেই আঙ্কলের কাঁপা হাতের লেখার অনুকরণ করে তাতে সই করব। তারপর একটু ঘুমানোর জন্য একা থাকতে চাইব। এরপর বিছানায় আঙ্কলের মৃতদেহটি আবার তুলে রাখব, নিজের পোশাক পরব, দাঁত লাগাব এবং জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাব। তারপর এমন ভাব করব যেন একটু বেড়াতে গিয়েছিলাম, এখন সামনের দরজা দিয়ে ফিরে এসেছি। আর যখন আমরা আবিষ্কার করব যে বেচারা বৃদ্ধ শান্তিতে মারা গেছেন, তখন আমি কী পরিমাণ চোখের জল ফেলব!”

কিছুক্ষণ পর বারান্দায় ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। বিশালদেহী, রুক্ষ চেহারার এক লোক ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি বড় কালো ব্যাগ।

“আপনি এসেছেন, খুব ভালো হয়েছে,” আমাদের নায়ক বলল। “আমি একটি নতুন উইল তৈরি করতে চাই। আমার সব সম্পত্তি আমি আমার নেফিউকে দিয়ে যেতে চাই।”

আগন্তুক বললেন, “আমার প্রিয় বৃদ্ধ বন্ধু, আমার আশঙ্কা, আপনার অসুখ এবার মস্তিষ্কে পৌঁছে গেছে। আমাকে একটু পরীক্ষা করতে দিন।”

এই বলে তিনি বিছানার চাদর সরিয়ে নেফিউকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। তাঁর শক্ত, খসখসে আঙুল দিয়ে রোগীর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চাপ দিলেন। নেফিউ বুঝতে পারল, এ কোনো লইয়ার নন, স্বয়ং ডাক্তার। সে ভেতর থেকে একটি ফাঁপা গোঙানি ছাড়ল।

“আমি যা আশঙ্কা করেছিলাম, তা-ই,” ডাক্তার বললেন। “এখানে কোথাও একটা বড় সমস্যা আছে। আপনার মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।”

এই বলে তিনি নেফিউকে বিছানায় উল্টে দিলেন এবং কালো ব্যাগ থেকে একটি বিশাল হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ বের করলেন।

“সৌভাগ্যক্রমে, জরুরি পরিস্থিতির জন্য আমি সব সময় প্রস্তুত থাকি,” তিনি বললেন।

আমাদের নায়ক প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল। কিন্তু কী বলবে, তা বুঝে উঠতে পারল না। তার ভয় হচ্ছিল, আঙ্কলের মৃতদেহ বিছানার নিচে আবিষ্কৃত হলে পরিস্থিতি তার বিরুদ্ধে চলে যাবে। ডাক্তার তার পিঠের নিচের দিকে এক পাইন্ট বরফশীতল তরল ইনজেকশন দিয়ে দিলেন। এতে তার শরীরের মাঝের অংশ অবশ হয়ে গেল এবং চোখের মণি নাড়ানো ছাড়া প্রায় সব ক্ষমতাই লোপ পেল। ফলে সে অতিরিক্ত উৎসাহ নিয়ে শুধু চোখ দুটো ঘোরাতে লাগল।

ডাক্তার বললেন, “আমি হয়তো পুরোনো দিনের একজন সাধারণ, অমার্জিত গ্রাম্য ডাক্তার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলি। পেটের গোলমাল থেকেও অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। নার্স, আমার যন্ত্রপাতিগুলো বের করে দিন। আমার মনে হয়, আমরা খুব তাড়াতাড়ি সমস্যার উৎস খুঁজে পাব।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই হতভাগ্য নেফিউর শরীর তার নিজের চোখের সামনেই কেটে খুলে ফেলা হলো। সে তখনও চোখ ঘুরিয়ে চলেছে। ডাক্তার যেন একটি গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ খুলে জিনিসপত্র বের করার মতো করে তার শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বের করতে লাগলেন। কাজ করতে করতেই তিনি নানা কথা বলে চললেন।

