Skip to content
সাহিত্য ডটকম সাহিত্য ডটকম

  • হোম
  • বই
    • প্রথম অধ্যায়
    • বইমেলা
    • প্রকাশনা
  • কথাসাহিত্য
    • গল্প
    • উপন্যাস
    • কবিতা
    • নাটক
    • লেখালেখি
    • ভ্রমণ কাহিনী
    • কাল্পনিক চরিত্র
  • প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ
    • তত্ব
    • প্রবন্ধ
    • ঐতিহ্য
    • সংস্কৃতি
    • ইতিহাস
    • সমালোচনা
    • আত্মজীবনী
  • স্মৃতি
    • চিঠিপত্র
    • স্মৃতিকথা
    • স্মরণ
  • কথোপকথন
    • সাক্ষাৎকার
    • পডকাস্ট
    • বইয়ের আড্ডা
    • বিতর্ক
  • বিবিধ
    • অন্যান্য
    • অ্যানেকডোট
    • লেখক তালিকা
    • পুনর্মুদ্রণ
    • উল্লেখ
    • কোটেশন
    • ছবির গল্প
    • শব্দের গল্প
  • আর্টস
    • চলচ্চিত্র
    • চিত্রশিল্প
    • নৃত্য
    • সঙ্গীত
    • ফটোগ্রাফি
    • মঞ্চ
    • স্থাপত্য
    • এনিমেশন
    • ভিডিও গেমস
    • ডক্যুমেন্টারি
  • চিন্তা
0
সাহিত্য ডটকম
সাহিত্য ডটকম

মিসেস গান্ধীর ভূত

Posted on August 31, 2026September 1, 2026 By সাহিত্য ডেস্ক

১৯৮৪ সাল তার ধ্বংসের পূর্বাভাসকে ভারতে যেভাবে সত্যি করে তুলল, পৃথিবীর আর কোথাও তেমন হয়নি। পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা, অমৃতসরের শিখদের পবিত্র স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনীর হামলা, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, বেশ কয়েকটি শহরে দাঙ্গা, ভোপালের গ্যাস দুর্ঘটনা। একটির পর একটি ঘটনা যেন কোনো বিরাম ছাড়াই ঘটে চলছিল। ১৯৮৪ সালে কিছু দিন তো এমনও গেছে, যেদিন সকালে দিল্লির খবরের কাগজ খুলতেও সাহস লাগত।

বছরজুড়ে ঘটে যাওয়া অনেক বিপর্যয়ের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতাই আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। এখন পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, সেই সময়ের অভিজ্ঞতাগুলি লেখক হিসাবে আমার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এতটাই যে, এত দিন পর্যন্ত আমি সেসব নিয়ে লেখার চেষ্টা করিনি।

মিসেস গান্ধীর ভূত
ইন্দিরা গান্ধী

সেই সময় আমি নয়াদিল্লির ডিফেন্স কলোনি নামের একটি এলাকায় থাকতাম। সেখানে ছিল বড় বড়, গোলকধাঁধার মত বাড়ি। বাড়িগুলির ছাদে ও গ্যারেজের ওপর আলাদা আলাদা ছোট ঘর ছিল, যেখানে সাধারণত গৃহকর্মীরা থাকতেন। আমি যখন সেখানে থাকতাম, তখন এসব ঘরে তরুণ ও আর্থিকভাবে কষ্টে থাকা সাংবাদিক, কপিরাইটার, জুনিয়র কর্মকর্তা এবং আমার মত বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজনের ভাসমান বসতি গড়ে উঠেছিল। আমরা যেন মৌচাকের ভেতরের ক্ষুদ্র পোকামাকড়ের মত এই ধনী এলাকার এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে ছড়িয়ে ছিলাম। বাড়িওয়ালাদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের ফাঁকে আমাদের অগোছালো জীবনও কোনোভাবে চলত—ছাদে শাড়ি-কাপড় শুকানোর দড়ি আর টিভি সিরিয়ালের ব্যস্ততার আড়ালে।


অমিতাভ ঘোষ

‘দ্য নিউ ইয়র্কার’, ১০ জুলাই ১৯৯৫


আমার বয়স তখন আটাশ। যে শহরকে আমি নিজের বাড়ি মনে করতাম, সেটি কলকাতা। কিন্তু ইংল্যান্ড ও মিশরে কাটানো কয়েকটি বছর বাদ দিলে, আমার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন কেটেছিল নয়াদিল্লিতে। অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি শেষ করে দুই বছর আগে আমি ভারতে ফিরে এসেছিলাম। এর কিছুদিন আগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার একটি চাকরিও পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার আসল জীবন কাটত ছাদের ওপরের ছোট্ট, গরম ঘরটিতে, নিজের মত করে। সেখানেই আমি আমার প্রথম উপন্যাস লিখছিলাম—একেবারে চেনা সেই পুরোনো কায়দায়, চিলেকোঠার ঘরে বসে।

৩১ অক্টোবর সকালে, যেদিন ইন্দিরা গান্ধী মারা যান, আমি প্রতিদিনের মত সকাল সাড়ে নয়টার দিকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার বাসে উঠেছিলাম। আমি যেখানে থাকতাম, সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগত। নয়াদিল্লির হিসাবে যাতায়াতের এই সময়টা দীর্ঘ হলেও অস্বাভাবিক ছিল না। বাসে ওঠার কিছুক্ষণ আগেই, কয়েক মাইল দূরে ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু বাসে ওঠার সময় আমি এ খবর কিছুই জানতাম না। নব্বই মিনিটের যাত্রাপথেও অস্বাভাবিক কিছু আমার চোখে পড়েনি। তবে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া খবর আমার বাসের চেয়েও দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে গিয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে দেখি, প্রতিদিনের মত হৈচৈ করে ফ্রিসবি খেলা ছাত্রদের ভিড় নেই। তার বদলে ছোট ছোট দলে কিছু মানুষ ট্রানজিস্টর রেডিও ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে থাকা একদল মানুষের মধ্য থেকে এক তরুণ আমার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে হালকা, যেন সবকিছু জেনে গেছে এমন এক হাসি। যে ধরনের হাসি নিয়ে কেউ সাধারণত বলে, “শুনেছেন…?”

সে বলল, ক্যাম্পাসজুড়ে গুঞ্জন চলছে। কেউ নিশ্চিতভাবে কিছু জানে না, তবে শোনা যাচ্ছে, ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করা হয়েছে। খবর ছড়িয়েছে যে, অমৃতসরের শিখদের স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনী পাঠানোর প্রতিশোধ হিসাবে তার দুই শিখ দেহরক্ষী তাকে হত্যা করেছে। সেই অভিযান ওই বছরের শুরুর দিকে হয়েছিল।

লেকচার রুমে ঢোকার ঠিক আগে অল ইন্ডিয়া রেডিও, দেশের জাতীয় রেডিও নেটওয়ার্কে খবর শুনলাম: ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কিছুই থামেনি। প্রতিদিনের কাজের স্বাভাবিক গতিতেই সবকিছু চলতে থাকল। আমি ক্লাসরুমে গিয়ে লেকচার শুরু করলাম। তবে খুব বেশি ছাত্র আসেনি। যারা এসেছিল, তারাও যেন ক্লাসে মন দিতে পারছিল না; তারা অন্যমনস্ক ছিল, অস্থিরভাবে নড়াচড়া করছিল।

