২০০১-এ নোবেল পেলেন ভি. এস. নাইপল—যে লেখকের প্রতিভা নিয়ে বিতর্ক নেই, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ইসলাম, ভারত, ‘আধা-তৈরি’ সমাজ নিয়ে তার অবজ্ঞা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি উপনিবেশ—উত্তর জগৎকে দেখার তার নির্মম স্বচ্ছতা।
এই দ্বৈততার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে লেখা অমিতাভ ঘোষের এই প্রবন্ধ। বন্দনাও নয়, নিন্দাও নয়। নাইপলই তাকে ইংরেজিতে লেখক হয়ে ওঠার সাহস জুগিয়েছিলেন—সেই ঋণ তিনি স্বীকার করেন, আবার সমান স্পষ্টতায় প্রশ্নও তোলেন। আর মনে করিয়ে দেন, এই পুরস্কারের আসল দাবিদার সেই জায়গা, যাকে নাইপল বরাবর আড়ালে রেখেছেন: তার জন্মভূমি ত্রিনিদাদ।
নাইপল ও নোবেল
অমিতাভ ঘোষ
কৈশোরে আমি নাইপলের একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, তার ছেলেবেলার ত্রিনিদাদে ক্যারিবীয় ফুলগুলি কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল পাঠ্যবইয়ের ইংরেজ কবিদের সেই না-দেখা ড্যাফোডিলের আড়ালে। চেনা-চেনা লাগার এমন এক জোরালো ধাক্কা সেই প্রবন্ধ আমার ভেতরে তুলেছিল যে মুহূর্তটা আজও আমার সঙ্গে রয়ে গেছে। ছোটবেলায় ‘দ্য মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি’ পড়তে গিয়ে ‘ফ্র্যাঞ্জিপানি’ শব্দটা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। শব্দটার মধ্যে যেন রহস্যময়, আকাঙ্ক্ষিত আর গোপন সবকিছুর ঘ্রাণ ছিল। তারপর একদিন আবিষ্কার করলাম, আমার জানালার পাশের সেই বাঁকাচোরা পুরানো ডালগুলি আসলে একটা ‘ফ্র্যাঞ্জিপানি’ গাছেরই। বছরের পর বছর আমি ওগুলির দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমার প্রতিক্রিয়া বিস্ময়ও ছিল না, হতাশাও নয়। বরং হঠাৎ করে টের পেলাম, পৃথিবীতে আমার নিজের জায়গাটা কত বেখাপ্পা। এই বোধ এর আগে পড়া কোনো লেখায় আমি দেখিনি, নাইপলের ওই প্রবন্ধে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত।
সেই বছরগুলিতে নাইপল পড়ার জাদুটা ছিল এমনই। তার মত ও ধারণার সঙ্গে আমি প্রায় সবসময়ই দ্বিমত করতাম। কিছু মত, কারণ সেগুলোর ভিত্তি ছিল এমন সব সত্যে, যা মেনে নেওয়া বড় বেদনাদায়ক। কিছু, কারণ সেগুলো ছিল মানুষবিদ্বেষী বা আপত্তিকর। আর কিছু, কারণ সেগুলো অস্বস্তিকরভাবে বর্ণবাদের কাছাকাছি চলে যেত, নয়তো নিছক অজ্ঞতা (এই শেষেরটা বিশেষভাবে ইসলামি দুনিয়া নিয়ে তার লেখায়)। তবু তিনি এমন সব বিষয় নিয়ে লিখতেন, যা আর কেউ লক্ষ করার মত মনে করত না। অভিজ্ঞতার নতুন নতুন স্তর খুঁড়ে বের করার ভাষা তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন।

আজ, কয়েক দশক পর, ভাষা নিয়ে লেখা সেই প্রবন্ধ আমার নিজের অভিজ্ঞতার এতটাই ঘনিষ্ঠ অংশ হয়ে গেছে যে ঠিক বলতে পারি না কোথায় আমার নিজের স্মৃতি শেষ আর কোথায় নাইপলের বর্ণনা শুরু। ফ্র্যাঞ্জিপানিটা কি আমার, নাকি তার? নাকি আমি আসলে ভাবছিলাম একটা জাকারান্ডা গাছের কথা? মাঝে মাঝে নাইপলের এমন আরও কিছু মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে ভেসে ওঠে, ব্যথিয়ে ওঠা আক্কেল দাঁতের মত। কয়েক বছর আগে আমি নিজের একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখছিলাম, ১৯৮৪ সালের দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে। অস্পষ্টভাবে নাইপলের একটি ভ্রমণকাহিনির একটা অংশ আমার মনে পড়ল। আমি সেটা এভাবে বর্ণনা করেছিলাম:
