টোকিওর শিনজুকুতে আজও দাঁড়িয়ে আছে নয়তলা এক বিশাল ভবন। এর দুই তলা মাটির নিচে। ভেতরে শুধু বই নয়, আছে একটি পূর্ণাঙ্গ নাট্যশালাও। ১৯৬৪ সালে নির্মিত এই “শিনজুকু মেইন স্টোর” এখনও কিনোকুনিয়ার প্রধান ঠিকানা। ভবনটির নকশা করেছিলেন জাপানি মডার্নিস্ট স্থাপত্যের অন্যতম পথিকৃৎ কুনিও মায়েকাওয়া, যিনি তরুণ বয়সে প্যারিসে লে করবুজিয়ে-এর স্টুডিওতে কাজ করেছিলেন। ২০১৭ সালে টোকিও শহর ভবনটিকে ঐতিহাসিক স্থাপনার মর্যাদা দেয়।
কিন্তু একটি বইয়ের দোকানের ভেতরে থিয়েটার কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় আরও পেছনে। তখনও গল্পটা বইয়ের ছিল না। ছিল কয়লার।
কয়লার দোকান থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বুকস্টোর চেইন—মোইচি তানাবের স্বপ্ন, জাপানের সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং ঢাকায় কিনোকুনিয়ার নতুন অধ্যায়
বিংশ শতকের শুরুর দিকে টোকিওর ইয়োৎসুইয়া এলাকায় এক পরিবারের ব্যবসা ছিল কাঠ ও কয়লার। ১৯২৩ সালের ভয়াবহ গ্রেট কান্তো ভূমিকম্পে টোকিওর বিস্তীর্ণ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু শহরের পশ্চিম দিকের শিনজুকু তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এলাকাটি দ্রুত নতুন বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে শুরু করে। তখনই ওই পরিবার তাদের ব্যবসা নিয়ে শিনজুকুতে চলে আসে।
সেই পরিবারেরই সদস্য মোইচি তানাবে (Moichi Tanabe)। বইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ শুরু হয়েছিল ছোটবেলায়, বাবার হাত ধরে। বছর দশেক বয়সে একদিন বাবা তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন মারুজেন নামের একটি বইয়ের দোকানে। সেখানে সারি সারি বিদেশি বই দেখে ছেলেটি মুগ্ধ হয়ে যায়। ভাষা হয়ত সব বুঝত না, কিন্তু বইয়ের জগতের বিস্তার তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। সেদিনই তার মনে একটি স্বপ্ন জন্ম নেয়—একদিন নিজের একটা বইয়ের দোকান হবে।
কিন্তু সেই স্বপ্ন পরিবারের পরিকল্পনার সঙ্গে মেলেনি। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে পারিবারিক কয়লা-ব্যবসার দায়িত্ব নিক। তানাবে অন্য পথ বেছে নিলেন। প্রায় বাইশ বছর বয়সে, পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও, তিনি কয়লার দোকানকে বইয়ের দোকানে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯২৭ সালের ২২ জানুয়ারি খুলে যায় সেই ছোট্ট দোকান। এক অর্থে ঘটনাটা ছিল খানিকটা পরিহাসেরও—যে বাবা তাকে প্রথম বইয়ের জগতে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারই আপত্তি অতিক্রম করেই জন্ম নিল কিনোকুনিয়া।
দোকানটা ছিল খুবই সাধারণ। দুই তলার কাঠের ঘর। আয়তন মাত্র ১২৫ বর্গমিটার—আজকের হিসাবে বড়জোর একটি মাঝারি আকারের বাড়ির সমান। কর্মী পাঁচজন, তাদের একজন স্বয়ং তানাবে।
নামের ক্ষেত্রেও তিনি বেছে নিলেন এমন কিছু, যার মধ্যে ব্যক্তিগত ইতিহাস জড়িয়ে আছে। “কিনোকুনিয়া” নামটি এসেছে পুরোনো জাপানের কিই (Kii) প্রদেশের নাম থেকে। জাপানি ভাষায় কুনি (kuni) মানে দেশ বা প্রদেশ, আর ইয়া (ya) মানে দোকান বা ঘর। সব মিলিয়ে নামটির অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা “কিই প্রদেশের ঘর”।

এর পেছনে ছিল পারিবারিক স্মৃতি। তানাবের পূর্বপুরুষেরা একসময় কিই-তোকুগাওয়া পরিবারের অধীনে কর্মরত ছিলেন। কিই-তোকুগাওয়া পরিবার ছিল জাপানের শক্তিশালী তোকুগাওয়া বংশের অন্যতম প্রধান শাখা, আর “গোসানকে” নামে পরিচিত তিন শীর্ষ শাখার একটি। বর্তমান ওয়াকায়ামা অঞ্চলের কিই প্রদেশ ছিল তাদের শাসনাধীন, আর জাপানের ইতিহাসে এই পরিবার থেকেই দুজন শোগুন ক্ষমতায় এসেছিলেন। নতুন ব্যবসার নামের মধ্যে সেই উত্তরাধিকার, পারিবারিক স্মৃতি আর পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন তানাবে।
কিন্তু নামের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তার পরিকল্পনা। তিনি শুরু থেকেই বইয়ের দোকানকে শুধু ব্যবসা হিসাবে দেখেননি। দোকানের দ্বিতীয় তলায় বইয়ের তাক বসানোর বদলে তৈরি করলেন একটি আর্ট গ্যালারি। ১৯২৭ সালের জাপানে একটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত ছোট বইয়ের দোকানের জন্যে এটি ছিল অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
