২০২০ সালের আগস্ট মাসে এই সাক্ষাৎকার তৈরি হইতে ছিল। চিন্তাটা ছিল, আমি প্রশ্ন করব, যার ইন্টারভিউ নিতেছি উনি লিখিত উত্তর দিবেন। পরে চাইলে উত্তর বদলাইতেও পারবেন।
যেহেতু ধারাবাহিক ইন্টারভিউ, তাই ছাপা হয় নাই বইলা কথাও আর আগায় নাই। প্রায় ছয় বছর পরে শুরু হইতেছে। এর মধ্যে পৃথিবী বদলাইছে, কিন্তু মানস চৌধুরীর কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে যে স্মৃতিময় বিশ্লেষণ, অনুভূতির ভিতরেও অনুভূতিরে সন্দেহ করার যে প্রবণতা, তা আগের মতই আছে। ফলে ইন্টারভিউর পরবর্তী অংশও, আশা করি, আকর্ষণীয় হবে।
এই সাক্ষাৎকারে মানস চৌধুরী তার শৈশব, ছোট শহর, স্মৃতি, প্রেম, বিষাদ, না-বিষাদ, পরিবার, ভাষা, শরীর, শিল্প ও চিন্তার ভিতর দিয়া এমন এক মানসজগতের দরজা খুলতেছেন, যেখানে নস্টালজিয়া আর সরল কোনো আবেগ আকারে নাই। বরং স্মরণ এবং না-স্মরণ—এই দুইয়ের জটিল একটা খেলায় পরিণত হইছে। বরগুণা, মেহেরপুর, ঢাকা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলের চাইতে তার কথায় বেশি ফিরা আসে “আর কখনও রিপ্লে হবে না” এমন সব মুহূর্তের অনুপস্থিতি।
এই আলাপ শুধু একজন শিক্ষক, গবেষক বা সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকের সাক্ষাৎকার না। এইটা একই সঙ্গে একজন মানুষের প্রধানত ভাষার ভিতর দিয়া আত্মস্মৃতি নির্মাণের প্রক্রিয়া যেমন, তেমনি শিল্প ও ভাষা নিয়া তার ভাবনার ভিতরে ঢোকারও একটা সুযোগ, পাঠকের জন্যে।
দীর্ঘ বিরতির পর শুরু হওয়া এই কথোপকথন তাই এক অর্থে পুরানা আলাপের পুনরারম্ভ, আরেক অর্থে সম্পূর্ণ নতুন সময়ের নতুন পাঠের শুরু।
মানস চৌধুরীর সাক্ষাৎকার
ব্রাত্য রাইসু
পর্ব ১
ব্রাত্য রাইসু: মানস, আমি আপনার গ্রাম নিয়া কথা বলতে চাইতেছি। যদি তেমন ভাগ্যবান আপনি না হন তো ছোট শহর। যাই বলেন। মানে আপনি কি রুট বা শিকড়ের অনুভব বোধ করেন কিনা আপনার বাইড়া ওঠার জায়গা, পরিবেশ বা ছোট কালের বন্ধু-বান্ধব নিয়া? মানে অনেক কালের আগের সেইসব ভাবতে গিয়া বুক খালি খালি লাগে কিনা? একদম অল্প বয়সের কোন কোন ঘটনা স্মরণ করেন? হইতে পারে সেগুলি তেমন কারো সঙ্গে আলাপ করারও বিষয় না।
মানস চৌধুরী: গ্রামের ভাগ্য আমার ছিল না। সত্য কথা। এখন পেশাজীবী হিসাবে, “গবেষক” হিসাবে, ইচ্ছামত গ্রামচষা যেতে পারত। সেটাও করা হয়নি, আরেক প্রসঙ্গ। তো, আমার ক্ষেত্রে দুইটা ছোটশহর—বরগুণা আর মেহেরপুর। জন্মানোর পর থেকে প্রায় সাত বছর পর্যন্ত বরগুণা। আর প্রায় সাত থেকে সতেরোর অধিক পর্যন্ত মেহেরপুর। তারপর সতেরোর অধিককালে ঢাকা শহরে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা বা সার্টিফিকেটের দৌড়ে নামা। এই হল হিসাব।