“এটা নিন,” তিনি নার্সকে বললেন, “ওয়াশস্ট্যান্ডের ওপর রাখুন। এগুলো চেয়ারের ওপর রাখুন। কোনো কিছু যেন গুলিয়ে না যায়। তা হলে পরে আবার সব জায়গায় বসাতে গিয়ে আমাকে মহা ঝামেলায় পড়তে হবে। দুঃখের বিষয়, আমাদের রোগীর নেফিউটি যদি এখন ফিরে আসত! অপারেশনের আগে কোনো আত্মীয়ের সম্মতি নেওয়াই বেশি নৈতিক। আলোটা একটু কাছে ধরুন। আমি এখনো তার পাগলামির কারণ খুঁজে পাইনি। মোমবাতির মোম যেন গড়িয়ে না পড়ে। সেটা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। যাই হোক, লোকটা যে পাগল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নইলে কেউ নিজের সব সম্পত্তি ওই হতচ্ছাড়া নেফিউকে দিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে? প্রিয়তমা, লইয়ারকে বিরক্ত না করে আমাকে খবর দিয়েছ, খুব ভালো করেছ। এসব শেষ হলে আমরা দুজনে কোথাও একটু বেড়াতে যাব।”

এই কথা বলতে বলতে তিনি নার্সকে একটু আদর করলেন। ঠিক সেই একই ধরনের আদর, যা কিছুক্ষণ আগে আঙ্কল ও নেফিউ দুজনেই তাঁকে করেছিলেন।

এই দৃশ্য দেখে আমাদের নায়ক শুধু হতবাকই হলো না, ভীষণভাবে হতাশও হয়ে পড়ল। তার প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও একেবারে কমে গেল।

“এটা তো চরম অপেশাদার আচরণ,” সে মনে মনে ভাবল। “তার চেয়েও খারাপ ব্যাপার হলো, এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের একটা ভয়ংকর গন্ধ আছে।”

এই চিন্তাটিই ছিল তার চোখ ঘোরানোর শেষ কারণ। পরমুহূর্তেই তার জীবনাবসান ঘটল।

“হায়!” ডাক্তার বললেন, “আশঙ্কা করছি, রোগীকে বাঁচাতে পারলাম না। কখনো কখনো শহরের ডাক্তারদের বেশ ঈর্ষা হয়। তাদের কত সুন্দর সাজানো অপারেশন থিয়েটার! যাই হোক, আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। আর লোকটি তার উইলে আমার কথা মনে রেখেছে। প্রিয়তমা, এবার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আমাকে ফিরিয়ে দাও। আমি মোটামুটিভাবে সেগুলো আবার জায়গামতো বসিয়ে দিই। কারণ আমার ধারণা, নেফিউটি খুব শিগগিরই ফিরে আসবে। আর সে নিশ্চয়ই ঘরের মধ্যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকতে দেখতে চাইবে না।”

অনুবাদ. এআই; সম্পাদনা. সাহিত্য ডেস্ক

লেখক পরিচিতি

জন কলিয়ার (John Collier, ১৯০১-১৯৮০) ছিলেন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, কবি ও চিত্রনাট্যকার। ১৯০১ সালের ৩ মে ইংল্যান্ডের লন্ডনে তার জন্ম। তিনি মূলত অদ্ভুত, রহস্যময়, অতিপ্রাকৃত ও ব্যঙ্গাত্মক ছোটগল্পের জন্য পরিচিত। তার গল্পে দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত পরিস্থিতি হঠাৎ অস্বাভাবিক মোড় নেয়। মানুষের লোভ, স্বার্থপরতা, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক দুর্বলতা তার লেখার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডার্ক হিউমার, ফ্যান্টাসি এবং অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি তার গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ছোটগল্পে তীক্ষ্ণ, মোচড়-দেওয়া সমাপ্তির এই ঢঙে তার ওপর স্পষ্ট ছাপ রেখে গিয়েছিলেন সাকি (Saki)।

