Skip to content
সাহিত্য ডটকম সাহিত্য ডটকম

  • হোম
  • বই
    • প্রথম অধ্যায়
    • বইমেলা
    • প্রকাশনা
  • কথাসাহিত্য
    • গল্প
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • নাটক
    • লেখালেখি
    • ভ্রমণ কাহিনী
    • কাল্পনিক চরিত্র
  • প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ
    • তত্ব
    • প্রবন্ধ
    • ঐতিহ্য
    • সংস্কৃতি
    • ইতিহাস
    • সমালোচনা
    • আত্মজীবনী
  • স্মৃতি
    • চিঠিপত্র
    • স্মৃতিকথা
    • স্মরণ
  • কথোপকথন
    • সাক্ষাৎকার
    • পডকাস্ট
    • বইয়ের আড্ডা
    • বিতর্ক
  • বিবিধ
    • অন্যান্য
    • অ্যানেকডোট
    • লেখক তালিকা
    • পুনর্মুদ্রণ
    • উল্লেখ
    • কোটেশন
    • ছবির গল্প
    • শব্দের গল্প
  • আর্টস
    • চলচ্চিত্র
    • চিত্রশিল্প
    • নৃত্য
    • সঙ্গীত
    • ফটোগ্রাফি
    • মঞ্চ
    • স্থাপত্য
    • এনিমেশন
    • ভিডিও গেমস
    • ডক্যুমেন্টারি
  • চিন্তা
0
সাহিত্য ডটকম
সাহিত্য ডটকম

কেন পৃথিবী আবার বইয়ের দোকানে ফিরছে?

Posted on July 28, 2026August 3, 2026 By সাহিত্য ডেস্ক

 

ডিজিটাল যুগে স্বাধীন বুকস্টোরের পুনর্জাগরণ

একটা ঘুরন্ত দোকান দিয়ে শুরু

২০২৫ সাল। যুক্তরাষ্ট্রে হার্টনেট (Hartnett) নামের এক নারী একটা মালবাহী ট্রেলার সাজিয়ে তার ভেতরে বইয়ের দোকান খুললেন — নাম ডাবল ডগ বুকশপ (Double Dog Bookshop)। সঙ্গী তাঁর দুটো কুকুর। চাকা লাগানো এই দোকান ঘুরে বেড়াত এলাকায় এলাকায়, পাঠকের দরজায় দরজায়। ব্যবসা এমন জমল যে অচিরেই শহরের কেন্দ্রে একটা স্থায়ী দোকানঘর নিতে হলো তাঁকে।

হার্টনেটের নিজের ভাষায়, তাঁর দোকানের অর্ধেকটা বই, বাকি অর্ধেকটা মানুষের সঙ্গ। ব্যাখ্যাটাও তিনি দিয়েছেন সোজাসাপ্টা — লোকে এখন স্ক্রিন, ভিডিও-মিটিং আর অ্যালগরিদমে (algorithm) হাঁপিয়ে উঠেছে; তারা আবার সামনাসামনি মানুষের ছোঁয়া খুঁজছে। একটা কুকুর-সমেত ঘুরন্ত বইয়ের দোকানের সাফল্যের পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে গোটা এক যুগের ক্লান্তি।

আর হার্টনেট একা নন। গত কয়েক বছরে এমন হাজারো দোকান গজিয়ে উঠেছে গোটা দেশে। যে ব্যবসাটাকে সবাই মৃত ঘোষণা করে দিয়েছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তনের গল্প।

সংখ্যাগুলো বিশ্বাস করা কঠিন

আমেরিকান বুকসেলার্স অ্যাসোসিয়েশন (American Booksellers Association, সংক্ষেপে ABA) স্বাধীন বইয়ের দোকানগুলোর সংগঠন। তাদের হিসাব বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ — এই পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন বইয়ের দোকানের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭০%। শুধু ২০২৫ সালেই খুলেছে ৬০৫টি নতুন দোকান, যার মধ্যে ৪২২টি ইট-কাঠের স্থায়ী দোকান — আগের বছরের চেয়ে যা ৩১% বেশি। সংগঠনের হিসাবে দোকানের সংখ্যা ২০২৪ সালের ৩,২৮১ থেকে বেড়ে ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩,৭৮৩-এ। গত ছয় বছরে সদস্যসংখ্যা বেড়েছে ১৫১%।