বরগুণা, মেহেরপুর দুই জায়গাতেই বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। গ্রামে ঠাকুরদা মানে বাবার বাবা থাকতেন। পিরোজপুরের ডাকুরতলা গ্রাম। সেখানে একবার দুই ঘণ্টার জন্য গেছিলাম, বাবার সঙ্গে। সম্ভবত ১৯৭৬ সালে। আমার হাতে সন্দেশের একটা পোঁটলা বাবা ধরিয়ে দিয়ে সেটা দাদাকে উপহার দিতে বলেছিলেন। পরে আরেকবার গেছিলাম বোধহয় ১৯৮০ সালে। তখন দাদার শ্রাদ্ধ, ফলে চাচা-চাচি আর জ্ঞাতিগুষ্টির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। পরে শুনেছি ডাকুরতলা পৌরসভার মধ্যে চলে এসেছে। গ্রামের অবসান হয়েছে সেখানে। মেহেরপুরও আমি যাই না অনেক অনেক বছর।

কিছু টুকরাটাকরা স্মৃতি মনে পড়া ছাড়া আমার রুট বা শিকড়ের বিশেষ কোনো টান নাই। অন্তত অন্য অনেকের যেমন লাগে বলে তাঁরা বলে থাকেন, সেসবের সঙ্গে আমার লাগার সম্পর্ক পাই না তেমন। কিন্তু কিছু কিছু বুক খালি খালি আমার লাগে। কিন্তু সেটা শৈশব বা কৈশোর কিংবা তখন যেখানে থাকতাম সেই জায়গার সঙ্গে সম্পর্কিত না। সেই অনুভূতি গজানোর সঙ্গে সুদূর অতীতের নির্ধারণী কোনো সম্পর্ক আমি পাই না। সেটা নিকট অতীতে গতকালও ঘটে থাকতে পারে। আমার যেটা লাগে সেটা আরেকবার একই জিনিস বা একই মিলন বা একই মুহূর্ত না ঘটাতে পারার একটা একান্ত বিষণ্ন অনুভূতি, বিহ্বলতাও; এবং বেশ অবর্ণনীয়। অল্প বয়সের মনে করা ঘটনাগুলিও হবে মনে করতে চাই বলে আনা। ইচ্ছানিরপেক্ষভাবে কিছু এসে মনের মধ্যে একপ্রস্থ বিষাদবৃষ্টি ঘটিয়ে দিয়ে গেল এমন হয় না আমার।
তার মানে কি শৈশব-কৈশোরের কোনো সাথির কথা মনে পড়ে না? মনে পড়লে কি বেদনাবোধ করি না? করি। ধরুন, একবার আপনি একটা রচনা ছেপেছিলেন অনেকদিন আগে “বেযোগাযোগ…” নামে। সেখানে অন্তত চারজন শৈশবসাথির কথা এসেছিল যতদূর মনে পড়ে। বিপুল, আঁখি, রুমা পিসি, কায়েদুর। আসলে আরো লোকজন এসেছিলেন। কিন্তু চারজনই ধরি। এঁদের মধ্যে তিনজন সমবয়সী, একজন মুরুব্বি। দুইজন নারী, দুইজন পুরুষ। তিনজন বরগুণার, একজন মেহেরপুরের। একজন মৃত হিসাবে রচনায় স্মৃত হয়েছিলেন, অন্য তিনজন, জানা নাই, তখন তো বটেই, এখনও কিন্তু জীবিত থাকতে পারেন। খুব অনুসন্ধান করলে তাঁদের একেকজনকে হয়ত “খুঁজে পাওয়া” যেতে পারে। কিন্তু ওই স্মৃতিচারণে খুঁজবার তাগিদ ছিল না। কিংবা, এখন কেউ সামনে এনে দিলেও কী করব তার কোনো হাতামাথা জানি না। ফলে এগুলো ওনাদের নিয়ে বেদনাবোধ না হতে পারে। বরং, একটা দুইটা চারটা মুহূর্তের মুখচ্ছবি, কিংবা সেই সময়ের যাপিত ঘটনাপ্রবাহ মনে করা। মনে করাও না, সেইটা যে আরেকবার জীবনে হবে না সেই সত্যটা মনে করা।