মিসেস গান্ধীর ভূত
অমিতাভ ঘোষ

ক্লাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি ঘরের একমাত্র সরু জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। নিচের লনে রোদ ঝলমল করছিল, দূরের গাছগুলির ওপরও রোদ পড়েছিল। দিল্লিতে বছরের সেই সময়টা ছিল সবচেয়ে সুন্দর—আবহাওয়া ঠাণ্ডা ও পরিষ্কার। বর্ষা সবে শেষ হয়েছে, তাই চারপাশের সবুজ গাছপালা ছিল সতেজ, আর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া আকাশ ঝকঝক করছিল। আমি যখন আবার ঘুরে ক্লাসের দিকে তাকালাম, তখন কী বলছিলাম তা ভুলে গিয়েছিলাম। তাই নোটগুলি হাতে নিতে হল।

আমার এই অস্থিরতায় আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম। আমি ইন্দিরা গান্ধীর অন্ধ সমর্থক ছিলাম না। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার স্বল্পস্থায়ী আধা-স্বৈরাচারী শাসনের কথাও আমার মনে তখনও স্পষ্ট ছিল। কিন্তু তার আকস্মিক ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড আমাকে মনে করিয়ে দিল, এত দিন আমরা তার কিছু বাস্তব গুণকে কতটা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছিলাম—তার দৃঢ়তা, মর্যাদা, শারীরিক সাহস এবং সহ্যশক্তি।

তবে সেই মুহূর্তে আমি শুধু শোক অনুভব করছিলাম না। বরং মনে হচ্ছিল, ভেতরে কোথাও যেন কিছু আলগা হয়ে গেছে, যেন এত দিন ধরে শক্ত করে বাঁধা কোনো দড়ির গিঁট হঠাৎ খুলে যাচ্ছে।

মিসেস গান্ধীর মৃত্যুর প্রথম নির্ভরযোগ্য খবর পাকিস্তানের করাচি থেকে দুপুর প্রায় দেড়টার দিকে প্রচার করা হয়। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে নিয়মিত সংবাদ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; তার বদলে শুধু গান বাজছিল।

বিকেলের দিকে আমি বন্ধু হরি সেনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলাম। সে শহরের অন্য প্রান্তে থাকত। আমার একটি দূরপাল্লার ফোন করার দরকার ছিল, সে আমাকে তার পরিবারের টেলিফোন ব্যবহার করতে দিয়েছিল।

হরির বাড়িতে যেতে হলে কনট প্লেসে বাস বদলাতে হত। দিল্লির ভৌগোলিক কেন্দ্রের এই জায়গা একটি সুন্দর গোলাকার দোকানসারি, যা পুরোনো শহরকে নতুন শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাস যখন ওই চত্বরের বাইরের দিক দিয়ে ঘুরছিল, আমি লক্ষ করলাম দোকান, স্টল আর খাবারের দোকানগুলি বিকেল থাকতেই বন্ধ হতে শুরু করেছে।

আমাদের পরের বাস পুরাপুরি ভর্তি ছিল না, যা অস্বাভাবিক। বাস ছাড়ার ঠিক সময়ে একজন লোক দৌড়ে এসে উঠে পড়লেন। তার বয়স মাঝামাঝি। শার্ট ও প্যান্ট পরা। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো সরকারি ভবনের কর্মচারী। তিনি শিখ ছিলেন, কিন্তু তখন আমি বিষয়টি প্রায় খেয়ালই করিনি।

সম্ভবত প্রতিদিনের মত নিজের নিয়মিত বাসে উঠছিলেন বলেই তিনিও কোনো চিন্তা না করেই বাসে উঠে পড়েছিলেন। কিন্তু সেদিন এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত আর হতে পারত না। বাসটির পথ পড়েছিল সেই হাসপাতালের পাশ দিয়ে, যেখানে ওই সময ইন্দিরা গান্ধীর মরদেহ রাখা ছিল। তার দলের কিছু অনুগত সমর্থক হাসপাতালের সামনে জড়ো হওয়া মানুষকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উসকে দিতে শুরু করে। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং, যিনি নিজেও একজন শিখ, তার গাড়িবহরও এর মধ্যেই জনতার হামলার শিকার হয়।

তখন এসবের কিছুই আমরা জানতাম না। জানার কারণও ছিল না। আমরা কখনও ভাবিনি এমন কিছু ঘটতে পারে। কারণ দিল্লিতে শিখদের বিরুদ্ধে এর আগে কখনও সহিংসতা হয়নি।

নয়াদিল্লির প্রশস্ত, গাছঘেরা সড়ক ধরে বাস আগাতে থাকল। সরকারি ধরনের কিছু গাড়ি, সামনে ও পেছনে নিরাপত্তারক্ষীসহ, আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত হাসপাতালের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। আমরা হাসপাতালের কাছে যত আগাতে লাগলাম, ততই বোঝা গেল সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছে। কিন্তু এটি কোনো সাধারণ ভিড় না। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, চোখ লাল হয়ে থাকা তরুণদের দল। শার্টের বোতাম অর্ধেক খোলা।

এবার লক্ষ করলাম, আমাদের সেই শিখ সহযাত্রী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কখনও উঠে বাইরে তাকাচ্ছেন, কখনও দরজার দিকে তাকাচ্ছেন। বাস থেকে নেমে যাওয়ার তখন আর কোনো সুযোগ নেই। চারদিকে গুন্ডারা ছড়িয়ে ছিল।

হাসপাতালের দিকে যত আগাচ্ছিলাম, তরুণদের দল ততই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল। তাদের মধ্যে এক ধরনের সতর্ক নজরদারি ছিল। কারও হাতে লোহার রড, কারও হাতে সাইকেলের চেইন। অন্যরা ব্যস্ত সড়কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গাড়ি ও বাস থামাচ্ছিল।

আমার বিপরীত পাশের আসনে বসা শাড়ি পরা এক মোটাসোটা মহিলা প্রথম বুঝতে পারলেন কী ঘটছে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বাসের ভেতর কুঁজো হয়ে বসে থাকা শিখ লোকটির দিকে দ্রুত ইশারা করলেন। হিন্দিতে ফিসফিস করে তাকে বললেন, নিচু হয়ে লুকিয়ে থাকতে।

লোকটি বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং দুই আসনের মাঝখানের সরু পায়ের জায়গায় নিজেকে গুটিয়ে ফেললেন।

কয়েক মিনিট পর একদল তরুণ আমাদের বাস থামিয়ে দিল। তাদের পরনে ছিল উজ্জ্বল রঙের চকচকে সিনথেটিক কাপড়ের পোশাক। কয়েকজনের কবজির চারপাশে সাইকেলের চেইন পেঁচানো। বাস ধীরে ধীরে থামার সময় তারা বাসের পাশে দৌড়াচ্ছিল। খোলা দরজা দিয়ে তারা চালককে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, বাসে কোনো শিখ আছে কি না।

চালক মাথা নাড়লেন। না, তিনি বললেন, বাসে কোনো শিখ নেই।

আমার কয়েক সারি সামনে পাগড়ি পরা যে লোকটি কুঁকড়ে বসেছিলেন, তিনি একেবারে স্থির হয়ে গেলেন।