“তার অতুলনীয় গদ্যে নাইপল একটি বিক্ষোভ মিছিলের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও একটি হোটেলের ঘরে আছেন; নিচে তাকিয়ে দেখেন মানুষ মিছিল করে চলে যাচ্ছে। দৃশ্যটা তাকে অবাক করে দেয়; তার ভেতরে জেগে ওঠে এক অস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা, এক ধরনের বিষণ্ণতা। তার মনে হয়, বাইরে বেরিয়ে গিয়ে ওদের সঙ্গে মিশে যাই, নিজের উদ্বেগ ওদের উদ্বেগের সঙ্গে এক করে ফেলি। তবু তিনি জানেন, কখনো তা করবেন না; ভিড়ে যোগ দেওয়া তার স্বভাবেই নেই।.. এই নাইপলই প্রথম আমাকে ইংরেজিতে লিখে নিজেকে একজন লেখক ভাবার সুযোগ দিয়েছিলেন… নিজের সবচেয়ে দক্ষ আলাপীদের জন্য যে ঘনিষ্ঠ অথচ শিউরে-ওঠা মনোযোগ তুলে রাখি, তার লেখাও পড়তাম সেই মনোযোগ নিয়ে। ওই প্রবন্ধটা আমার মনে ছিল, কারণ আমিও স্বভাবে ভিড়ের মানুষ ছিলাম না; সেই বর্ণনা পড়ে মনে হয়েছিল, নাইপলের নির্মম আয়নায় আবার একবার নিজের একটা দিক স্পষ্ট দেখতে পেলাম।”
এমন একটা ব্যাপারের জন্য ‘প্রভাব’ শব্দটা যথেষ্ট মনে হয় না। যেন নাইপলের লেখা এমন এক শানপাথর, যার গায়ে ঘষে আমি পৃথিবী সম্পর্কে নিজের বোধকে ধারালো করে নিতাম।
ভারতে আমার গড়ে ওঠার বছরগুলিতে নাইপল আমার ভেতরে এমন এক তীব্রতা আর মগ্নতা জাগাতেন, যা আর কোনো লেখক পারতেন না। তার লেখা সব পড়তাম, ঘনিষ্ঠ আর প্রায়ই তর্কমুখর মনোযোগ দিয়ে: ‘মিগুয়েল স্ট্রিট’, ‘দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা’, ‘দ্য মিস্টিক ম্যাসিউর’, ‘আ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস’, ‘দ্য মিমিক মেন’, ‘মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইট্স কম্প্যানিয়ন’ আর ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’। এই শুরুর দিকের উপন্যাসগুলি আজও আমার ভালবাসার। আমার মতে, শুধু এগুলির জন্যেই নাইপল নোবেলের যোগ্য। তবে পশ্চিমে ভি. এস. নাইপলকে প্রথম নজরে আনে তার কথাসাহিত্য নয়, ননফিকশন, বিশেষ করে ভারত নিয়ে তার দুটি বই ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ আর ‘ইন্ডিয়া: আ উন্ডেড সিভিলাইজেশন’। ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ আলোড়ন তুলেছিল তার ব্যঙ্গ আর ক্ষোভের সুরের কারণে। তবু মন দিয়ে পড়লে, আমার মনে হয়, বোঝা কঠিন নয় যে নাইপলের ক্রোধের লক্ষ্য আসলে তিনি নিজে আর তার নিজের অতীত। তার ব্যঙ্গের উৎস ভারতে তিনি যা দেখেন তা নয়, বরং শিকড়-উপড়ানো পূর্বপুরুষদের গড়ে তোলা মিথের প্রতি তার মোহভঙ্গ। তবে এই বইগুলি তার লেখায় সত্যিই একটা নির্ধারক মোড় এনে দিয়েছিল। এরপর পশ্চিমের বাইরের জীবনকে তিনি আর কখনও তার নিজের শর্তে দেখেননি। ভারত, ক্যারিবিয়ান আর আফ্রিকা হয়ে দাঁড়াল ফ্যাকাশে পটভূমি, যার ওপর পশ্চিমের, বিশেষত ইংল্যান্ডের, একটা ছবি ফুটিয়ে তোলা যায়। এরপর তার শুরুর দিকের লেখার সেই বহুস্তরী, জীবন্ত দ্বীপগুলি হারিয়ে গেল। তাদের জায়গায় এল একের পর এক প্রায়-অভিন্ন ব্যঙ্গচিত্র, ইউরোপের তুলনায় যেসব সমাজকে দেখানো হয়েছে ‘আধা-তৈরি’ বলে। এই মিথ্যা তুলনায় অ-পশ্চিমা কখনও এর চেয়ে বেশি কিছু হতে পারত না, শুধুই ফাঁপা, এমন এক জগৎ যার পরিচয় তার অভাব দিয়েই ঠিক হয়। যেমনটা আঁচ করা যায়, নাইপলের লেখার এই মোড় পশ্চিমে দারুণ জনপ্রিয় হল, আর ‘তৃতীয় বিশ্ব’-এর বিরুদ্ধে তার অভিযোগনামার জন্য তাকে দ্রুত মহিমান্বিত করা হল। তার প্রভাব কতটা, তা এখান থেকেই বোঝা যায়: পশ্চিমে আজ ভ্রমণ-লেখকদের ততটুকুই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়, যতটা তারা নাইপলের সেই চেনা ব্যঙ্গের সুর নকল করতে পারেন।
আরো পড়ুন: অমিতাভ ঘোষের লেখা “মিসেস গান্ধীর ভূত”
নাইপল নোবেলে খুশি হবেন কি না, সেটা তর্কসাপেক্ষ। কারণ খুব বেশিদিন হয়নি, তিনি এই কমিটিকেই অভিযুক্ত করেছিলেন অনেক উঁচু থেকে সাহিত্যকে নোংরা করার জন্য। যাই হোক, নাইপল যে তার পুরস্কার ভারতকে নয়, বরং তার গৃহীত দেশ ইংল্যান্ডকে উৎসর্গ করার ইচ্ছা জানিয়েছেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নাইপল-সুলভ ঢঙেই এতে নাম না-বলা থেকে যায় সেই জায়গাগুলি, সাহিত্যিকভাবে যাদের কাছে তার আসল ঋণ: ত্রিনিদাদ আর ক্যারিবিয়ান। ত্রিনিদাদই, তার উর্বর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন নিয়ে, নাইপলকে দিয়েছিল তার সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, আর সেই উপন্যাসগুলির পটভূমি, যেগুলির জন্যই তাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে। স্যার ভিদিয়ার নোবেল শুধু তার নিজের অসামান্য, যদিও কখনও কখনও খেয়ালি, প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা নয়, তার জন্মভূমি সেই দ্বীপটির প্রতিও।
(২০০১)
অনুবাদ ও খসড়া: এআই; প্রম্পট ও সম্পাদনা: সাহিত্য ডেস্ক
লেখক পরিচিতি
অমিতাভ ঘোষের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১১ জুলাই, কলকাতায়। বাবা কূটনীতিক হওয়ায় ছোটবেলা কেটেছে ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর অক্সফোর্ড থেকে সমাজ-নৃবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেন; পড়াশোনা করেছেন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়াতেও। লেখেন ইংরেজিতে, কিন্তু তার প্রায় সব লেখার শিকড় ভারতীয় উপমহাদেশে।
প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সার্কল অব রিজন’ (১৯৮৬)। এরপর ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’ (১৯৮৮), এই লেখাতেই যে বইয়ের কথা তিনি বলেছেন। তারপর ‘দ্য ক্যালকাটা ক্রোমোজোম’, ‘দ্য গ্লাস প্যালেস’, ‘দ্য হাংরি টাইড’, আর ‘ইবিস’ ত্রয়ী: ‘সি অব পপিজ’, ‘রিভার অব স্মোক’ ও ‘ফ্লাড অব ফায়ার’। ‘সি অব পপিজ’ বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠেছিল। কথাসাহিত্যের পাশাপাশি লিখেছেন ‘ইন অ্যান অ্যান্টিক ল্যান্ড’, জলবায়ু নিয়ে ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’, ‘দ্য নাটমেগস কার্স’, ‘স্মোক অ্যান্ড অ্যাশেজ’-এর মত ননফিকশন।
২০১৮ সালে তিনি প্রথম ইংরেজি ভাষার লেখক হিসাবে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান। এর আগে ও পরে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী, ফ্রান্সের প্রি মেদিসি এত্রঁজে, ইরাসমুস পুরস্কার (২০২৪) ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাক ক্যংনি পুরস্কার (২০২৫)। তার বই ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এখন থাকেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে।