আসলে তানাবে কেবল ব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি লিখতেন, প্রবন্ধ রচনা করতেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন। সমকালীন অনেকের চোখে তিনি ছিলেন একজন বুনকাজিন—অর্থাৎ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বইয়ের দোকান খোলার পরের বছরই তিনি তার স্কুলজীবনের বন্ধু, পরে খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠা সেইইচি ফুনাহাশি (Seiichi Funahashi)-কে নিয়ে বুঙ্গেই তোশি (“সাহিত্যনগরী”) নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। পরে আরও সাহিত্য ও শিল্পবিষয়ক সাময়িকী প্রকাশে যুক্ত হন।
ফলে কিনোকুনিয়ার দ্বিতীয় তলার গ্যালারি নিছক প্রদর্শনীর জায়গা ছিল না। শুরু থেকেই এটি লেখক, শিল্পী, সম্পাদক, প্রকাশক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের মিলনস্থলে পরিণত হতে থাকে। তানাবের পরিচিতির পরিসরে ছিলেন সাহিত্য ও নাট্যজগতের বহু মানুষ। বই বিক্রি, শিল্পপ্রদর্শনী, সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ—এসবকে তিনি আলাদা আলাদা কাজ হিসেবে দেখতেন না; সবকিছুকেই তিনি একই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অংশ বলে মনে করতেন।
তখন হয়ত এটিকে শৌখিন উদ্যোগ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, কিনোকুনিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই লুকিয়ে ছিল এই সিদ্ধান্তের মধ্যে। দ্বিতীয় তলার সেই ছোট্ট গ্যালারির ধারণাই পরে বড় হতে হতে ১৯৬৪ সালে রূপ নেয় শিনজুকু হল (Shinjuku Hall) থিয়েটারে। আরও পরে শিনজুকুর নতুন ভবনের নবম তলায় তানাবে যে সাহিত্যিক সালোঁ গড়ে তোলেন, সেটি জাপানি সাহিত্যজগতে বুন্দান নো শাকোবাজো—অর্থাৎ “সাহিত্যিক সমাজের আড্ডাকেন্দ্র”—হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এক অর্থে, সেই ইতিহাসের বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯২৭ সালের ওই ছোট্ট কাঠের দোকানেই।
এই সাংস্কৃতিক টানটা কেবল কাগজে-কলমে ছিল না। ষাটের দশকে শিনজুকু ছিল জাপানের আন্ডারগ্রাউন্ড শিল্পচর্চা ও পরীক্ষামূলক নাটকের অন্যতম কেন্দ্র, আর কিনোকুনিয়া ছিল সেই পরিবেশের সক্রিয় অংশ।
জাপানি নিউ ওয়েভ সিনেমার কিংবদন্তি পরিচালক নাগিসা ওশিমা (Nagisa Oshima) তার ১৯৬৯ সালের চলচ্চিত্র Diary of a Shinjuku Thief (শিনজুকু চোরের ডায়েরি)-র কিছু দৃশ্য ধারণ করেন এই শিনজুকু দোকানেই। আরও মজার বিষয় হল, ছবিতে দোকানের কর্তার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং মোইচি তানাবে। তিনি কোনো পেশাদার অভিনেতা ছিলেন না; ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন নিজেরই জগতে, নিজেরই পরিচয়ে।
আগুন, পুনর্জন্ম আর প্রতিষ্ঠানের রূপ
১৯৪৫ সালের মে মাসে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, বিমান হামলায় শিনজুকুর সেই কাঠের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রায় দুই দশক ধরে যে দোকানটি ধীরে ধীরে শিনজুকুর সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে উঠছিল, মুহূর্তের মধ্যে তার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত টোকিওর মতই কিনোকুনিয়ার প্রথম ঠিকানাটিও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
এই আঘাতের পর একসময় মোইচি তানাবে ব্যবসা গুটিয়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। পরে তাকে নতুন করে শুরু করার সাহস জোগান তার শোগি (জাপানি দাবা) সঙ্গী এবং প্রকাশক গেনইয়োশি কাদোকাওয়া (Genyoshi Kadokawa)। পরবর্তী সময়ে জাপানের অন্যতম বৃহৎ প্রকাশনা-গোষ্ঠীতে পরিণত হওয়া কাদোকাওয়ার প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন তিনি। বন্ধু ও সহযাত্রীদের সেই উৎসাহে তানাবে আবার কাজে ফেরেন।
ফলে গল্পটা সেখানে থেমে থাকেনি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই, একই বছরের ডিসেম্বরে, দোকান আবার খুলে বসে। তখন জাপানে কাগজ, নির্মাণসামগ্রী, এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রেরও তীব্র সংকট। বহু প্রকাশক, বইবিক্রেতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। সেই সময়ে একটি বইয়ের দোকান পুনরায় চালু করা নিছক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার এক ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