সংখ্যাটাকে অর্থপূর্ণ করতে একটু পেছনে তাকানো দরকার। ২০০৯ সালে স্বাধীন বইয়ের দোকানের সংখ্যা নেমে গিয়েছিল সর্বকালের তলানিতে। সেই তলানি থেকে আজ দোকানের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ — সংগঠনের ইতিহাসে যা নব্বইয়ের দশকের শেষের পর সর্বোচ্চ। ABA-র প্রধান নির্বাহী অ্যালিসন হিল (Allison Hill) মজা করে বলেন, চাকরির কথা শুনলে অচেনা লোকজন তাঁকে সমবেদনা জানায়, ভাবে এই ব্যবসা বুঝি মরে যাচ্ছে। বাস্তবটা ঠিক উল্টো।

এই নতুন দোকানগুলোর চেহারাও আগের মতো নয়। এদের অনেকগুলো পপ-আপ কিংবা হার্টনেটের মতো চাকা লাগানো ভ্রাম্যমাণ দোকান। মালিকানায় বৈচিত্র্যও বেড়েছে অনেক। আর বিক্রির বড় ইঞ্জিন এখন রোম্যান্স আর “রোম্যান্টাসি” (romantasy) — রোম্যান্স আর ফ্যান্টাসি মেশানো ঘরানা, তরুণ পাঠকের হাত ধরে যা রীতিমতো বাজার কাঁপাচ্ছে। বছরের একটা দিন — ইন্ডিপেনডেন্ট বুকস্টোর ডে (Independent Bookstore Day) — এখন প্রায় ১,৬০০ দোকানে উৎসবের চেহারা নেয়।

পতনের ইতিহাস

এই উত্থান বোঝার আগে পতনটা বোঝা দরকার। নব্বই আর দুই হাজারের দশক ছিল বিশাল চেইন-দোকানের যুগ। বর্ডার্স (Borders) আর বার্নস অ্যান্ড নোবেলের (Barnes & Noble) সুপারস্টোরগুলো একের পর এক পাড়ার ছোট দোকান গিলে খেল। বিশাল আয়তন, কম দাম, ঝকঝকে তাক — ছোট বিক্রেতার পক্ষে টেক্কা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। এরপর এল আরও বড় শিকারি — অ্যামাজন (Amazon)। সস্তা দাম আর দ্রুত ডেলিভারির টানে পাঠক সরে গেল অনলাইনে।

তারপর মজার এক পালাবদল। যে বর্ডার্স একদিন ছোট দোকান মেরেছিল, সেই বর্ডার্সই ২০১১ সালে দেউলিয়া হয়ে পুরোপুরি উঠে গেল — বন্ধ হলো তাদের প্রায় চারশো দোকান, চাকরি হারালেন প্রায় দশ হাজার কর্মী। বার্নস অ্যান্ড নোবেল ২০০৯-এর পর বন্ধ করল শত শত দোকান, একটানা লোকসান গুনতে থাকল, ২০১৮ নাগাদ পরপর সাত ত্রৈমাসিকে লাল কালি। বইয়ের দোকানের মৃত্যুসংবাদ তখন সবাই লিখে ফেলেছে। শোকগাথাটাই ছিল সময়ের চল।

অ্যামাজনের বিদ্রূপাত্মক পরিণতি

গল্পের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপটা অ্যামাজনকে ঘিরে। ১৯৯৫ সালে অনলাইনে বই বেচেই যাত্রা শুরু, আর সেই পথেই বহু দোকানকে পথে বসিয়েছিল যে কোম্পানি — সেই অ্যামাজন ২০১৫ সালে সিয়াটলে নিজেই খুলল প্রথম শারীরিক বইয়ের দোকান। কিন্তু গল্পটা সেখানে থামেনি। ২০২২ সালের মার্চে অ্যামাজন ঘোষণা করল, তারা তাদের সব শারীরিক বইয়ের দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে — চার-তারা আর পপ-আপ দোকান মিলিয়ে মোট ৬৮টি।