সাহিত্য সমালোচক ডেভিড ল্যাংফোর্ডের মতে, কলিয়ার বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন সাময়িকপত্রে প্রকাশিত তার পরিশীলিত, তীক্ষ্ণ এবং প্রায়ই তিক্ত রসিকতাপূর্ণ গল্পের জন্য। জন কলিয়ার এর সেরা গল্পগুলিতে কবিত্ব ও প্রকৃত বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। কোনো কোনো গল্পে থাকে চরম ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতার উপাদান, আবার যৌনতা নিয়ে তার রসিকতাও ছিল বেশ সাহসী ও পরিশীলিত। ল্যাংফোর্ড তার লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বলেছেন ‘smiling misanthropy’—অর্থাৎ হাস্যরসের আড়ালে মানুষের প্রতি একধরনের হতাশা, অবিশ্বাস ও বিরূপ মনোভাব। সাহিত্য সমালোচক ক্রিস্টোফার ফাউলার তার লেখার সরল অথচ তীক্ষ্ণ ভঙ্গির প্রশংসা করেছেন। তার মতে, এই ভঙ্গি কলিয়ারের গল্পগুলিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে জন ক্লুটের মতে, কলিয়ারের গল্পগুলি ছিল পরিশীলিত, কখনও কখনও কিছুটা কৃত্রিম সৌন্দর্যসর্বস্ব, এবং সাধারণত তীক্ষ্ণ ও চমকপ্রদ সমাপ্তিনির্ভর। তার অনেক গল্পেই ফ্যান্টাসির শক্তিশালী উপাদান রয়েছে। সাহিত্য সমালোচক ই. এফ. ব্লেইলার তাকে আধুনিক ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগর এবং ফ্যান্টাসিধর্মী ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কলিয়ারের প্রথম উপন্যাস ‘His Monkey Wife’ প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে। একজন মানুষের সঙ্গে একটি শিম্পাঞ্জির সম্পর্ক ও বিবাহের ধারণাকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাসটি তার ব্যঙ্গাত্মক লেখার পরিচয় দেয়। তার চেনা ঢঙের একেবারে বাইরের একটি বই ‘Tom’s A-Cold’ (১৯৩৩) — মহাবিপর্যয়ের পর বর্বরতায় ফিরে যাওয়া নব্বইয়ের দশকের এক ইংল্যান্ডের পটভূমিতে লেখা গুরুগম্ভীর এক কল্পকাহিনি, যেখানে কোনো চমক-মোচড় নেই; আছে ধ্বংস-পরবর্তী প্রকৃতির জীবন্ত, প্রায় ঘোর-লাগা বর্ণনা। তার সবচেয়ে পরিচিত ছোটগল্প সংকলন ‘Fancies and Goodnights’ প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। বইটি International Fantasy Award ও Edgar Award লাভ করে। তার আরেকটি পরিচিত সংকলন ‘The Devil and All’। তার পরিচিত গল্পের মধ্যে রয়েছে The Chaser, Evening Primrose এবং Bottle Party। ১৯৩৫ সালে তিনি হলিউডে চলে যান এবং পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের জন্য চিত্রনাট্য লেখেন। Alfred Hitchcock Presents ও The Twilight Zone-এর মত টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সঙ্গেও তার লেখালেখির সম্পর্ক ছিল। ১৯৮০ সালের ৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় তার মৃত্যু হয়। ইংরেজি সাহিত্যে জন কলিয়ার বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন এমন এক ধরনের ছোটগল্পের জন্য, যেখানে কল্পনা, ব্যঙ্গ, রহস্য, তীক্ষ্ণ রসবোধ এবং অপ্রত্যাশিত পরিণতি একসঙ্গে মিশে যায়।

Post View: 3

পোস্ট শেয়ার করুন:

Share on X (Twitter) Share on Facebook Share on Pinterest Share on LinkedIn Share on Email Share on WhatsApp
গল্প

Post navigation

Previous post

মন্তব্য করুন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Tags

খইট্টাল পাখি মার্গারেট অ্যাটউড

সম্পাদক: ব্রাত্য রাইসু

©2026 সাহিত্য ডটকম | WordPress Theme by SuperbThemes

Terms and Conditions - Privacy Policy