১৯৪৬ সালে কিনোকুনিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিতে পরিণত হয়। ১৯৪৯ সালে তারা ইংরেজি বই আমদানি শুরু করে। সময়টা বেছে নেওয়াও ছিল ইঙ্গিতপূর্ণ। যুদ্ধের পর মার্কিন দখলদারিত্বের সময় জাপানে পশ্চিমা জ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ দ্রুত বাড়ছিল। যুদ্ধের আগে ও পরে বহু বছর আন্তর্জাতিক বইবাণিজ্য কার্যত ভেঙে পড়েছিল। ফলে বিদেশি বই, জার্নাল ও একাডেমিক প্রকাশনা দেশে পৌঁছে দেওয়া নিজেই একটি বিশেষায়িত ব্যবসায় পরিণত হয়। কিনোকুনিয়া খুব দ্রুত বুঝতে পারে, পুনর্গঠিত জাপানের জন্য বই কেবল একটি পণ্য নয়; এটি বিশ্বের সঙ্গে পুনঃসংযোগেরও একটি মাধ্যম।
এরপর ১৯৫৬ সালে ওসাকায় প্রথম বিক্রয় কার্যালয় খোলে। বাইরে থেকে ঘটনাটি সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এখান থেকেই প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। কিনোকুনিয়া শুধু পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া নয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং গ্রন্থাগারের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে হাঁটে।
সময়টাও ছিল উপযুক্ত। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে জাপানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন গবেষণাগার এবং নতুন গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থী ও গবেষকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে বিদেশি বই, বৈজ্ঞানিক সাময়িকী, গবেষণা-তথ্য এবং গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার চাহিদাও। ধীরে ধীরে কিনোকুনিয়া সেই অবকাঠামোরই একটি অংশে পরিণত হয়।
এই অংশটাই আজ কিনোকুনিয়ার অন্যতম বড় শক্তি, যদিও সাধারণ ক্রেতারা সেটা খুব একটা দেখেন না। দোকানের তাকের পেছনে আছে বিশাল এক বি-টু-বি (B2B) নেটওয়ার্ক। হোক্কাইদো থেকে ওকিনাওয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ২৮টি প্রাতিষ্ঠানিক বিক্রয় কার্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলিকে বই, ডিজিটাল উপকরণ, গবেষণা-ব্যবস্থা ও লাইব্রেরি পরিচালনার সেবা দেয়।
কিনোকুনিয়া বহু বছর ধরে ProQuest (প্রোকোয়েস্ট)-এর অংশীদার। তারা Ex Libris (এক্স লিব্রিস)-এর CampusM অ্যাপের জাপান-প্রতিনিধিও। জাপানের ১,৩০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত NACSIS-CAT/ILL একাডেমিক ক্যাটালগ ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ তৈরির কাজেও তারা যুক্ত ছিল। ২০২১ সালে প্রকল্পটির দায়িত্ব নিয়ে ২০২৩ সালের শুরুতে সেটি চালু হয়। JapanKnowledge নামের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের একচেটিয়া পরিবেশকও তারা। অভিধান, বিশ্বকোষ, ঐতিহাসিক দলিল ও রেফারেন্স গ্রন্থসমৃদ্ধ এই প্ল্যাটফর্ম প্রতিদিন ব্যবহার করেন অসংখ্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষক।
ফলে কিনোকুনিয়া আসলে শুধু বই বিক্রি করে না। তাদের কাজের তালিকায় আছে জাপানি ও বিদেশি বই, সাময়িকী, ম্যাগাজিন, ডিজিটাল কনটেন্ট, অডিও-ভিজ্যুয়াল সামগ্রী, স্টেশনারি, লাইব্রেরি সিস্টেম, শিক্ষা-সরঞ্জাম, তথ্যসেবা, প্রকাশনা, ডেটাবেস, এমনকি থিয়েটার আর আর্ট গ্যালারি পরিচালনাও।
আজকের দোকানগুলিতে আবার যুক্ত হয়েছে জাপানি স্টেশনারির আলাদা এক দুনিয়া। Hobonichi (হোবোনিচি) প্ল্যানার, Midori (মিদোরি) নোটবুক, ওয়াশি (washi) টেপ, আর মাঙ্গা-অ্যানিমের বিরল সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী। জাপানে ভাল মানের নোটবুক, পরিকল্পনাপঞ্জি (planner) বা কলম অনেকের কাছে কেবল অফিসসামগ্রী নয়; এগুলি ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও সৃজনশীলতার অংশও বটে। সেই সংস্কৃতির জনপ্রিয় অনেক ব্র্যান্ডের দেখা মেলে কিনোকুনিয়ার তাকজুড়ে। অনেক তরুণের কাছে কিনোকুনিয়া এখন শুধু বইয়ের দোকান নয়, জাপানি পপ সংস্কৃতির প্রবেশদ্বার।
এই বিস্তারের আকারও ছোট নয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিটির ২০২৩ অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল প্রায় ১৩০.৬ বিলিয়ন ইয়েন। কর্মীসংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। জাপানে এটিই সবচেয়ে বড় বুকস্টোর চেইন। শুরুর সেই পাঁচজন কর্মীর ১২৫ বর্গমিটারের দোকান থেকে এই দূরত্বটা একবার মেপে দেখলেই বোঝা যায়, একশ বছরে কতটা পথ পেরিয়েছে কিনোকুনিয়া।
কিন্তু সংখ্যাগুলি পুরো গল্প বলে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার পরিবর্তন। ১৯২৭ সালে কিনোকুনিয়া ছিল শিনজুকুর একটি ছোট বইয়ের দোকান; আজ এটি জাপানের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একসময় যে প্রতিষ্ঠান লেখক ও শিল্পীদের আড্ডার জায়গা তৈরি করেছিল, পরে সেটিই গবেষক ও শিক্ষার্থীদের তথ্য-অবকাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।