ব্যাপারটা এক লাইনে দাঁড়ায় এমন: প্রথমে অ্যামাজন বইয়ের দোকান মারল, তারপর নিজে দোকান খুলল, তারপর নিজের দোকানও বন্ধ করে দিল। যে কোম্পানি অ্যালগরিদম দিয়ে পুরো দুনিয়ার কেনাকাটা চালায়, সে-ই একটা বইয়ের দোকানকে আসল বইয়ের দোকান বানাতে পারল না। তার দোকান হয়ে রইল ছাদ-দেওয়া এক গুদাম, যেখানে আবিষ্কারের আনন্দ নেই।

তবু বই-বাজারে অ্যামাজনের পাল্লা এখনও দৈত্যের মতো ভারী। ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের প্রথম দশ মাসেই বই-বিভাগ থেকে অ্যামাজনের বিক্রি ছিল প্রায় ১,৬৯০ কোটি ডলার। এই দৈত্যের ছায়াতেই দাঁড়িয়ে ছোট দোকানগুলো উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছিল — বন্ধ নয়, খুলছিল একের পর এক নতুন দোকান। দ্বন্দ্বটা এমনকি পঞ্জিকাতেও উঠে এসেছে: ২০২৫ সালে অ্যামাজন তাদের বড় বই-সেলের তারিখ ফেলল ঠিক ইন্ডিপেনডেন্ট বুকস্টোর ডে-র সময়টাতেই।

অর্থনীতিবিদের চোখে: তিন ‘সি’

ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্পটা নিছক অনুভূতির নয়, গবেষণারও বিষয়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের (Harvard Business School) অধ্যাপক রায়ান র‍্যাফায়েলি (Ryan Raffaelli) বছরের পর বছর ঘেঁটে দেখেছেন, ২০১০ থেকে আজ পর্যন্ত স্বাধীন বইয়ের দোকান কীভাবে ফিরে এল। তাঁর মতে, এটা মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প, আর সেই লড়াইয়ের হাতিয়ার তিনটি — ইংরেজিতে যেগুলোকে বলা যায় তিন ‘সি’।

প্রথমটা কমিউনিটি (community), অর্থাৎ সম্প্রদায়। ছোট দোকান নিজেকে গড়ে তুলেছে পাড়ার একটা মিলনস্থল হিসেবে — শুধু বই বেচার জায়গা নয়। দ্বিতীয়টা কিউরেশন (curation), অর্থাৎ বাছাই। কোটি কোটি বইয়ের ভিড় থেকে একজন মানুষ যখন হাতে গোনা কয়েকটা বেছে তাকে তুলে রাখেন, সেই বাছাইয়েরই আলাদা মূল্য। তৃতীয়টা কনভিনিং (convening), অর্থাৎ মানুষকে একত্র করা — লেখক-আড্ডা, বইপাঠের আসর, বাচ্চাদের গল্পের সময়। এই তিনটে জিনিস অ্যামাজন কখনও দিতে পারেনি, কারণ এগুলো অ্যালগরিদমের কাজ নয়, মানুষের কাজ।

র‍্যাফায়েলির সঙ্গে সুর মিলিয়েই এক বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা করেন, কেন ক্রেতা অনলাইনের ছাড় ছেড়ে বেশি দাম দিয়েও পাড়ার দোকানে বই কেনেন — কারণ অনেকের কাছে সেই বাড়তি টাকাটা নিছক দাম নয়, নিজের এলাকার একটা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ।

স্ক্রিনের ক্লান্তি আর কাগজের ফেরা

দোকানে ফেরার পেছনে সবচেয়ে বড় স্রোতটা মনস্তাত্ত্বিক। সারাদিন ফোন, ল্যাপটপ আর বিজ্ঞাপনের ভিড় ঠেলে মানুষ এমন একটা জায়গা চায় যেখানে অ্যালগরিদম তাকে তাড়া করে না, যেখানে চোখ দুটো একটু জিরোয়।