বাইরে কয়েকজন তরুণ জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছিল এবং জিজ্ঞেস করছিল, বাসে কোনো শিখ আছে কি না। তাদের কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না। আর এটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার।

কেউ একজন বলল, না।

সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও একই কথা বলতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব যাত্রী মাথা নেড়ে বলছিল, “না, না, এখন আমাদের যেতে দিন। আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।”

শেষ পর্যন্ত গুন্ডারা সরে দাঁড়াল এবং আমাদের যেতে ইশারা করল।

রিং রোড ধরে বাস যখন দ্রুত এগিয়ে চলছিল, তখন কেউ কোনো কথা বলছিল না।

হরি সেন থাকতেন নয়াদিল্লির নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকাগুলির একটিতে। এলাকার নাম সফদরজং এনক্লেভ। জায়গাটি ছিল পরিপাটি, সচ্ছল মধ্যবিত্তদের পাড়া, বিলাসিতার চেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষাই যেখানে বেশি চোখে পড়ত। এ ধরনের বেশির ভাগ শহরতলির মত এখানেও নানা সম্প্রদায়ের মানুষ থাকত। শিখদের সংখ্যাও কম ছিল না।

একটি লম্বা রাস্তা পুরো পাড়াকে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পেরিয়ে গিয়েছিল, অনেকটা চিরুনির শিরদাঁড়ার মত। এর দুপাশ থেকে সমান্তরাল ছোট ছোট রাস্তা বেরিয়ে গেছে। হরি থাকতেন এমনই এক রাস্তার শেষ মাথায়, বেশ সাধারণ ধরনের বড় একতলা বাংলোতে। তবে পাশের বাড়ি ছিল আরো অনেক জাঁকজমকপূর্ণ এবং নকশার দিক থেকে অস্বাভাবিক। কোণাকুণি নকশার বাড়িটি মাটি থেকে উঁচু করে খুঁটির ওপর দাঁড় করানো। বাড়ির মালিক মি. বাওয়া ছিলেন বয়স্ক এক শিখ। তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেছিলেন। কয়েক বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও ছিলেন। সম্ভবত সেই কারণেই বাড়িটি খুঁটির ওপর তোলা হয়েছিল।

হরি তার পরিবারের সঙ্গে এমন বড় ও বিচিত্র বাড়িতে থাকতেন যে বন্ধুদের মধ্যে বাড়িটি ‘মাকোন্দো’ নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সেই জাদুকরী গ্রামের নামেই এই নাম। তবে সেদিন বাড়িতে ছিলেন শুধু হরির মা ও কিশোরী বোন। সেদিন রাতটা ওখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সকালটা ছিল উজ্জ্বল। আমি যখন রোদে বের হলাম, এমন এক দৃশ্য চোখে পড়ল যা কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। চারদিকে পরিষ্কার আকাশের দিকে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছিল অসংখ্য ধোঁয়ার স্তম্ভ। শিখদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জ্বলছিল। আগুন এত নির্দিষ্টভাবে একেকটি জায়গায় লাগানো হচ্ছিল যে পুরো শহরে একসঙ্গে আগুন লাগার মত মনে হচ্ছিল না। বরং দৃশ্যটা এমন ছিল, যেন বিশাল কোনো স্তম্ভওয়ালা হলঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি।

আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ধোঁয়ার স্তম্ভের সংখ্যা তখনও বাড়ছিল। কিছু আগুন বেশ কাছেই জ্বলছিল। একজন পথচারীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, কাছাকাছি বেশ কয়েকটি শিখের বাড়ি সেদিন সকালে লুট করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জনতা কলোনির দূরের দিক থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। যে হিন্দু বা মুসলমানরা শিখদের আশ্রয় দিয়েছিল, তাদেরও আক্রমণ করা হচ্ছিল। তাদের বাড়িও লুট করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

চারদিক অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল। এতটাই শান্ত যে ভয় লাগছিল। সকালের ব্যস্ত সময়ের গাড়ির স্বাভাবিক শব্দ নেই। মাঝে মাঝে শুধু একটি দ্রুতগতির গাড়ি বা মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল মূল সড়ক থেকে। পরে আমরা জানতে পারি, এই রহস্যময় দ্রুতগতির গাড়িগুলিই চলমান হত্যাযজ্ঞ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। কিছু রাজনীতিকের আশ্রয়ে থাকা ‘সংগঠকেরা’ শহরজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল, জনতা জড়ো করছিল এবং তাদের শিখদের মালিকানাধীন বাড়ি ও দোকানে নিয়ে যাচ্ছিল।

কিছুদিন পর প্রকাশিত এক নাগরিক অধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, “টেম্পো ভ্যান, স্কুটার, মোটরসাইকেল বা ট্রাকে করে সশস্ত্র লোকজনের দল” এলাকায় এসে পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই সহিংসতার এই পর্যায় শুরু হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল:

পেট্রলের ক্যান নিয়ে তারা এলাকায় ঘুরে বেড়াত এবং পরিকল্পিতভাবে শিখদের বাড়ি, দোকান ও গুরুদুয়ারায় আগুন ধরিয়ে দিত। মূল লক্ষ্য ছিল তরুণ শিখরা। তাদের বাড়ি থেকে টেনে বের করে মারধর করা হত, তারপর জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকাতেই মানুষকে আতঙ্কিত করার পরিকল্পিত চেষ্টা স্পষ্ট ছিল। হামলাকারীদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা ছিল, জনসমক্ষে রাস্তায় শিখদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা।

আগুন ছিল সর্বত্র। সেদিনের প্রধান চিত্রই যেন আগুন। পুরো শহরজুড়ে শিখদের বাড়ি লুট করে তারপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। অনেক সময় বাড়ির ভেতরে মানুষ থাকা অবস্থাতেই।

স্বামী ও তিন ছেলেকে হারানো এক নারী দিল্লির সমাজবিজ্ঞানী বীণা দাসকে ঘটনাটির বর্ণনা দিয়েছিলেন:

“কয়েকজন মানুষ, প্রতিবেশী, আমার এক আত্মীয়, বলেছিল, কাছেই একটি পরিত্যক্ত বাড়ি আছে, সেখানে লুকিয়ে থাকলে ভাল হবে। আমার স্বামী আমাদের তিন ছেলেকে নিয়ে সেখানে লুকিয়ে পড়ে। আমরা বাইরে থেকে বাড়ি তালাবদ্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের মনে বিশ্বাসঘাতকতা ছিল। নিশ্চয়ই কেউ জনতাকে বলে দিয়েছিল। তারা নানা কথায় ভুলিয়ে তাকে বাইরে বের করে আনল। তারপর ওই বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে দিল। তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। সেদিন রাতে আমি সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ছেলেদের লাশ চিলেকোঠায়, একসঙ্গে জড়াজড়ি করে পড়ে আছে।”

পরের কয়েক দিনে শুধু দিল্লিতেই প্রাণ হারায় প্রায় ২,৫০০ মানুষ। অন্য শহরগুলিতে মারা যায় আরও হাজার হাজার। মোট কতজন মারা গিয়েছিল, তা কখনও জানা যাবে না। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন শিখ পুরুষ। পুরো পাড়া ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল; হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিল।