আর এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে কিনোকুনিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা। খুচরা বই বিক্রি এখনও তাদের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হলেও বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরি ও সরকারি সংস্থার জন্য বই, ডেটাবেস এবং তথ্যসেবা সরবরাহ প্রতিষ্ঠানটিকে আয়ের একটি স্থিতিশীল উৎস দিয়েছে। বইয়ের খুচরা বাজারে পরিবর্তন এলেও এই অংশটি তুলনামূলকভাবে কম অস্থির। ফলে কিনোকুনিয়া শুধু একটি বুকস্টোর চেইন নয়; জ্ঞান ও তথ্যসেবা খাতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
হয়ত এ কারণেই পৃথিবীর নানা দেশে স্বাধীন বইয়ের দোকান ও বড় বড় বই-বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান একের পর এক সংকটে পড়লেও কিনোকুনিয়া এখনও প্রসারিত হচ্ছে। বাইরে থেকে এটি একটি বুকস্টোর চেইন, ভেতরে ভেতরে এটি জাপানের শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান।
সমুদ্র পেরিয়ে: এক সাংস্কৃতিক রপ্তানি
জাপানের বাইরে কিনোকুনিয়ার প্রথম শাখা খোলে ১৯৬৯ সালে, সান ফ্রান্সিসকোতে। লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার। বিদেশে থাকা জাপানিদের হাতে দ্রুত বই, ম্যাগাজিন আর দেশের খবর পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষকেও জাপানি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সান ফ্রান্সিসকো বেছে নেওয়াও কাকতালীয় ছিল না। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বড় জাপানি অভিবাসী সম্প্রদায়ের কেন্দ্র। ফলে জাপানি ভাষার বই ও সাময়িকীর জন্য সেখানে একটি স্বাভাবিক পাঠকগোষ্ঠী আগে থেকেই ছিল।
প্রথমে লক্ষ্য ছিল মূলত প্রবাসী জাপানিদের সেবা দেওয়া। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বিদেশে জাপানি বইয়ের বাজার শুধু জাপানিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাপানি সাহিত্য, শিল্প, ভাষা এবং পরে মাঙ্গা ও পপ সংস্কৃতির প্রতিও আন্তর্জাতিক আগ্রহ বাড়ছিল। কিনোকুনিয়া সেই পরিবর্তনকে খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল।
এশিয়ায় তাদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে, সিঙ্গাপুরে। প্রথম দোকান খোলা হয় লিয়াং কোর্ট-এ। জায়গাটা বেছে নেওয়ার কারণও ছিল কৌশলী: সেখানে আগে থেকেই জাপানি প্রবাসীদের যাতায়াত ছিল বেশি। সিঙ্গাপুর শাখা প্রথমে জাপানি সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও, পরবর্তী সময়ে সেটিই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কিনোকুনিয়ার সম্প্রসারণের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কিন্তু আসল পরীক্ষা আসে ১৯৯৭ সালের পরে। তখন মার্কিন বইয়ের জায়ান্ট বর্ডার্স সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করে। অনেক প্রতিষ্ঠান হয়ত প্রতিদ্বন্দ্বীর মডেল নকল করার চেষ্টা করত। কিনোকুনিয়া সেটা করেনি। বরং তারা নিজেদের শক্তিটাকেই আরও বড় করে তুলে ধরল। ডিসকাউন্ট বা বিপণনের লড়াইয়ে নামার বদলে তারা জোর দিল সংগ্রহের গভীরতা, বহুভাষিকতা এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ওপর।
অরচার্ড রোডের নিই অ্যান সিটিতে তারা খুলল ৪২ হাজার বর্গফুটের বিশাল এক ফ্ল্যাগশিপ স্টোর। একসময় এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম বইয়ের দোকানগুলির একটি হিসাবে বিবেচিত হত। এখানেই তৈরি হয় সেই “কিনোকুনিয়া মডেল” যেটা পরে কুয়ালালামপুর, সিডনি, জাকার্তা, ব্যাংকক, দুবাই আর নিউইয়র্কের বড় শাখাগুলির নকশার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। জাপানি, ইংরেজি, চীনা এবং অন্যান্য ভাষার বই, বিস্তৃত ম্যাগাজিন বিভাগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরে দেখার মত পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি বইয়ের দোকান নয়, একটি সাংস্কৃতিক গন্তব্যে পরিণত হয়।
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, এই কৌশলই বেশি টেকসই ছিল। একসময়ের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বর্ডার্স পরে বৈশ্বিকভাবে দেউলিয়া হয়ে বাজার থেকে বিদায় নেয়। কিনোকুনিয়া অবশ্য নিজের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখে এবং ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়।