সংখ্যাও সেটাই বলছে। পিউ রিসার্চের (Pew Research) জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫% প্রাপ্তবয়স্ক গত এক বছরে অন্তত একটা ছাপা বই পড়েছেন, আর মাত্র ৯% পড়েন শুধুই ডিজিটাল বই। বিশ্বজুড়ে ছাপা বই এখনও ই-বুকের (e-book) চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি বিক্রি হয়। যুক্তরাজ্যে ২০২৩ সালে ছাপা বইয়ের বিক্রি ছুঁয়েছে প্রায় ৬৬ কোটি ৯০ লক্ষ কপি।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার, এই কাগজ-প্রেমের নেতৃত্বে সবচেয়ে “অনলাইন” প্রজন্মটাই — জেন-জি (Gen Z)। যাদের সবাই ফোন-আসক্ত ভাবে, তারাই স্ক্রিন থেকে ছুটি খুঁজতে কাগজের বইয়ে ফিরছে। কারণ কয়েকটা — চোখের ক্লান্তি, কাগজের গন্ধ, তাক-ভরা বইয়ের নিজস্ব সৌন্দর্য, আর একটা বাস্তব হিসাবও: ছাপা বই হাতে থাকে, পরে বেচাও যায়, ডিজিটাল ফাইল তা নয়। পরামর্শক সংস্থা ম্যাককিনজি (McKinsey)-র হিসাবেও দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে বই-বিক্রি রীতিমতো ফুলেফেঁপে উঠেছে।

বুকটকের প্যারাডক্স

সবচেয়ে অদ্ভুত স্রোতটা এসেছে খোদ ইন্টারনেট থেকে। টিকটকে (TikTok) বই নিয়ে আলোচনার জগৎ “বুকটক” (BookTok) জন্ম নেয় ২০২০ সালের কাছাকাছি। এই হ্যাশট্যাগে জমেছে একশো বিলিয়নেরও বেশি ভিউ। এক তরুণ পাঠক আরেকজনকে কাঁদানো বইয়ের গল্প শোনায়, লুকিয়ে থাকা লেখককে টেনে আনে আলোয়, একটা ঘরোয়া বইয়ের তাক সাজানোকেও বানিয়ে ফেলে রোমাঞ্চ।

ফল হাতেনাতে। রোম্যান্স, ফ্যান্টাসি আর কিশোর-তরুণ সাহিত্য (young adult) হুড়মুড়িয়ে বিকোতে শুরু করল — গত কয়েক বছরে ছাপা বইয়ের সবচেয়ে দ্রুতবর্ধমান ঘরানা এটাই। বুকটক তারকা বানিয়ে দিয়েছে কোলিন হুভার (Colleen Hoover), টেইলর জেনকিন্স রিড (Taylor Jenkins Reid)-এর মতো লেখকদের। ফ্যান্টাসি লেখক সারা জে. মাস (Sarah J. Maas) ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসেই বেচেছেন ৪৮ লক্ষের বেশি ছাপা বই। এক জরিপ বলছে, বুকটকে কোনো বইয়ের সুপারিশ দেখার পর প্রায় অর্ধেক পাঠক সেটা কিনতে সোজা হাজির হয়েছেন শারীরিক দোকানে। বার্নস অ্যান্ড নোবেল পর্যন্ত তাদের দোকানে আলাদা “বুকটক” তাক সাজিয়েছে।

প্যারাডক্সটা এখানেই — একটা ভিডিও অ্যাপ মানুষকে ঠেলে দিল কাগজের বইয়ের দিকে, স্ক্রিন থেকে দোকানের তাকের দিকে। চক্রটা এমনকি আরও এক পাক ঘুরেছে: টিকটকের মালিক কোম্পানি বাইটড্যান্স (ByteDance) নিজেই এখন কাগজে বই ছাপতে শুরু করেছে।