আমার প্রজন্মের অন্য অনেকের মত আমিও বড় হয়েছিলাম এই বিশ্বাস নিয়ে যে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগের সময় যে ধরনের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তা আর কখনও ঘটতে পারে না। কিন্তু সেদিন সকালে দিল্লি শহরে যে সহিংসতা দেখলাম, তার তীব্রতা সেই সময়ের হত্যাকাণ্ডের সমান পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।

হরি আর আমি যখন ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন মিসেস সেন, হরির মা, ভাবছিলেন আরও কাছের একটি বিষয় নিয়ে। তার বয়স প্রায় পঞ্চাশ। লম্বা, সুন্দরী মহিলা। স্বভাব শান্ত এবং নরম গলার। তিনি গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসীও ছিলেন, তবে খুব নীরবে। তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু। কী ঘটছে জানতে পেরে তিনি ফোন তুলে পাশের বাড়ির বয়স্ক শিখ দম্পতি মি. ও মিসেস বাওয়াকে ফোন করলেন এবং জানালেন, তারা চাইলে তাদের বাড়িতে এসে থাকতে পারেন।

কিন্তু তিনি যে প্রতিক্রিয়া পেলেন, তা ছিল অপ্রত্যাশিত। ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা। মিসেস বাওয়া ভেবেছিলেন, তিনি হয়ত মজা করছেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, এতে হাসবেন নাকি বিষয়টিকে অন্যভাবে নেবেন।

দুপুরের দিকে মিসেস সেন একটি ফোন পেলেন। জনতা এখন একেবারে কাছের এলাকায় চলে এসেছে এবং এক রাস্তার পর আরেক রাস্তা ধরে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে আসছে। হরি ঠিক করল, এবার বাওয়াদের বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। আমিও তার সঙ্গে গেলাম।

মি. বাওয়া ছিলেন ছোটখাটো, রোগা একজন মানুষ। সাধারণ পোশাক পরেছিলেন। তবে তার পাগড়ি সুন্দর করে বাঁধা ছিল এবং দাড়ি যত্ন করে আঁচড়ানো ও বাঁধা। আমাদের আসতে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন। ভদ্রভাবে অভিবাদন জানানোর পর জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের জন্য তিনি কী করতে পারেন। হরিকেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হল।

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার কথা মি. বাওয়া অবশ্যই শুনেছিলেন। কিছু গোলমাল হচ্ছে, সেটাও জানতেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না, এই ‘গোলমাল’ কীভাবে তার বা তার স্ত্রীর জীবনে এসে পড়তে পারে। শিখ সন্ত্রাসীদের প্রতি তার কোনো সহানুভূতি ছিল না। বরং হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তার ঘৃণা আমাদের চেয়েও বেশি ছিল। ভারতের প্রতি এবং ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য ছিল প্রশ্নহীন। তার আচরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনি দেশ যারা চালায় তাদেরই কেউ একজন।

সারা জীবন নিরাপদ ও সুবিধার মধ্যে থাকা একজন মানুষকে কীভাবে বোঝাবেন যে সেই নিরাপত্তার আবরণে এমন একটি ফাটল তৈরি হয়েছে, যা হয়ত শেষ পর্যন্ত তাকে ধ্বংস করে দিতে পারে? আমরা কীভাবে কথাটা বলব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মি. বাওয়া বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে কোনো জনতা তাকে আক্রমণ করতে পারে।

আমরা যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন বরং মি. বাওয়াই আমাদের আশ্বস্ত করছিলেন। হাসতে হাসতে আমাদের পিঠ চাপড়ে বিদায় দিলেন। তিনি সরাসরি “সাহস রাখো” বলেননি, কিন্তু তার আচরণে সেটাই যেন বলা ছিল।

আমরা নিশ্চিত ছিলাম, সরকার খুব শিগগিরই সহিংসতা বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেবে। ভারতে সাম্প্রদায়িক বা অন্য ধরনের নাগরিক অশান্তি সামলানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। কারফিউ জারি করা হয়, আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, আর পরিস্থিতি খুব খারাপ হলে সেনাবাহিনী আক্রান্ত এলাকায় ঢোকে। বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা নয়াদিল্লির মত শহর এই পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য সবচেয়ে ভালভাবে প্রস্তুত। পরে আমরা জানতে পারি, কিছু শহরে, যেমন কলকাতায়, রাজ্য সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সহিংসতা ঠেকিয়েছিল। কিন্তু নয়াদিল্লিসহ উত্তর ভারতের আরও অনেক জায়গায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কয়েক মিনিট পরপর আমরা রেডিওর দিকে ফিরতাম। আশা করতাম শুনব, সেনাবাহিনী নামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা শুধু বিষণ্ণ সংগীত শুনছিলাম এবং শুনছিলাম মিসেস গান্ধীর মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত রাখা হয়েছে, দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা আসছেন, যাচ্ছেন। সংবাদগুলি এমন লাগছিল, যেন অন্য কোনো গ্রহ থেকে পাঠানো হয়েছে।

বিকেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা জনতার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসার খবর শুনতে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পাশের গলিতে পৌঁছে গেল। তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। চারদিকে ধোঁয়া। তবু সেনাবাহিনী বা পুলিশের কোনো চিহ্ন নেই।

হরি আবার মি. বাওয়াকে ফোন করল। এবার তার জানালা দিয়ে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল। তিনি আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন, স্ত্রীকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আমাদের বাড়িতে চলে আসবেন। কিন্তু সমস্যা হল, কীভাবে? দুই বাড়ির মাঝখানে কাঁধসমান দেয়াল ছিল। রাস্তা দিয়ে না গেলে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

আমি রাস্তার শেষ মাথায় কয়েকজন গুন্ডাকে দেখতে পেলাম। মাঝে মাঝে একটি মোটরসাইকেল ধীরে ধীরে এদিক-ওদিক ঘুরে যাচ্ছিল। বাওয়ারা রাস্তায় বের হওয়ার ঝুঁকি নিতে পারতেন না। বের হলে তাদের দেখা যাবে। সূর্য তখন পশ্চিমে নেমে গেছে, কিন্তু এখনও আলো আছে। মি. বাওয়া দেয়াল টপকানোর কথা শুনে পিছিয়ে গেলেন। তার বয়সে এত উঁচু দেয়াল টপকানো অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হরি তাকে চেষ্টা করতে রাজি করাল।

আমরা সেনদের বাড়ির পেছনের দিকে এমন একটি জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা করলাম, যেখান থেকে রাস্তা দেখা যায় না। জনতা তখন ভয়ঙ্করভাবে কাছে চলে এসেছে। আর বাওয়ারা আসতে এত দেরি করছিলেন যে তাদের এই দেরি বিপজ্জনক মনে হচ্ছিল। অনেকক্ষণ পর অবশেষে সেই বয়স্ক দম্পতিকে দেখা গেল। তারা দ্রুত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে মি. বাওয়া পোশাক বদলে নিয়েছিলেন। সুন্দর করে সেজেছিলেন, এমনকি ব্লেজার ও ক্রাভাটও পরেছিলেন। মিসেস বাওয়ার পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ। তাদের রাঁধুনিও সঙ্গে ছিল। তার সাহায্যেই তারা দেয়াল টপকে আমাদের বাড়িতে এলেন। রাঁধুনি হিন্দু ছিলেন। তিনি এরপর আবার বাওয়াদের বাড়িতে ফিরে গেলেন, পাহারা দেওয়ার জন্য।