দুবাইয়ের দোকান খোলে ২০০৮ সালে। ৩,৩০০ বর্গমিটারের এই শাখা একসময় পুরো চেইনের বিক্রির দিক থেকে চতুর্থ স্থানে উঠে আসে: শিনজুকু, ওসাকার উমেদা আর সিঙ্গাপুরের পরেই। মধ্যপ্রাচ্যের বহুজাতিক জনসংখ্যার কারণে দোকানটির সংগ্রহও শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চরিত্র পায়। এরপর ২০২০ সালে আবুধাবিতে খোলে তাদের ৩৩তম বিদেশি শাখা।
সিঙ্গাপুরকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে পুরো এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে কিনোকুনিয়া। যুক্ত হয় তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া আর থাইল্যান্ড।
এই দোকানগুলির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল বহুভাষিক সংগ্রহ। একই ছাদের নিচে নানা ভাষার বই। দুবাইয়ের শাখায় একসময় ছিল পাঁচ লক্ষের বেশি বই আর হাজারের বেশি ম্যাগাজিন। সেখানে ইংরেজি, আরবি, জাপানি, ফরাসি, জার্মান আর চীনা ভাষার সংগ্রহ একসঙ্গে সাজানো থাকত। ফলে দোকানটি শুধু জাপানি পাঠকদের নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের পাঠকদেরও আকর্ষণ করত।
তবে কিনোকুনিয়া শুধু বই বিক্রির দোকান হয়ে থাকতে চায়নি। তাদের অনেক শাখাই নিয়মিত আয়োজন করে বই প্রকাশ অনুষ্ঠান, কমিক আর্ট প্রদর্শনী, ভাষা শেখার কর্মশালা, কসপ্লে ইভেন্ট কিংবা জনপ্রিয় চরিত্রের মাসকটের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ।
শিনজুকুর দ্বিতীয় তলার ছোট্ট আর্ট গ্যালারিতে যে ধারণার জন্ম হয়েছিল, আন্তর্জাতিক শাখাগুলি মূলত সেই ধারণারই সম্প্রসারণ। বিদেশে শাখা খোলার সময় কিনোকুনিয়া শুধু জাপানি বই রপ্তানি করেনি; সঙ্গে নিয়ে গেছে একটি সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিও। বইয়ের দোকানকে মিলনস্থল, প্রদর্শনীর স্থান, আলোচনা-আয়োজনের কেন্দ্র এবং সম্প্রদায় গঠনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার যে ভাবনা মোইচি তানাবে ১৯২০-এর দশকে গড়ে তুলেছিলেন, আন্তর্জাতিক শাখাগুলিও অনেকাংশে সেই ঐতিহ্য বহন করে।
প্রতিষ্ঠাতা তানাবে অবশ্য এই বিশ্ব-বিস্তারের পুরোটা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৮০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের হাল তুলে দেন ছেলে রেইচি তানাবের (Reiichi Tanabe) হাতে, আর দৈনন্দিন পরিচালনার ভার যায় পেশাদার নির্বাহীদের কাছে। এর পরের বছর, ১৯৮১ সালের অক্টোবরে, ফরাসি সাহিত্য জাপানে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অবদানে ফরাসি সরকার তাকে দেয় শিল্প-সাহিত্য পদকের নাইট খেতাব (Chevalier des Arts et des Lettres)। এটি ফ্রান্সের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্মাননা।
জীবনের শেষদিকে তিনি অন্তত দেখে যেতে পেরেছিলেন যে শিনজুকুর ছোট্ট দোকানটি ইতোমধ্যেই জাপানের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেই সম্মান উপভোগের সময় বেশি জোটেনি; মাত্র দুই মাস পরে, ৭৬ বছর বয়সে, ক্যান্সারে চলে যান তিনি।
ততদিনে তার সেই পাঁচজন কর্মীর ছোট্ট দোকান জাপানজুড়ে ২৭টি আর ক্যালিফোর্নিয়ায় ৩টি শাখায় দাঁড়িয়েছে, নিউইয়র্কে খুলছে আরেকটি।
এরপরের আন্তর্জাতিক বিস্তারের পেছনে দুজন মানুষের নাম বিশেষভাবে জড়িত, আর তাদের ভূমিকা দুই রকম। ওসামু মাৎসুবারা (Osamu Matsubara) ১৯৮০ থেকে ২০০২ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার সময়েই কিনোকুনিয়া বিদেশে দ্রুত ডালপালা মেলে। পরে নিউইয়র্কের দোকানও রকফেলার সেন্টার থেকে সরিয়ে ব্রায়ান্ট পার্ক-এর উল্টাদিকে তিনতলা নতুন ভবনে নেওয়া হয়।

মাৎসুবারা যদি হন বিস্তারের স্থপতি, তবে বর্তমান চেয়ারম্যান মাসাশি তাকাই (Masashi Takai) হলেন কঠিন সময়ের কাণ্ডারি। ই-কমার্সের ধাক্কায় গোটা দুনিয়ার বইয়ের দোকান যখন কাঁপছে, তখন মাসাশি তাকাই এর নেতৃত্বেই কিনোকুনিয়া এশিয়ার নতুন নতুন শহরে ঢুকেছে: নমপেন থেকে শুরু করে আবুধাবি পর্যন্ত। মন্দার মুখে গুটিয়ে না গিয়ে বরং বেছে বেছে এগোনো, এটাই তার আমলের সুর।
মাসাশি তাকাই, কিনোকুনিয়ার চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট। তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহ্যবাহী বই-বাণিজ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল সেবায় আরও জোর দেয়।
এই সম্প্রসারণের মধ্যে স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার চেষ্টাও ছিল স্পষ্ট। যেমন ২০১৮ সালে নমপেনে কম্বোডিয়ার প্রথম শাখা খোলার সময় কিনোকুনিয়া বিশেষ গুরুত্ব দেয় তরুণ ক্রেতাদের ওপর। দেশটির গড় বয়স তখন মাত্র ২৪। তাই সেখানে বইয়ের পাশাপাশি স্টেশনারি আর দৈনন্দিন পণ্যের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। তখন প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য ছিল, তারা এমন এক দোকান তৈরি করতে চায় যেখানে মানুষ প্রতিদিন গেলেও বিরক্ত হবে না। বিদেশের এই শাখাগুলি শুধু বিক্রয়কেন্দ্র নয়, সাংস্কৃতিক সেতুও। জাপানি প্রকাশনা শিল্প আর বিশ্বের পাঠকদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এগুলি।
২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরে ৩০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিল কোদানশা, শোগাকুকান আর তোহান-এর মত বড় জাপানি প্রকাশনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় লেখক-কবি ও শিল্পীরাও। এই নেটওয়ার্কের কারণেই কিনোকুনিয়া খুব দ্রুত জাপানি বই, মাঙ্গা আর সাংস্কৃতিক কনটেন্ট বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় সাহিত্যিক সমাজকেও জাপানের সঙ্গে যুক্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রে কিনোকুনিয়ার উপস্থিতি ইতোমধ্যে অর্ধশতাব্দী পেরিয়েছে। নিউইয়র্কের ব্রায়ান্ট পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের বিশাল দোকানটি আজও শহরের বইপ্রেমীদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। বহু জাপানি প্রবাসী ও জাপানপ্রেমী পাঠকের কাছে এটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বই, সাময়িকী এবং সাংস্কৃতিক পণ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস।
টিকে থাকার লড়াই
কিনোকুনিয়ার গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়। সময়ের সঙ্গে তাদেরও বদলাতে হয়েছে, লড়তে হয়েছে।
ই-বুক, অনলাইন বিক্রি আর ই-কমার্সের চাপে সারা পৃথিবীতেই ভৌত বইয়ের দোকান কঠিন সময় পার করছে। মানুষ আগের মত শুধু দোকানে গিয়ে বই কেনে না। কয়েক ক্লিকেই বই ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধাক্কা কিনোকুনিয়াও অনুভব করেছে।
আর এই ধাক্কাটা সবচেয়ে স্পষ্ট তাদের নিজের ঘরেই। ২০২৬ সালের মার্চের শেষে জাপানে বইয়ের দোকানের সংখ্যা নেমে এসেছে ৯,৯৯৩-এ। ১৯৯৪ সালে এই হিসাব রাখা শুরুর পর এই প্রথম সংখ্যাটা দশ হাজারের নিচে। গত অর্থবছরে গোটা দেশে নতুন দোকান খুলেছে মোটে ১০২টা, বিপরীতে বন্ধ হয়েছে ৪৯৯টা। ১৯৯৮ সালের তুঙ্গে যেখানে দোকান ছিল ২৪ হাজারের বেশি, আজ টিকে আছে তার ৪০ শতাংশের সামান্য বেশি।
অর্থাৎ যে দেশের মাটিতে কিনোকুনিয়ার জন্ম, সেখানেই ছাপা বইয়ের দোকান দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে। জাপানের বহু শহর ও মফস্বলে এখন এমন প্রজন্ম বড় হচ্ছে, যাদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো স্থানীয় বইয়ের দোকানই নেই। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়েই কিনোকুনিয়ার টিকে থাকার কৌশলটা আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
২০২২ সালে সিঙ্গাপুরের Jem (জেম) মল শাখা বন্ধ হয়ে যায়। কারণ হিসাবে বলা হয় বাড়তি ভাড়া আর দ্রুত বদলে যাওয়া ডিজিটাল বাজারের চাপ। এর ফলে সিঙ্গাপুরে তাদের দোকানের সংখ্যা আরও কমে আসে। প্রায় চার দশক ধরে সিঙ্গাপুরে উপস্থিত থাকা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এটি ছিল একটি প্রতীকী ধাক্কাও। অনেক নিয়মিত ক্রেতার কাছেই শাখাটি ছিল পরিচিত সাংস্কৃতিক ঠিকানা।
তবে কিনোকুনিয়া পুরোপুরি পিছু হটেনি। বরং কোথায় টিকে থাকতে হবে আর কোথায় নতুনভাবে বিনিয়োগ করতে হবে, সেই হিসাব তারা নতুন করে সাজিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সালে তারা নিজেদের স্টেশনারি ও উপহারসামগ্রীর সহযোগী প্রতিষ্ঠান NBC (এনবিসি)-র সঙ্গে একীভূত হয়। এতে সরাসরি পরিচালিত দোকানের সংখ্যা ১২ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৯-এ।
অন্যদিকে নতুন শাখা খোলাও বন্ধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৫ সালেই তারা সিঙ্গাপুরের Raffles City (র্যাফেলস সিটি) আর মালয়েশিয়ার Pavilion Damansara Heights (পাভিলিয়ন দামানসারা হাইটস)-এ নতুন দোকান খুলেছে।
তবে অনলাইন যুগে টিকে থাকার জন্য তাদের কৌশলও বদলেছে। গত দুই দশকে বিশ্বের বহু বইয়ের দোকান পাঠককে দোকানে টেনে রাখতে ক্যাফে, লেখক-আলোচনা, প্রদর্শনী, পাঠচক্র ও বিশেষ সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছে। কিনোকুনিয়ার পথও অনেকটাই সেদিকে। অনলাইন বিক্রেতার সঙ্গে শুধু দামের প্রতিযোগিতায় নামার বদলে তারা এমন এক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে, যেখানে মানুষ শুধু বই কিনতে নয়, সময় কাটাতেও আসবে।