এআই স্লপ, আর বিশ্বাসের নতুন দাম

এবার আসা যাক সেই স্রোতে, যেটা এই ফেরার গল্পটাকে সবচেয়ে জোরালো করে তুলছে।

২০২২ সালের শেষে চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) আসার পর থেকে অনলাইনে বইয়ের বাজারে নেমেছে এক অদ্ভুত বন্যা। অ্যামাজনের স্ব-প্রকাশনা মঞ্চ কিন্ডল ডিরেক্ট পাবলিশিং (Kindle Direct Publishing, সংক্ষেপে KDP)-তে ভেসে যাচ্ছে যন্ত্রে বানানো নিম্নমানের অগুনতি বই — যাকে ইংরেজিতে বলে “এআই স্লপ” (AI slop), যান্ত্রিক আবর্জনার স্তূপ। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির একটা দিনেই অ্যামাজনে চ্যাটজিপিটির লেখা প্রায় তিনশো বই তালিকাভুক্ত হয়। ঢল এত বেশি যে অ্যামাজনকে নিয়ম করতে হয় — একজন দিনে তিনটার বেশি বই আপলোড করতে পারবে না। ২০২৫ সালে অরিজিনালিটি-এআই (Originality.ai) নামের এক প্রতিষ্ঠানের নমুনা-পরীক্ষায় দেখা যায়, ভেষজ চিকিৎসার বইয়ের ৮২ শতাংশই সম্ভবত যন্ত্রে লেখা।

এই স্লপের নিজস্ব ছাঁচ আছে। বারবার ফিরে আসে “এলদোরিয়া রাজ্যের কেল আর এলারা” গোছের কল্পিত নাম, “ফিসফাস” আর “গুনগুন” জাতীয় গৎবাঁধা শব্দ। আরও একটা কৌশল হলো, কোনো আসল বই বাজারে আসার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তার নামে যন্ত্রে বানানো “সহায়ক পুস্তিকা” বা “সারসংক্ষেপ” হাজির করা — নিছক টাকা কামানোর ফাঁদ। অ্যামাজন লেখকদের এআই ব্যবহারের কথা জানাতে বলে ঠিকই, কিন্তু সেই তথ্য বইয়ের পাতায় ক্রেতার চোখে পড়ে না।

এর ভয়ংকর দিকটা টের পান লেখকরা নিজে। মার্কিন লেখক ম্যাট অরিন (Mat Auryn) তাঁর জনপ্রিয় বই “সাইকিক উইচ” (Psychic Witch, ২০২০) প্রকাশের পর অ্যামাজনেই একটা প্রায় হুবহু নকল বই খুঁজে পান — লেখকের নামটা পর্যন্ত ভুয়া, ইন্টারনেটে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। বইটা কিনে পাতা উল্টে অরিন থমকে যান — এ তো তাঁরই লেখা, সামান্য এদিক-ওদিক করা। এমন নকল একটা নয়, একাধিক। ধরা পড়ার পর নামানো হয়, আবার নাম বদলে ফিরে আসে।

এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে বদলে যাচ্ছে গোটা হিসাবটা। যেখানে যন্ত্র মুহূর্তে অসীম সংখ্যক ভুয়া, একঘেয়ে, বিশ্বাস-অযোগ্য বই বানাতে পারে, সেখানে একজন মানুষের মূল্য বেড়ে যায় — যে মানুষ বইটা সত্যিই পড়েছে, বেছেছে, আর নিজের তাকে তুলে রেখেছে। বইয়ের দোকান তখন আর নিছক দোকান নয়, আবর্জনার সমুদ্রে একটা নির্ভরযোগ্য দ্বীপ। হার্ভার্ডের সেই তিন ‘সি’-র মধ্যে বাছাই বা কিউরেশন হঠাৎ সবচেয়ে দামি হয়ে ওঠে। অ্যালগরিদম যা দিতে পারে না — একজন মানুষের রুচি, তার “এটা আপনার ভালো লাগবে” — সেটাই এখন সবচেয়ে দুর্লভ পণ্য।