এমনকি আমার ক্ষেত্রে, ওই মনে-করাকরিও খুব বিবরণীসাপেক্ষ। আমি মনে করতে চাইলাম। আমি আপনার (বা মশিউলের) পত্রিকায় লিখতে চাইলাম, আমি কখনও কারো সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে গল্প করতে চাইলাম তাই মনে করলাম। মনে করতে করতে, মানে লিখতে-লিখতে বা বলতে-বলতে তাঁরা মনে পড়লেন। উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন। আলাদা করে বেদনাসিক্ত হতাম না, যদি মনে করতে না বসতাম। এইটা অনেকটা খেয়াল গানের মত। আপনি যতক্ষণ ইচ্ছা আলাপ করতে পারবেন, বিস্তার করতে পারবেন। কিন্তু সারাদিন করার পরও সারাংশ কথাটা, মানে গানের বাণীখানা লম্বায় বড় হবে না। আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতির বিষাদ হল, যদি কোনো বিষাদ থাকে আরকি, ওই বাণীর মত। আর তা অবশ্যই মানুষটানুষের জন্য, যা ও যতটুকু।

আর কালের ব্যাপারটাও জটিল। শৈশব-কৈশোরকে এখানে প্রশ্নতে আনা হল হয়ত সুদূর অতীতের স্বার্থে। কিন্তু বাস্তবে ওই যে খালি-লাগাটা তা প্রায় গত সপ্তাহের কিছুর জন্যও হতে পারে। ধরুন, শচীনের একটা-দুইটা গানের কলি, সুরসমেত, আমার কানে আসা মাত্রই একজন প্রেমিকার কথা মনে পড়ে। আবার আশা ভোঁসলের অনামিকা কিংবা ওয়াক্ত ছবির গান কানে আসলে আরেক প্রেমিকার কথা মনে পড়ে। আরো ভেবে বললে, বলা উচিত হবে প্রেমিকার-সঙ্গে-কাটানো-কালে যে অনুভূতিগুলো মাথায় কিলবিল করছিল, সেই অনুভূতি মনে পড়ে। কিন্তু আসলে তাও না। অনুভূতিগুলো যে ঠিকমত মনে পড়ছে না সেই না-পড়তে থাকাটা মনে পড়ে। যা খালি লাগায়, সেইটা লাগায়।
আবার এইটাও মনে পড়ে যে, আপনি এখন গানগুলা বাজায়ে বাজায়ে সেইসব প্রেমিকাদের অনুরোধ করে সামনে বসিয়ে দিলেও আমার সেই অনুভূতিপ্রবাহটা, যা ঠিকমত আর মনে পড়ে না, কিন্তু না-মনে পড়াটাই মনে পড়ে, আর তৈরি হবে না। এই মনে করাটা তখন খালি লাগায়। সেজন্য ওটা শৈশব-কৈশোরের কোনো মামলা না আমার জন্য; যেসব জায়গায় থাকতাম সেসব জায়গারও না; যেসব মানুষের সঙ্গে দেখা হত তাঁদের মধ্যে জীবিতকুলের জন্যও না। মৃতদের জন্য একটু হয়ত, কিন্তু আসলে যেসব মায়াবীকাল আর রিপ্লে হবে না সেসব মায়াবীকালের অরিপ্লেময়তার জন্য খালি লাগে। প্রেমিকার উদাহরণে বলতে সুবিধা হল। কিন্তু পিঁড়িতে বসে নানি যে আর দুধের চাঁছা তুলবে না, সেই দৃশ্যটার মায়া নিয়েও হতে পারে। কিংবা ওই যে কায়েদুরের বোনটা মারা যাবার পর কায়েদুর কেমন করে যেন তাকিয়ে ছিল। সেই তাকিয়ে-থাকাটা কিন্তু মনে পড়ে না। কিন্তু ‘কেমন যেন’ তাকানো ছিল সেটা মনে পড়ে। মনে করতে চাইতে-চাইতে যতটুকু কায়েদুর ততটুকুই।
মানুষের বিহ্বল মুখ! ভীষণ মায়াজাগানিয়া। তার জন্য শৈশব পর্যন্ত যেতে হয় না। আর তার জন্য সব সময় ঠিক নিজের কাছের লোকও হওয়া লাগে না। ফলে যে পদ্ধতিতে বুক-খালি লাগে, সেটা প্যাঁচানো পদ্ধতি। তবে অন্যদের অনেকেরও হয়ত এভাবেই লাগে। কিন্তু বলার সময় তাঁরা বলেন জায়গা বা শৈশবের কথা। হয়ত!