হরি বাওয়াদের ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেল। সেখানে মিসেস সেন শিফনের শাড়ি পরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ঘরটি ছিল বড় এবং সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে ঝোলানো ছিল বিরল ও সুন্দর কিছু মিনিয়েচার চিত্র। পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছে, বাতি জ্বালানো হয়েছে। ঘরটি উষ্ণ ও স্বাগত জানানোর মত হয়ে উঠেছিল। অথচ আমাদের আর রাস্তার জনতার মধ্যে ছিল শুধু পর্দা দেওয়া কয়েকটি ফরাসি জানালা আর একটি বাগানের দেয়াল।

মিসেস সেন দুই হাত জোড় করে বয়স্ক দম্পতিকে স্বাগত জানালেন। তিনজন পাশাপাশি ঘনিষ্ঠভাবে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি রুপার চায়ের ট্রে এসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সব অস্বস্তি যেন উধাও হয়ে গেল। কাপ-পিরিচের টুংটাং শব্দের মধ্যে কথাবার্তা চলে গেল নয়াদিল্লির ড্রয়িংরুমের চেনা বিষয়গুলিতে।

আমি বসতে পারছিলাম না। করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনের দরজা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিলাম।

দুজন লোক মোটরসাইকেলে করে পাশের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তারা নেমে বাড়িটি পরীক্ষা করছিল। কংক্রিটের খুঁটির মাঝখানে ঢুকে বাড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। কোনোভাবে তারা জানতে পারল, রাঁধুনি সেখানে আছে। তাকে বাইরে ডেকে আনল।

রাঁধুনি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল কয়েকজন গুন্ডা। তারা তার মুখের সামনে ছুরি ধরে নানা প্রশ্ন করছিল। তখন অন্ধকার হয়ে গেছে, আর তাদের কারও কারও হাতে কেরোসিনের মশাল। তারা চিৎকার করে জানতে চাইছিল, তার মালিকেরা কি শিখ নয়?

তারা কোথায়? ভেতরে লুকিয়ে আছে কি না? বাড়িটির মালিক হিন্দু না শিখ?

হরি আর আমি দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে সেই জিজ্ঞাসাবাদ শুনছিলাম। আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছিল এই একা, ভীত মানুষটির ওপর। সে কী করবে, আমরা জানতাম না। বাওয়াদের প্রতি তার আনুগত্য কতটা, সেটাও জানতাম না। অতীতে তাদের কাছ থেকে কোনো অপমান পেয়ে থাকলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে তাদের অবস্থান জানিয়ে দেবে কি না, সেটাও জানতাম না। সে বলে দিলে, দুই বাড়িতেই আগুন লাগত।

ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে রাঁধুনি নিজের অবস্থান ধরে রাখল। হ্যাঁ, সে বলল, তার মালিকেরা শিখ। কিন্তু তারা শহর ছেড়ে চলে গেছে। বাড়িতে কেউ নেই। না, বাড়িটি তাদের নয়। তারা একজন হিন্দুর কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নিয়েছে।

বেশির ভাগ গুন্ডাকে সে বিশ্বাস করাতে পেরেছিল। কিন্তু কয়েকজন আশপাশের বাড়িগুলির দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিল। তাদের কয়েকজন আমাদের সামনে এসে লোহার গেট ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল।

আমরা সামনে গিয়ে গেটের কাছে দাঁড়ালাম। ড্রাইভওয়ে ধরে হাঁটার সময় আমার এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি হচ্ছিল, যেন অনেক দূরের কোথাও থেকে নিজেকেই দেখছি। তারপর গেট ধরে চিৎকার করে বললাম, “চলে যান! এখানে আপনাদের কোনো কাজ নেই। ভেতরে কেউ নেই! বাড়ি খালি!”

অবাক হয়ে দেখলাম, তারা একে একে সরে যেতে শুরু করল। এর ঠিক আগে আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখতে গিয়েছিলাম, মিসেস সেন আর বাওয়ারা কেমন আছেন। বাতি জ্বালানো ড্রয়িংরুমের ভেতর থেকেও গুন্ডাদের কণ্ঠস্বর পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। তাদের চোখ থেকে ঘরের ভেতরটাকে আড়াল করে রেখেছিল শুধু একটি পাতলা পর্দা।

ড্রয়িংরুমে আমি যা দেখেছিলাম, সেটি আজও আমার স্মৃতিতে অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট। মিসেস সেনের মুখে হালকা হাসি। তিনি মি. বাওয়ার জন্য কাপে চা ঢালছেন। তার পাশে মিসেস বাওয়া দৃঢ়, স্থির গলায় নয়াদিল্লি ও ম্যানিলায় গৃহকর্মী পাওয়ার সমস্যা কোথায় কেমন তা নিয়ে আলাপ করছেন।

তাদের সাহস দেখে আমি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

পরদিন সকালে আমি জানতে পারলাম, একটি বড় ত্রাণ সংস্থার চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর সময় সভা শুরু হয়ে গেছে। প্রায় সত্তর-আশি জন মানুষ জড়ো হয়েছিল।

পরিবেশ গম্ভীর। কয়েকজন বলছিলেন, প্রতিশোধপরায়ণ জনতা কীভাবে বিভিন্ন পাড়া দখল করে নিয়েছে। তারা অসংখ্য হত্যার কথা বলছিলেন, যার বেশির ভাগই মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারার মাধ্যমে ঘটেছে। তারা আরও বলছিলেন ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কথা: শিখদের মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, শিখদের স্কুল লুট করা হয়েছে, শিখদের বাড়ি ও দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সহিংসতা আমার কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ ছিল। সিদ্ধান্ত হল, শুরুতে সবচেয়ে কার্যকর কাজ হবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো একটি এলাকায় মিছিল করে যাওয়া এবং সরাসরি দাঙ্গাকারীদের মুখোমুখি হওয়া।

দলটি বেড়ে দাঁড়াল একশ পঞ্চাশ জন নারী-পুরুষে। তাদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী অগ্নিবেশ, বিজ্ঞানী ও পরিবেশকর্মী রবি চোপড়া এবং বিরোধী দলের কয়েকজন রাজনীতিক। তাদের মধ্যে ছিলেন চন্দ্রশেখর, যিনি কয়েক বছর পর অল্প সময়ের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

রাজনৈতিক মিছিল হিসাবে, যেখানে নিয়মিত কয়েক লাখ মানুষ জড়ো হয় এমন একটি শহরের তুলনায় দলটি ছিল খুবই ছোট। তবু সবাই উঠে দাঁড়াল এবং মিছিল শুরু করল।

অনেক বছর আগে আমি ভি. এস. নাইপলের একটি লেখা পড়েছিলাম। সেটি তখন থেকে আমার মনে গেঁথে ছিল। লেখাটি আর কখনও খুঁজে পাইনি, এখন যা বলছি, তা স্মৃতি থেকে। নাইপল তার অসাধারণ গদ্যে একটি বিক্ষোভ মিছিলের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও একটি হোটেলের ঘরে ছিলেন। নিচে তাকিয়ে দেখলেন, মানুষ মিছিল করে চলে যাচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে তার মধ্যে এক ধরনের অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা, এক ধরনের বিষণ্ণতা তৈরি হল। তার মনে হল, তিনি বাইরে বেরিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন, নিজের উদ্বেগ ও তাদের উদ্বেগকে এক করে ফেলবেন। কিন্তু তিনি জানতেন, কখনও তা করবেন না। কারণ ভিড়ের মধ্যে যোগ দেওয়া তার স্বভাবের মধ্যে ছিল না।