জেন-জি সম্পর্কে একটা কথা বারবার ওঠে — এই প্রজন্ম নকল আর গছিয়ে দেওয়া জিনিস দুই চোখে দেখতে পারে না। যন্ত্রে বানানো বইয়ের ঢলে ক্লান্ত হয়ে তারা তাই ছুটছে ঠিক তার উল্টো জিনিসের দিকে — আসল, মানুষের হাতে বাছাই করা, ছুঁয়ে দেখা যায় এমন বইয়ের দিকে।

অ্যান্টি-অ্যামাজন: বুকশপ ডট ওআরজি

দোকানে ফেরার এই ঢেউয়ের সঙ্গে জন্ম নিয়েছে একটা অন্যরকম অনলাইন মডেলও। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্ডি হান্টার (Andy Hunter) চালু করেন বুকশপ ডট ওআরজি (Bookshop.org) — অ্যামাজনের একটা বিকল্প, যার লক্ষ্যই ছিল বই-সংস্কৃতিকে এক দৈত্যের কব্জা থেকে বাঁচানো। এটা একটা “বি-কর্প” (B-Corp), যেখানে মুনাফার আগে উদ্দেশ্য। এখানে অনলাইনে বই কিনলে ক্রেতা নিজের পছন্দের পাড়ার দোকানকে বেছে নিতে পারেন, আর মুনাফার ভাগ পৌঁছে যায় সেই স্বাধীন দোকানগুলোর হাতে।

শুরুতে অনেকে সন্দেহ করেছিল, ভেবেছিল এ-ও বুঝি আরেক প্রতিযোগী। কিন্তু মহামারির সময় যেসব ছোট দোকানের নিজস্ব অনলাইন ব্যবসা ছিল না, তাদের কাছে এটা হয়ে ওঠে বাঁচার দড়ি। ২০২৫ সালে বুকশপ ডট ওআরজি-র আয় প্রায় ৭ কোটি ডলার ছুঁয়েছে, আগের বছরের চেয়ে যা ৫৫% বেশি। চালুর পর থেকে এই মঞ্চ স্বাধীন দোকানগুলোর হাতে তুলে দিয়েছে ৪ কোটি ৬০ লক্ষ ডলারেরও বেশি; শুধু গত বছরেই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে ৯৫ লক্ষ ডলার। এখন এটি কাজ করছে প্রায় ২,৯০০ বিক্রেতার সঙ্গে — ABA-র সদস্যদের প্রায় ৯০ শতাংশ। ২০২৫ সালে অ্যামাজনের কিন্ডলকে (Kindle) টেক্কা দিতে তারা নিজেদের ই-বুক মঞ্চও খুলেছে।

সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখলে লড়াইটার চেহারা বোঝা যায় — একদিকে বছরে ১,৬৯০ কোটি ডলারের অ্যামাজন, অন্যদিকে পাঁচ বছরে সব মিলিয়ে সাড়ে চার কোটি ডলার তুলে দেওয়া বুকশপ। দৈত্যের সামনে বামন। তবু বামনটা টিকে আছে, বাড়ছে — কারণ তার পেছনে দাঁড়িয়ে একটা গোটা সম্প্রদায়।

বার্নস অ্যান্ড নোবেলের শিক্ষা

কর্পোরেট চেইনও এই পাঠ মুখস্থ করেছে। ২০১৯ সালে হেজ ফান্ড এলিয়ট (Elliott) বার্নস অ্যান্ড নোবেলকে প্রায় ৬৮ কোটি ৩০ লক্ষ ডলারে কিনে নিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানায় আনে, আর হাল ধরানো হয় জেমস ডন্টকে (James Daunt)। ডন্ট এমন একজন, যিনি নিজে ১৯৯০ সালে লন্ডনে একটা স্বাধীন বইয়ের দোকান খুলেছিলেন, আর পরে ধুঁকতে থাকা ব্রিটিশ চেইন ওয়াটারস্টোনসকে (Waterstones) বাঁচিয়ে তুলেছিলেন।

তাঁর ওষুধ সোজা — কেন্দ্রীয় দপ্তরের হুকুম কমিয়ে প্রতিটা দোকানের ভার তুলে দেওয়া স্থানীয় বিক্রেতাদের হাতে, যাতে প্রতিটা দোকান তার নিজের পাড়ার পাঠকের মতো করে সাজে। সেই তিন ‘সি’-রই আরেক রূপ। ডন্টের বিশ্লেষণটা তীক্ষ্ণ — শারীরিক বইয়ের দোকানের কোনো দোষ ছিল না, দোষ ছিল এই যে বার্নস অ্যান্ড নোবেল যথেষ্ট ভালো দোকান চালাচ্ছিল না।

ফল হাতেনাতে। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি খুলেছে ৫৭টি নতুন দোকান — ২০০৯ থেকে ২০১৯, এই গোটা দশকে তারা যত দোকান খুলেছিল তার চেয়েও বেশি। ২০২৫ আর ২০২৬ সালেও লক্ষ্য বছরে প্রায় ৬০টি করে। বইয়ের বিক্রি কোম্পানির মোট আয়ের প্রায় ৬০%, আর তা মহামারির আগের চেয়েও বেশি। এতটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে যে এখন শেয়ারবাজারে নাম লেখানোর (IPO) কথাও ভাবা হচ্ছে। ডন্টের একটা কথা এই গোটা পুনর্জাগরণের সারমর্ম — একই বই দোকান থেকে কিনে হাতে নিয়ে বেরোলে সেটা পড়ার আনন্দ বেশি হয়।

তাহলে পৃথিবী আবার বইয়ের দোকানে ফিরছে কেন?

উত্তরটা কয়েকটা সুতোয় গাঁথা, কিন্তু সব সুতো এক জায়গায় গিয়ে মেলে। বইয়ের দোকান ইন্টারনেটকে তার নিজের খেলায় হারিয়ে বাঁচেনি। বেঁচেছে ঠিক তার উল্টোটা হয়ে — ধীর, মানুষী, বাছাই-করা, ছোঁয়া-যায় আর পাড়া-জোড়া এক ঠাঁই হিসেবে। যত বেশি জীবন স্ক্রিনে ঢুকেছে, যত বেশি বাজার ভরেছে যন্ত্রে বানানো একঘেয়ে আবর্জনায়, তত বেশি দামি হয়ে উঠেছে এর ঠিক বিপরীত জিনিসটা — সম্প্রদায়, বাছাই, আর মানুষের সঙ্গ।

এই পুনর্জাগরণ তাই নিছক পুরনো দিনের জন্য মন-কেমন নয়। এআই স্লপের যুগে একজন মানুষের বাছাই, একটা কাগজের বই আর একটা পাড়ার দোকান — এগুলো এখন নস্টালজিয়া নয়, বরং সবচেয়ে দামি পণ্য। বাংলা ভাষার পাঠক এই টান আলাদা করে চেনেন। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গলি, ঢাকার একুশে বইমেলার ভিড়, পুরনো বইয়ের দোকানে ধুলো-ঝাড়া তাক থেকে অপ্রত্যাশিত একটা বই টেনে নেওয়ার সেই অদল-বদল-না-হওয়া আনন্দ — এসবের কোনো ডিজিটাল বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। প্রযুক্তি যত এগোক, এক তাক বই সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া সেই টান সহজে ফুরোয় না।

তথ্যসংগ্রহ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: সাহিত্য ডেস্ক

সংস্কৃতি বইবইয়ের দোকান

Post navigation

Previous post

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

উপন্যাস

লুসিয়াস আপুলিয়াস এর ‘মেটামরফোসিস’ অথবা ‘দ্য গোল্ডেন অ্যাস’

সম্পাদক: ব্রাত্য রাইসু

©2026 সাহিত্য ডটকম | WordPress Theme by SuperbThemes

Terms and Conditions - Privacy Policy