তবে এই মডেল কোনো সর্বরোগহর দাওয়াই নয়, আর কিনোকুনিয়াও তা জানে। জেম মলের অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। যেখানে ভাড়া আকাশছোঁয়া, সেখানে শুধু সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে সব সময় হিসাব মেলে না। তাই ২০২২ সালে একটি শাখা বন্ধ করা আর ২০২৫ সালে দুটো নতুন শাখা খোলা আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ। এটি পিছু হটা নয়; বরং কোথায় এই মডেল টিকবে আর কোথায় ভাড়াই লাভ গিলে খাবে, সেই হিসাব কষে এগোনো।
এই কারণেই বইয়ের পাশাপাশি তাদের দোকানে গুরুত্ব পায় বিরল স্টেশনারি, মাঙ্গা-অ্যানিমে পণ্য, প্রদর্শনী, অনুষ্ঠান এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার মত পরিবেশ। দোকানকে শুধু বিক্রয়কেন্দ্র নয়, বরং সময় কাটানো ও নতুন কিছু আবিষ্কারের জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
কোথাও কোথাও আবার দোকানের ভেতরের ক্যাফেটাই হয়ে ওঠে আকর্ষণ। সিডনি শাখায় একসময় বসত ব্ল্যাক স্টার পেস্ট্রি-র সেই বিখ্যাত স্ট্রবেরি-তরমুজ কেক, যাকে অনেকে বলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইনস্টাগ্রাম-করা কেক।
ফলে কিনোকুনিয়ায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক সময় শুধু বই কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেউ নতুন উপন্যাস খুঁজছেন, কেউ মাঙ্গার তাক ঘুরে দেখছেন, কেউ স্টেশনারির বিভাগে সময় কাটাচ্ছেন, আবার কেউ কফি আর কেক নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই উল্টেপাল্টে দেখছেন। অনেকের কাছে কিনোকুনিয়ায় যাওয়া এখন কেনাকাটার চেয়েও বেশি কিছু—একটি গন্তব্য, যেখানে পৌঁছানোটাই উপলক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড-পরিচয়েও সেই বইপ্রেমী সংস্কৃতির ছাপ দেখা যায়। প্রতিষ্ঠাতার নামে তৈরি নীল ভালুকের মাসকট “মোইচি, দ্য বুক ডিসকভারার” তার একটি উদাহরণ। মাসকটটি এঁকেছিলেন শিশুতোষ বইয়ের শিল্পী চার্লস সান্তোসো (Charles Santoso)। বইপ্রেমী, কৌতূহলী এই ভালুক যেন ইয়েতি বা সাসকোয়াচেরই কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়, যে নতুন বই আর নতুন গল্পের খোঁজে সব সময় ঘুরে বেড়ায়।

সিডনি শাখার জানালায় একসময় লেখা ছিল একটি ছোট বাক্য: *“Real bookshops still exist.”* — “সত্যিকারের বইয়ের দোকান এখনও আছে।”
অবশেষে দক্ষিণ এশিয়া: দরজা খুলছে ঢাকায়
আজ কিনোকুনিয়ার উপস্থিতি রয়েছে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, তাইওয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাত আর ফিলিপাইনে।
কিন্তু এই তালিকায় এতদিন একটা বড় ফাঁক ছিল: দক্ষিণ এশিয়ার মূল ভূখণ্ড। ভারত নেই, পাকিস্তান নেই, বাংলাদেশও নেই। বিষয়টি আরও বিস্ময়কর, কারণ ইংরেজি ভাষার পাঠকের সংখ্যার বিচারে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বইবাজার। ভারত একাই পৃথিবীর বড় ইংরেজি ভাষার প্রকাশনা বাজারগুলির একটি। তবু দুবাই, আবুধাবি, সিডনি কিংবা নমপেনে পৌঁছে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি এতদিন এই বিশাল, তরুণ ও ইংরেজি-পড়ুয়া অঞ্চলে প্রবেশ করেনি। কেন করেনি, সেই প্রশ্নটা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে ছিল।
সেই শূন্যস্থান ভরাট হচ্ছে আজ, আর শুরুটা হচ্ছে ঢাকা থেকেই।
উত্তরার সেন্টারপয়েন্ট-এর গ্রাউন্ড ফ্লোরে আজ, ২০২৬ সালের ১৯ জুন, খুলেছে কিনোকুনিয়ার প্রথম বাংলাদেশি তথা দক্ষিণ এশীয় শাখা। ইউনাইটেড গ্রুপ-এর আমন্ত্রণে প্রায় দুই বছর বাজার যাচাই করে অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে এসেছে। জায়গাটাও সেই চেনা কিনোকুনিয়া-যুক্তিতে বাঁধা: উত্তরায় তরুণ জনসংখ্যা বেশি, আছে আন্তর্জাতিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়, আর সেন্টারপয়েন্ট দ্রুতই উত্তরার অন্যতম বড় বাণিজ্য ও অবসরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গত দুই দশকে ঢাকায় ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষা, আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযোগ এবং বৈশ্বিক প্রকাশনার পাঠকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই পরিবর্তিত নগর পাঠকসমাজও সিদ্ধান্তটির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দরজা খোলার ঠিক আগের দিন, মানে গতকাল, দোকানটা ঘুরে এসেছেন কয়েকজন সাংবাদিক ও নির্বাচিত ব্যক্তি। তখনও তাক সাজানো চলছিল, গ্লোবাল ফ্ল্যাগশিপের আদলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রথম দর্শনেই অনেকে একে বলছেন ঢাকার এ পর্যন্ত সবচেয়ে নজরকাড়া বইয়ের দোকান।
এই মূল্যনীতির দিকে তাকালে আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ে। কিনোকুনিয়ার আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের ইতিহাসে ভারত দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। এর কারণ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু বলেনি। তবে তাদের প্রিমিয়াম, আমদানি-নির্ভর ব্যবসায়িক মডেল এমন বাজারে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যেখানে পাঠকের একটি অংশ আন্তর্জাতিক সংস্করণের জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিতে প্রস্তুত।
বিপরীতে ভারতীয় বইয়ের বাজার বহুদিন ধরেই কমদামি স্থানীয় ও দক্ষিণ এশীয় সংস্করণের ওপর দাঁড়িয়ে। ফলে ঢাকায় কিনোকুনিয়ার সাফল্য আংশিকভাবে এই প্রশ্নেরও উত্তর দেবে—প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক বইয়ের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় আদৌ কতটা স্থায়ী বাজার আছে।
প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী নয়। মালয়েশিয়া শাখার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোইচিরো সাতোমি (Koichiro Satomi) সরাসরিই বলেছেন, বাংলাদেশে পাঠক কমছে নাকি বাড়ছে তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই; দোকান খুলে মানুষের সাড়া দেখেই তারা বুঝে নিতে চান। আর স্থানীয় পাঠকের কথা ভেবে একটা ছাড়ও রেখেছেন: বাংলা বই বাড়তি দামে নয়, দেশীয় বাজারদরেই বিক্রি হবে।
প্রাথমিক সাড়া আপাতত বাজিটাকে সমর্থন করছে। উদ্বোধনী সপ্তাহের জন্য দর্শনার্থীদের আগেভাগে স্লট বুক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, আর কয়েক দিনেই কয়েক হাজার স্লট ভরে গেছে।
অবশ্য ঢাকার পাঠ-সংস্কৃতি কিনোকুনিয়ার জন্য পুরোপুরি অচেনা ভূখণ্ড নয়। গত দুই দশকে শহরটিতে বইকে ঘিরে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক পরিসরও গড়ে উঠেছে। শাহবাগের পাঠক সমাবেশ কিংবা চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয়ে পরে ঢাকায় বিস্তৃত হওয়া বাতিঘরের মত প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে, বইয়ের দোকান শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি আড্ডা, আবিষ্কার আর পাঠক-সম্প্রদায় গড়ে তোলার স্থানও হতে পারে। বইয়ের তাক, খোলা পরিবেশ, দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরে দেখার সুযোগ এবং পাঠককেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলি ইতোমধ্যেই এক ধরনের সাংস্কৃতিক গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। সেই অর্থে কিনোকুনিয়া ঢাকায় একেবারে শূন্য মাঠে নামছে না; বরং এমন এক পাঠকসমাজের সামনে হাজির হচ্ছে, যারা বইয়ের দোকানকে শুধু দোকান হিসাবে দেখার অভ্যাস অনেকটাই ছাড়িয়ে এসেছে।
স্থানীয়করণের ছোঁয়াটা তারা পরিচয়েই দিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ শাখার ছবিতে “KINOKUNIYA” অক্ষরগুলি দিয়ে গড়া হয়েছে একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অবয়ব। জাপানি ব্র্যান্ড আর বাঙালি প্রতীকের এই মিশেল আগেভাগেই বুঝিয়ে দেয়, তারা নিছক একটা দোকানের শাখা বসাচ্ছে না; একটা শহরের পাঠ-সংস্কৃতির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে।
কয়েক মাস আগেও এটা ছিল নিছক জনশ্রুতি। আজ সেটা উত্তরার একটা মলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে খোলা একটা দরজা।
আর সেই দরজা দিয়ে আজ যা ঢুকছে, তা শুধু আরেকটা বইয়ের দোকান নয়। সেটা কয়লার দোকান থেকে শুরু হওয়া এক শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম পা রাখা।
১৯২৭ সালে শিনজুকুর ১২৫ বর্গমিটারের কাঠের দোকান থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পরবর্তী অধ্যায় লেখা হচ্ছে আজ উত্তরায়। তানাবে যে প্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছিলেন “কিই প্রদেশের ঘর”, প্রায় এক শতাব্দী পরে সেই প্রতিষ্ঠানই এসে পৌঁছেছে বঙ্গোপসাগরের তীরে। ইতিহাসের বিচারে এটি শুধু একটি নতুন শাখা নয়; কিনোকুনিয়ার দীর্ঘ বৈশ্বিক যাত্রার একটি নতুন ভূগোল।
তথ্যসংগ্রহ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: ব্রাত্য রাইসু
লিংক
ওয়েব সাইট
ফেসবুক পেইজ