বহু বছর ধরে নাইপলের যা কিছু লেখা পেতাম, সব পড়তাম। তার লেখা পড়েও আমার যেন তৃপ্তি হল না। সবচেয়ে দক্ষ আলাপীদের কথা যেমন ঘনিষ্ঠ অথচ শিউরে-ওঠা মনোযোগ দিয়ে শুনি, তার লেখাও পড়তাম ঠিক সেভাবেই। ইংরেজিতে লিখে নিজেকে একজন লেখক হিসাবে ভাবার সুযোগ প্রথম তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন।

আমি সেই অংশটির কথা মনে করলাম, কারণ আমারও বিশ্বাস ছিল, আমি ভিড়ের মানুষ নই। নাইপলের নির্মম আয়নায় আমি মনে করেছিলাম, নিজের একটি দিক স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। কিন্তু এই হতাশাজনক ছোট দলটি যখন ত্রাণ সংস্থার চত্বরের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে মিছিল শুরু করল, তখন আমি এক মুহূর্তও দ্বিধা করলাম না। দ্বিতীয়বার ভাবারও প্রয়োজন হল না। আমি তাদের সঙ্গে যোগ দিলাম।

মিছিল প্রথমে গেল প্রায় এক মাইল দূরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা লাজপত নগরে। জায়গাটি আমি চিনতাম। নয়াদিল্লির মধ্যে হলেও এর রাস্তাগুলি শহরের পুরোনো অংশের মত দেখতে ছিল। ছোট ছোট গাদাগাদি দোকান ফুটপাতের ওপর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকত।

মিছিল করতে করতে আমরা স্লোগান দিচ্ছিলাম। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের গান্ধীবাদী শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের পুরোনো স্লোগান। হঠাৎ আমাদের সামনে ভেসে উঠল বিংশ শতাব্দীর শহুরে বিভীষিকার এক পরিচিত দৃশ্য। পোড়া গাড়ি, ভাঙা জানালার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে লুটপাট করা গাড়ির ভেতরের অংশ। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ ও আবর্জনা। কালো হয়ে যাওয়া হাঁড়ি-পাতিল রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। একটি সিনেমা হল পুরোপুরি পুড়ে গিয়েছিল। অর্ধেক পোড়া পোস্টারে চলচ্চিত্র তারকাদের কালো হয়ে যাওয়া মুখ আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল।

সেই মিছিলের কথা ভাবলে আমার স্মৃতি আর ঠিকমত কাজ করে না। অনেক ঘটনা ও দৃশ্য মিলিয়ে যায়। সম্প্রতি আমি সেই মিছিলে থাকা কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করেছিলাম। তাদের স্মৃতিও আমার মতই। শুধু একটি বিষয়ে আমাদের সবার স্মৃতি একই রকম। আমরা প্রত্যেকেই একটি দৃশ্য মনে রেখেছি, বাকি সবকিছু মন থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছি।

আমার স্মৃতিতে থেকে যাওয়া সেই দৃশ্য এমন এক মুহূর্তের, যখন মনে হয়েছিল, আমাদের ওপর হামলা হওয়া এখন আর ঠেকানো যাবে না।

মোড় ঘুরতেই আমরা এমন জনতার সামনে পড়লাম, আগের দেখা সব জনতার চেয়ে যারা ছিল বড় এবং অধিক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর আগে প্রতিবার আমরা গুন্ডাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে সরাসরি তাদের মুখোমুখি হয়েছিলাম। কথাবার্তা দ্রুত চিৎকার-চেঁচামেচিতে পরিণত হলেও প্রতিবারই আমরা তাদের পিছু হটাতে পেরেছিলাম। কিন্তু এই জনতাটি যেন মুখোমুখি সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুতই ছিল।

তারা ছুরি ও লোহার রড হাতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। আমরা থেমে গেলাম। তারা যত কাছে আসছিল, আমাদের কণ্ঠস্বর তত জোরালো হচ্ছিল। চূড়ান্ত সংঘর্ষ আসছে, এই উত্তেজনায় আমাদের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদ আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হলাম। ঝড়ের বিপরীতে শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দাঁড়ানোর মত করে আমরা সামনে ঝুঁকে ছিলাম।

তারপরই এমন কিছু ঘটল, যা আমি আজও পুরাপুরি বুঝতে পারিনি। কেউ কিছু বলেনি। কোনো সংকেতও দেওয়া হয়নি। আমাদের স্লোগানের ছন্দেও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কিন্তু হঠাৎ আমাদের দলের সব নারী, দলের অর্ধেকেরও বেশি সদস্য ছিলেন নারী, সামনে এগিয়ে এসে পুরুষদের ঘিরে দাঁড়ালেন। তাদের শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ যেন পাতলা, উড়তে থাকা বাধায় পরিণত হল, আমাদের চারপাশে একটি দেয়াল তৈরি করল। সামনে এগিয়ে আসা পুরুষদের দিকে মুখ করে তারা দাঁড়াল, যেন চ্যালেঞ্জ করছেন, যেন বলছেন, এসো, আক্রমণ করে দেখো।

গুন্ডারা আরও কয়েক পা এগিয়ে এল। তারপর তারা থমকে গেল, বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর তারা চলে গেল।

মিছিলটি আবার সেই দেয়ালঘেরা চত্বরে ফিরে এসে শেষ হল। পরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি সংগঠন তৈরি করা হল, নাগরিক একতা মঞ্চ বা সিটিজেনস ইউনিটি ফ্রন্ট। আহত ও স্বজনহারা মানুষদের সাহায্য করা এবং গৃহহীনদের আশ্রয় দেওয়ার কাজ শুরু হল পরদিন সকাল থেকেই। খাবার ও কাপড়ের দরকার ছিল। যাদের ঘুমানোর জন্য কোনো জায়গা ছিল না, সেই হাজার হাজার মানুষের জন্য শিবির তৈরি করতে হত।

পরদিনই আমরা কাজের চাপে আক্ষরিক অর্থেই ডুবে গেলাম। বড় চত্বরটি কম্বল, ব্যবহৃত পোশাক, জুতা এবং ময়দা, চিনি ও চায়ের বস্তা ভর্তি ভ্যানের পর ভ্যানে ভরে গেল। আগে কঠোর ও আবেগহীন বলে পরিচিত ব্যবসায়ীরাও গাড়ি ও ট্রাক পাঠালেন। এত বেশি জিনিস এসে জমা হল যে হাঁটার মত জায়গাও প্রায় ছিল না।

ফ্রন্টে আমার নিজের ভূমিকা ছিল সামান্য। কয়েক সপ্তাহ আমি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলের সঙ্গে কাজ করেছি। দাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বস্তি ও শ্রমজীবী এলাকাগুলিতে আমরা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতাম। তারপর আমি আবার নিজের লেখার টেবিলে ফিরে গেলাম।

সময়ের সঙ্গে ফ্রন্টের বেশির ভাগ স্বেচ্ছাসেবকও নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে ফিরে গেলেন। কিন্তু কয়েকজন সদস্য, বিশেষ করে যারা শরণার্থী শিবির পরিচালনার কাজে যুক্ত ছিলেন, বহু বছর ধরে গৃহহীন হয়ে পড়া শিখ নারী ও শিশুদের জন্য কাজ করে গেছেন। জয়া জেটলি, ললিতা রামদাস, বীণা দাস, মিতা বসু, রাধা কুমার। এই নারীরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী ছিলেন। তবু তারা দুই-তিন দিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে বছরের পর বছর সময় দিয়েছেন।

ফ্রন্ট দাঙ্গার তদন্ত করার জন্যও একটি দল গঠন করেছিল। আমি অল্প সময়ের জন্য সেই দলে যোগ দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, তদন্ত করে কোনো লাভ হবে না। কারণ যারা সহিংসতা উসকে দেওয়ার মত রাজনৈতিক ক্ষমতা রাখে, তারা কয়েকজন উদ্বিগ্ন নাগরিকের একটি ছোট দলের কথা শুনবে, এটা অসম্ভব।

আমি ভুল ছিলাম।

এই দলটি শেষ পর্যন্ত যে নথি তৈরি করেছিল, Who Are the Guilty নামের সেই ছোট পুস্তিকা পরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে। দাঙ্গায় উৎসাহ দেওয়া রাজনীতিক এবং দাঙ্গাকারীদের বাধা না দেওয়া পুলিশের বিরুদ্ধে এটি ছিল তীব্র অভিযোগপত্র।

বছরের পর বছর ভারত সরকার ১৯৮৪ সালের সহিংসতার কিছু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে এবং কিছু গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসিত করেছে। কিন্তু একটি বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। আজ পর্যন্ত দাঙ্গার কোনো উসকানিদাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। তবে সরকারের ওপর চাপ কখনও কমেনি, বরং বাড়ছে। প্রতি বছর সেই পাতলা পুস্তিকাটির পেরেক যেন আরও একটু গভীরে ঢুকে যাচ্ছে।

এই পুস্তিকা এবং এর পর প্রকাশিত আরও কিছু নথি ভারতীয় উপমহাদেশের মত বহু জাতি ও বহু ধর্মের সমাজে বসবাসকারী মানুষের সামনে থাকা একমাত্র মানবিক পথের প্রমাণ। Who Are the Guilty?-এর মত মানবাধিকারবিষয়ক নথি নাগরিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়ায় অপরিহার্য। এগুলি সেই অস্ত্র, যার মাধ্যমে সমাজ এমন একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানায়, যে রাষ্ট্র অপরাধীর মত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহিংসতায় মেতে ওঠে, যেমনটা ঘটেছিল ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে দিল্লিতে।

পাঞ্জাবে আজ স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এসেছে, এটা স্বস্তির। কিন্তু অন্য কোথাও পরিস্থিতি তেমন নয়। বম্বেতে স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তারা চান, কোনো সরকারি বা জনসাধারণের ভবন যেন সবুজ রঙে না রাঙানো হয়, কারণ এই রঙ মুসলিম ধর্মের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। শহরের বস্তিগুলি থেকে শত শত মুসলমানকে উচ্ছেদও করা হয়েছে। অন্তত একজনকে এমন এক অপরাধে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, যা বাংলা সংবাদপত্র পড়ার চেয়ে গুরুতর কিছু নয়। ব্যাপক সহিংসতা উসকে দেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন শাস্তি ছাড়া পার না পায়, সরকারের এটি নিশ্চিত করা জরুরি।

বসনিয়ার লেখক জেভাদ কারাহাসান গত বছর প্রকাশিত Sarajevo, Exodus of a City সংকলনে থাকা Literature and War নামে একটি অসাধারণ প্রবন্ধে আধুনিক সাহিত্যের নান্দনিকতাবাদ এবং সমকালীন বিশ্বের সহিংসতার প্রতি উদাসীনতার মধ্যে একটি চমকপ্রদ সম্পর্ক দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:

“আক্ষরিক অর্থে সবকিছুকে একটি নান্দনিক ঘটনা হিসাবে দেখার সিদ্ধান্ত, ভাল ও সত্যের প্রশ্ন পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে, একটি শৈল্পিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের শুরু শিল্পের জগতে, পরে তা সমকালীন বিশ্বের একটি বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।”

১৯৮৪ সালের নভেম্বরে আমি যখন আবার লেখার টেবিলে ফিরলাম, তখন এমন কিছু লেখার সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলাম, যার মুখোমুখি আগে কখনও হইনি। আমি যা দেখেছি, তাকে নিছক একটি দৃশ্যে পরিণত না করে ঠিক কীভাবে লিখব?

আমার পরবর্তী উপন্যাস যে আমার অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হবে, সেটা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু ওই ঘটনাগুলি সরাসরি লেখায় তুলে আনার কোনো উপায় দেখছিলাম না। কারণ তাতে সেগুলি সহিংসতার একটি বিশাল দৃশ্যপটে পরিণত হত, কারাহাসানের ভাষায় একটি “নান্দনিক ঘটনা”। তখন এই ধারণা আমার কাছে অশ্লীল ও অর্থহীন মনে হয়েছিল। তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং ঘটনাগুলির তথ্যভিত্তিক বিবরণ। কিন্তু এসব কাজ ইতিমধ্যেই এমন কিছু মানুষ করছিলেন, যাদের আমি চিনতাম এবং আমার চেয়ে তারা এ কাজে অনেক বেশি দক্ষ।

কয়েক মাসের মধ্যেই আমি উপন্যাস লেখা শুরু করলাম। শেষ পর্যন্ত বইয়ের নাম দিলাম The Shadow Lines। এই বই আমাকে সময়ের আরও পেছনে নিয়ে গেল, শৈশবে দেখা আগের কিছু দাঙ্গার স্মৃতির দিকে। বইটি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে নয়। বরং এমন ঘটনাগুলির অর্থ কী এবং যারা এসবের মধ্য দিয়ে বেঁচে যায়, তাদের ওপর এসব ঘটনার কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে।

এবং এতদিন পর্যন্ত ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে আমি যা দেখেছিলাম, তা নিয়ে আসলে আর লিখিনি। আমি একা নই। সেই মিছিলে অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন পরে বই প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যতদূর জানি, তাদের কেউই সেই মিছিল নিয়ে আলাদাভাবে লেখেননি। বড়জোর অন্য প্রসঙ্গে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করেছেন।

এর পেছনে ভাল কিছু কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণগুলির একটি হল রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা লেখকের জন্য খুব সামান্যই জায়গা রাখে। পাঞ্জাবে একদিকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী, অন্যদিকে ভারত সরকার—এই দুই পক্ষের সহিংসতার চক্র থেকেই দাঙ্গার জন্ম। এমন অবস্থায় অসতর্কভাবে কিছু লিখে ফেললে তা সন্ত্রাসবাদ বা দমন-পীড়নকে সমর্থন করার মত হয়ে যেতে পারে, আর তাতে সংকট আরও বাড়ে। এত উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে শব্দও মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। তাই যারা শব্দ নিয়ে কাজ করেন, তারা কী বলছেন সে বিষয়ে খুব সতর্ক থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিকভাবেই তাদের নিজেদেরও কিছুটা থমকে যেতে হয়।

কিন্তু এর একটি সহজ ব্যাখ্যাও আছে। একটি শব্দ লিখে ফেলার আগেও আমাকে একটি দ্বিধার সমাধান করতে হয়েছিল। আমি কি লেখক, নাকি নাগরিক?

লেখক হিসাবে আমার সামনে খুব সহজ একটি বিষয় ছিল: সহিংসতা। সংবাদ প্রতিবেদন, সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র কিংবা উপন্যাসে আমরা এখন এমন দৃশ্য আশা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যেখানে থাকে রক্তাক্ত খুঁটিনাটি অথবা সুন্দরভাবে সাজানো এমন কোনো ভয়াবহ দৃশ্য, যা একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায় কিংবা গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্ত তৈরি করে। কিন্তু আমাদের সময়ের প্রচলিত উপস্থাপনার ধরন থেকেই কি এই বিষয়টির এত সহজলভ্যতা এসেছে, সেটাও ভাবা দরকার। কারাহাসান যাকে “উদাসীনতার নান্দনিকতা” বলেছেন, আমাদের সময়ের সেই প্রধান নান্দনিকতার মধ্যে সহিংসতাকে এক ধরনের মহাপ্রলয়ের দৃশ্য হিসাবে দেখানো খুব সহজ। আর তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে সহজেই আবেগপ্রবণতা হিসাবে দেখানো যায়, আরও খারাপভাবে দেখানো যায় করুণ বা হাস্যকর কিছু হিসাবে।

লেখকেরা ভিড়ে যোগ দেন না। নাইপল আর আরও অনেক লেখক আমাদের এমনটাই শিখিয়েছেন। কিন্তু যখন সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তখন আপনি কী করবেন? আপনি যোগ দেন। আর যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই যোগ দেওয়ার সব দায়, কর্তব্য এবং অপরাধবোধও নিজের ওপর নেন।

সহিংসতার অভিজ্ঞতা যেমন আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিল, তেমনি সেই সহিংসতার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধও আমাকে নাড়া দিয়েছিল। যখন আমি সেই নারীদের কথা ভাবি, যারা জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন, তখন আমার মনে লেখকের বিস্ময় জাগে না। বরং মনে পড়ে, তাদের জন্যই সেদিন আমি আহত হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম, আর মনে পড়ে তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার কথা।

আমি নিজের চোখে যা দেখেছিলাম, শুধু সেই মিছিলে নয়, বাসে, হরির বাড়িতে আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে ভরা সেই বিশাল চত্বরেও, সেটা সহিংসতার ভয়াবহতা ছিল না, ছিল মানবতার প্রকাশ। প্রতিটি ঘটনায় আমি দেখেছি, একেবারে সাধারণ মানুষও অন্য মানুষের জন্য কত বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।

এখন যখন আমি পৃথিবীর অশান্ত অঞ্চলগুলির বর্ণনা পড়ি, যেখানে সহিংসতাকে মনে হয় আদিম ও অনিবার্য, এমন এক নিয়তি যার কাছে অসংখ্য মানুষ প্রায় স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছে, তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে: সত্য কি শুধু এটুকুই ছিল?

নাকি এমনও হতে পারে যে এসব বিবরণের লেখকেরা এমন কোনো কাঠামো, ধরন, ভাষা বা গল্পের বিন্যাস খুঁজে পাননি, যার মধ্যে সহিংসতার পাশাপাশি মানুষের সভ্য, সচেতন এবং ইচ্ছাকৃত প্রতিরোধকেও জায়গা দেওয়া যায়?

আরো পড়ুন: ভুলে যাওয়া এক গান্ধীকে নিয়ে বই—ফিরোজ: দ্য ফরগটেন গান্ধী

সত্য হল, সহিংসতার সবচেয়ে সাধারণ প্রতিক্রিয়া হল ঘৃণা ও বিরাগ। আর পৃথিবীর সর্বত্রই বহু মানুষ কোনো না কোনোভাবে এর বিরোধিতা করার চেষ্টা করে। সহিংসতার বিবরণে এই প্রতিরোধের ঘটনাগুলি এত কম দেখা যায় যে, তা আশ্চর্যের নয়। কারণ এগুলি যথেষ্ট নাটকীয় নয়। যারা এসব কাজে অংশ নেন, তাদের জন্যও এগুলি নিয়ে লেখা অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালের নিজের অভিজ্ঞতা লিখতে আমার এত বছর লেগেছিল, এই কারণেই।

কারাহাসান লিখেছেন, “নিজেদের ভুল বোঝাবুঝিতে রাখবেন না। পৃথিবী প্রথমে লেখায় তৈরি হয়। পবিত্র গ্রন্থগুলিতে বলা হয়েছে, শব্দের মাধ্যমেই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল। আর পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে, তা প্রথমে ভাষার মধ্যেই ঘটে।”

যখন আমরা ভাবি, “উদাসীনতার নান্দনিকতা” কেমন একটি পৃথিবী তৈরি করতে পারে, তখনই আমরা বুঝতে পারি, যেসব গল্প আমরা লিখিনি, সেগুলি মনে রাখা কেন এত জরুরি।

অনুবাদ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: সাহিত্য ডেস্ক

লেখক পরিচিতি

অমিতাভ ঘোষের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১১ জুলাই, কলকাতায়। বাবা কূটনীতিক হওয়ায় ছোটবেলা কেটেছে ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর অক্সফোর্ড থেকে সমাজ-নৃবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেন; পড়াশোনা করেছেন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়াতেও। লেখেন ইংরেজিতে, কিন্তু তার প্রায় সব লেখার শিকড় ভারতীয় উপমহাদেশে।

প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সার্কল অব রিজন’ (১৯৮৬)। এরপর ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’ (১৯৮৮), এই লেখাতেই যে বইয়ের কথা তিনি বলেছেন। তারপর ‘দ্য ক্যালকাটা ক্রোমোজোম’, ‘দ্য গ্লাস প্যালেস’, ‘দ্য হাংরি টাইড’, আর ‘ইবিস’ ত্রয়ী: ‘সি অব পপিজ’, ‘রিভার অব স্মোক’ ও ‘ফ্লাড অব ফায়ার’। ‘সি অব পপিজ’ বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠেছিল। কথাসাহিত্যের পাশাপাশি লিখেছেন ‘ইন অ্যান অ্যান্টিক ল্যান্ড’, জলবায়ু নিয়ে ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’, ‘দ্য নাটমেগস কার্স’, ‘স্মোক অ্যান্ড অ্যাশেজ’-এর মত ননফিকশন।

২০১৮ সালে তিনি প্রথম ইংরেজি ভাষার লেখক হিসাবে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান। এর আগে ও পরে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী, ফ্রান্সের প্রি মেদিসি এত্রঁজে, ইরাসমুস পুরস্কার (২০২৪) ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাক ক্যংনি পুরস্কার (২০২৫)। তার বই ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখন থাকেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে।

রাজনীতি অমিতাভ ঘোষইন্দিরা গান্ধীশিখ

Post navigation

Previous post

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

উপন্যাস

লুসিয়াস আপুলিয়াস এর ‘মেটামরফোসিস’ অথবা ‘দ্য গোল্ডেন অ্যাস’

সম্পাদক: ব্রাত্য রাইসু

©2026 সাহিত্য ডটকম | WordPress Theme by SuperbThemes

Terms and Conditions - Privacy Policy