অল্প বয়সের কিছু ঘটনা, আমি মনে করতে চাইলেই কেবল, মনে করি। যেমন, বাবার আঙুল ধরে রাস্তায় হাঁটছি। লোকটাকে অজস্র প্রশ্ন করছি, আর তিনি রাগ করছেন না। আবার এই মনে করাও কতটা আমার যাপনকে মনে করা, আর কতটা অন্যরা আমার আর বাবার রাস্তায় হাঁটা নিয়ে যে গল্প করেছেন সেসব গল্পের চাপে বানোয়াট দৃশ্য মনে করা তাও অত সুনিশ্চিত না। মা রান্না করছেন, মনে করার চেষ্টা করি যুবতী বয়সের মা-কে। মনে পড়তে থাকেন বর্তমান বয়সের মা। তারপর একদিন হারিয়ে গেলাম। হারানোটার দৃশ্য মনে পড়ে না, কিন্তু মা যখন আমাকে ফিরে পেলেন, তখনকার মায়ের মুখটা মনে করি। কাঁদছিলেন তিনি। আবার মাঝেমধ্যে মায়ের এঙ্গেল থেকে আমার ফেরত আসার দিকটা দেখার চেষ্টা করি। খুব কঠিন সেটা। তারপর মনে করে ফেলি স্কুল থেকে বাড়ি পর্যন্ত পেটে হাগু না রাখতে পারা। খুবই হেনস্তামূলক পরিস্থিতি, যে কোনো বয়সের জন্যই। দাশু জ্যেঠুর হোমিওপ্যাথ দোকানে বসে থাকা মনে করে ফেলি। আবার তার কয়বছর আগে বরগুণার খালপাড়ে জোয়ার আসা মামার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখা মনে করে ফেলি।
শীতের খুব সকালে মা চাদর দিয়ে আমার কানমুড়ি দিয়ে কোলবালিশের মত বানিয়েছেন আমাকে। পাশে থাকা মামার জোরে নদীপাড়ে খেঁজুর রস কিনতে গেছি। লোকেশন বরগুণা। আবার মেহেরপুর কলেজের পাশ থেকে সাইকেল চালিয়ে আসবার সময় বাবলা গাছে ফুল ধরে আছে। সেটাও মনে করে ফেলতে পারি। শ্রীশ মেমোরিয়াল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটা মাত্র ঘর ছিল। হলঘর। সম্ভবত সেটা কখনও কোনো জমিদারের, শ্রীশ সাহেবেরই হবে, থিয়েটার হল ছিল। আমি পড়তাম। সব ক্লাসই একটা ঘরে। মানে ভিন্ন ভিন্ন দিকে মুখ করে কীভাবে যেন স্যাররা ম্যানেজ করতেন। পড়ে ওটা ভেঙে ফেলল। নতুন আর্কিটেকচারের লম্বা স্যাঙ্গার মত বিল্ডিং হল। তো আগের সেই হলঘরটাও মনে পড়ে। কিংবা সাদেক স্যারের সাইকেলে চড়ে তাঁর বাড়িতে যাওয়া মনে করি। আবার দাদার শ্রাদ্ধের সময় দাদাবাড়ির পুকুরে ডুবে গেলাম। একটুখানির মধ্যেই সমবয়সী জ্ঞাতিগুষ্টিরা সম্ভবত মারধোরের ভয়ে কাদার মধ্য থেকে জ্যান্ত আমাকে তুলে ফেলল—এটাও মনে করা যায়। এসব মনে করাগুলো ঐচ্ছিক, কোনো ইচ্ছানিরপেক্ষতা নাই, ধারাবাহিকতাও নাই। বিবরণীর ইচ্ছায় মনে করা হয়, বা মাথায় চলচ্চিত্রময়তার ইচ্ছাতেও মনে করা হয়।
কখনও কখনও ভেবে ভেবে একটা অল্প বয়সের আমিকেও মনে করতে পারি। মনে করি। ফোটো কম থাকার কারণেই হোক, আর যে কারণেই হোক অল্পবয়স্ক আমিটার মুখ ঠিকমত মনে পড়ে না। একটা কাল্পনিকভাবে অস্পষ্ট মুখের আমি হাঁটি। কিংবা কোমরে ঢিলা প্যান্টটা টানতে থাকি। কিংবা রাস্তার মানুষদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওই অস্পষ্ট আমিটা অনেক বিহ্বল থাকে। কখনও কখনও অন্যের বিহ্বল মুখের জন্য যে মায়া লাগে সেই মায়া নিয়ে নিজের কাল্পনিক অতীত অস্পষ্ট মুখটার দিকে তাকাতে চেষ্টা করি। খুব তখন মায়া জাগে না।
১৮ আগস্ট ২০২০
(চলবে)
কভারের ফটো. ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা
